এবার দেখতে পেলুম, ঝর্ণার ওপর বাঁদিকের প্রকাণ্ড পাথরে দাঁড়িয়ে আছেন আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। টাক ঢাকা সাদা টুপি রোদে ঝলমল করছে। গলায় কম্ফোর্টার জড়ানো। এক হাতে প্রজাপতি ধরা জাল, অন্যহাতে একগুচ্ছের ঢিল।
বুঝলুম, স্বরভঙ্গ যথার্থ ঘটেছে। তাই এই ঢিল। কিন্তু হাসবার মতো মনের অবস্থা নয়। ওঁকে দেখামাত্র সাহস ও উৎসাহ বেড়ে গেল। কীভাবে হাঁচড়-পাঁচড় করে ওই তিরিশ-পঁয়ত্রিশ ফুট উঁচু জায়গায় উঠে গেলুম বলতে পারব না।
পৌঁছেই হাঁফাতে হাঁফাতে বললুম– ওখানে একটা ডেডবডি পড়ে আছে কর্নেল। রীতিমত মার্ডার। রক্তে ভেসে গেছে।
কর্নেলের মুখটা গম্ভীর। হাতের ঢিল ফেলে নিজের মুখ হাঁ করে আঙুল দিয়ে বোঝালেন, স্বরভঙ্গ ঘটেছে। তারপর বোবার ভঙ্গিতে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, কিছুক্ষণ আগে তিনিও লাশটা আবিষ্কার করেছেন এবং একজন পথিককে দিয়ে ডমরুনাথ পুলিশ ফাঁড়িতে খবরও পাঠিয়েছেন। তারপর এখানে বসে শকুনের মতো অপেক্ষা করছিলেন, এমন সময় আমি হাজির হয়েছি। আমি কতটা কী করি, আমুদে বুড়ো তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছে। শেষে আমি বাড়াবাড়ি করছি দেখে ঢিল ছুঁড়ে আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
আমি প্রণতির ব্যাপারটা বলার পর প্রশ্ন করলুম, এ দুইয়ে কি কোনও সম্পর্ক আছে?
কর্নেল পকেট থেকে একটুকরো সাদা চকপাথর বের করলেন। বুঝলুম, কোথাও কুড়িয়েছেন স্বরভঙ্গের দরুন ও পাহাড় পর্বতে জিনিসটা কাজে লাগবে বলে।
খড়ি দিয়ে পাথরের ওপর লিখলেন : যদি নিহত ব্যক্তিটি সেই শমীক হয়, তাহলে তো সম্পর্ক থাকছেই। যদি না হয়, তাহলে কিসের সম্পর্ক?
বললুম– যাই বলুন। প্রণতির ব্যাপার-স্যাপার বড় গোলমেলে। খুব রহস্যময়।
কর্নেল লিখলেন : রহস্যময় কি না, সেটা বোঝা যাবে সারাঙ বিদ্যুৎকেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে। যদি সত্যি ওখানে নীতিশবাবু নামে কোনও ইঞ্জিনীয়ার থাকেন, তাহলে গোলমাল কিসের?
বললুম– রাতে ওই যে সব কথাবার্তা শুনলুম শমীক ও প্রণতির–তার মানেটা কী?
কর্নেল লিখলেন : মানেটার সঙ্গে কোনও ক্রাইম জড়িত না থাকতেও পারে। যাই হোক, আর কথা নয়। চুপচাপ বসে পুলিশের অপেক্ষা করা যাক। এ আমাদের নাগরিক কর্তব্য।
বললুম– ফাঁড়িতে তো শুধু সেপাইরা থাকবে। দেখবেন, গণ্ডগোলে না যেন পড়তে হয়। বিহারের পুলিশ সম্পর্কে আমার আতঙ্ক আছে।
কর্নেল চুপচাপ চুরুট ধরিয়ে টানতে থাকলেন। আমার কথাও গ্রাহ্য করলেন না।
কিছুক্ষণ পরে ওপাশে রাস্তায় জনা দুই সেপাইকে আস্তে-সুস্থে আসতে দেখলুম। তাদের পেছনে একজন দেহাতি মজুর গোছর লোক। বুঝলুম, ওকে দিয়েই কর্নেল খবর পাঠিয়েছিলেন।
দেহাতি লোকটা ক্রমে আঙুল দিয়ে নিচে লাশটার দিকে সেপাই দুটোর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তারপর আমাদের দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে কিছু বলল।
আমরা নেমে গেলুম লাশের কাছে। সেপাই দুজন হোমরা-চোমরা ভঙ্গিতে জেরা শুরু করল। সব জবাব আমিই দিলুম। সেইসঙ্গে কর্নেলের স্বরভঙ্গের কথাও জানালুম। তখন দেহাতি লোকটা ফিক করে হেসে হিন্দিতে বলল, আমি ভেবেছিলুম বুড়োসায়েব বোবা-কালা!
সেপাইরা থানায় খবর পাঠিয়ে দিয়েছে। পাঁচমাইল দূরের থানা থেকে অফিসাররা এসে পড়বেন। ততক্ষণ আমাদেরও থাকতে হবে।..
.
০৩.
প্রণতি এতে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে পড়ল। কারণ লাশটা তার স্বামী নীতিশের। পকেটে আইডেন্টটি কার্ড ছিল। জনান্তিকে আমি কর্নেলকে বললুম– যা বলেছিলুম, হলো তো? রাত থেকেই আঁচ করেছিলুম, একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটতে চলেছে।
কর্নেলের স্বরভঙ্গ। মুখে অসহায় মানুষের ভঙ্গি। করুণ হাসলেন মাত্র।
আমরা এখন বাংলোয় ফিরেছি। লাশ মর্গে চলে গেছে পুলিশের জিপে। সারা থেকে খবর পেয়ে একদল বিদ্যুৎকর্মী ও অফিসার এসেছিলেন। পুলিশের জেরায় নাস্তানাবুদ হয়ে গেছেন সবাই। বিহারের পুলিশ গা করে না তো করে না করলে বেজায় রকমের করে।
প্রণতি জেরার চোটে জেরবার। কোণঠাসা হয়ে নীরবে কান্নাকাটি করে যাচ্ছে সারাক্ষণ। আমার কষ্ট হচ্ছিল ওর অবস্থা দেখে। চক্রান্ত করে স্বামী হত্যার দায়ে গ্রেফতার করা হবে বলে শাসাচ্ছিলেন পুলিশের দারোগা ভদ্রলোক।
রাতের সেইসব ঘটনার কথা পুলিশকে আমি বলিনি। কর্নেল চোখ টিপে নিষেধ করেছিলেন।
কিন্তু বালির গর্তটা সম্পর্কে তীব্র কৌতূহল ছিল আমার। দারোগাবাবুকে জিগ্যেস করলে দ্রুত জবাব দিলেন, গর্ত করে লাশটা পুঁততে চেষ্টা করছিল খুনী। সম্ভবত কেউ এখানে গিয়ে পড়ায় সেটা পারেনি।
দুপুর বারোটার মধ্যে প্রণতিকে সত্যি সত্যি গ্রেফতার করে নিয়ে দারোগাবাবু সদলবলে প্রস্থান করলেন।
কিন্তু আশ্চর্য, প্রণতি আমাকে একবারও বলল না তাকে সাহায্য করতে। সে চুপচাপ চলে গেল।
বাংলো আবার নির্জন ও শান্ত হয়ে গেল। কর্নেল স্নান করলেন না আরও ঠাণ্ডা লাগবার ভয়ে। আমি স্নান করবার পর খাবার টেবিলে বসে বললুম– দারোগা ভদ্রলোক যেভাবে কেস দাঁড় করালেন, আমার খটকা থেকে গেল কর্নেল।
কর্নেল তাকালেন।
বললুম– প্রণয়ী শমীককে নিয়ে এসে স্বামীকে ডেকে এনে খুন করাল প্রণতি এই হলো দারোগাবাবুর বক্তব্য। কিন্তু রাতে শমীকের সঙ্গে ঝগড়াঝাটির অর্থ কী? তাছাড়া শমীক বলছিল, এ জন্যে তুমিই দায়ি…
কর্নেল পকেট থেকে সেই চক পাথরটা বের করেছেন দেখে থেমে গেলুম। কর্নেল টেবিলে লিখলেন, খাওয়ার সময় মুখ বুজে থাকা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। তৃপ্তির সঙ্গে খেতে হলে কথা বলা উচিত নয়। বদ্রীর রান্নাও অতি উপাদেয়।
