ক্ষুব্ধমুখে চুপচাপ বসে রইলুম। বাইরে ঝড়বৃষ্টি তুমুল চলতে থাকল। বজ্রপাত এবং মেঘের গর্জনে পৃথিবী কাঁপতে থাকল।
কতক্ষণ পরে বদ্রীর সাড়া এল দরজার বাইরে। দরজা খুললে সে ট্রে ভর্তি চাপাটি আর আলুর দম নিয়ে ঘরে ঢুকল। ঝড়টা কমেছে। কিন্তু ছিটেফোঁটা বৃষ্টি সমানে ঝরছে। বদ্রী বলল, তাহলে আপনারা খেয়ে নিন স্যার। দরকার হলে ঘণ্টার বোতাম টিপবেন।
বললুম– পাশের ঘরের ওঁদের খাওয়া-দাওয়ার কী হচ্ছে বদ্রী?
বদ্রী চোখ নাচিয়ে বলল, ক্যা মালুম! ওনারা রাতে কিছু খাবেন না বলেছেন।
দরজা বন্ধ আছে দেখলে?
জী হাঁ।
বদ্রী চলে যাচ্ছিল, ডাকলুম–শোনো।
বলুন স্যার!
কিছুক্ষণ আগে কে চেঁচিয়ে উঠল মনে হলো। শুনছ?
বদ্রী হাসল।…..ও কিছু না স্যার। ঝড়ের রাতে এমন আজব শব্দ হয়। শুনতে নেই।
সে চলে গেলে কর্নেল উঠলেন। বললেন, জয়ন্ত! তুমি কি ভাবছ, ডমরুনাথে এসে তোমার দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার জন্য কিছু লোভনীয় রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে?
হাসতে হাসতে বললুম– আপনার গলা বেশ ভেঙে গেছে কর্নেল!
আরও ভাঙবে। সকালে হয়তো আর কথাও বলতে পারব না। কর্নেল টেবিলে ট্রের দিকে ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে বললেন। হুম! তাই আগে থেকে বলে রাখি, অকারণ পাশের ঘরে নাক গলিও না। বিপদে পড়বে। এবং সে বিপদে বৃদ্ধের সাহায্য পাবার আশা বৃথা। কারণ তার প্রচণ্ড কাশিজনিত স্বরভঙ্গ আসন্ন। গলার স্বর না। থাকলে গোয়েন্দাগিরিতে কোনও সুফল ফলে না।
কোনও কথা বললুম– না। কিন্তু বিপদে পড়ার কথা কেন বলছে কর্নেল, একথা ভেবেই কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। তাছাড়া স্বরভঙ্গের সঙ্গে গোয়েন্দাগিরির বৈরীভাবের কারণ কী, তাও বুঝলুম না।
.
০২.
রাতে উল্লেখযোগ্য আর কিছু ঘটল না, কর্নেলের কাশিও বিশেষ শুনলুম না। তবে একবার মনে হয়েছিল, বাইরে বারান্দায় কার বা কাদের চলাফেরার শব্দ শুনছি। ভাল করে শোনার আগেই সেটা থেমে গেল।
আমার ঘুম ভাঙে দেরিতে। অভ্যাস মতো লক্ষ্য করলুম, প্রকৃতিবিদ নিত্য নৈমিত্তিক প্রাতঃভ্রমণে গেছেন। দরজা ভেজানো রয়েছে।
থাক গে, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। ভেবেছিলুম, কাশিটা রাতারাতি বেড়ে যাবে। বাড়েনি এবং জ্বরজ্বালা এসে কাহিল করেনি বুড়োকে। করলে এ বিদেশ বিভুয়ে কেলেংকারি হতো। ভ্রমণের আনন্দ মাঠে মারা যেত।
প্রকৃতি আজ হাসিখুশি ও পরিচ্ছন্ন। আকাশ পরিষ্কার নীল। রোদে ভেসে যাচ্ছে পাহাড় ও সবুজ বনস্থলী। হিমালয় জঙ্গলের তাবৎ পক্ষিকুল যেন এক সঙ্গে গলা ছেড়ে গান ধরেছে।
একটু পরে বদ্রী দিনের প্রথম সেলামসহ চা দিতে এলে বললুম– খবর বলল বদ্রী!
বদ্রী হাসল। সে টের পেয়েছে, আমি কী জানতে চাইছি। বলল, খবর ভাল স্যার! পাশের ঘরের বাবুসাবকে দেখতে পাচ্ছি না। মেমসাব একা আছেন। উনিও ভি চলে যাবেন বললেন। বেলা সওয়া ন’টায় বাস আসবে। বাসে তুলে দিতে হবে ওনাকে।
বদ্রী চলে গেলে একটু নিরাশই হলুম। নাটকটা জমল না।
চা খেয়ে সিগারেট টানতে টানতে বেরোলুম। বারান্দা থেকে লনে নামতেই পেছনে আস্তে কেউ ডাকল-শুনুন!
ঘুরেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম–প্রণতি! তুমি এখানে!
প্রণতিও ভীষণ অবাক হয়ে গেল। দরজা থেকে পর্দা তুলে আমাকে ডেকেছিল– এখন ছিটকে বারান্দায় বেরিয়ে এল। বলল, জয়ন্ত! তুমি এখানে?
প্রণতির গলার স্বর কাল রাতে কেন চিনতে পারিনি, তার কারণ নিয়ে মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ বাহুল্য। আসলে এমন একটা দুর্গম জায়গায় তার অস্তিত্ব স্বপ্নেও ভাবা যায় না।
কো-এডুকেশনের কলেজে প্রণতি আমার সহপাঠিনী ছিল। তার সঙ্গে প্রেম করার কথা ভুলেও ভাবিনি কোনওদিন। তবে তার প্রতি মোহ ছিল না এমন নয়। সে-মোহ ওর সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি। তাছাড়া আমাকে সে পাত্তা দেবেই বা কেন? এম. এ. পড়তে গিয়ে লক্ষ্য করেছিলুম, প্রণতি পিছিয়ে পড়েছে। আমার মতো সেও ইংরেজি নিয়ে পড়ত। তার পিছিয়ে পড়ার কারণ শুনেছিলুম বিয়ে। যতদুর জানতুম, সে ছিল একটা সওদাগরী আপিসের সাধারণ কেরানীর মেয়ে। এক্ষেত্রে মেয়ের সৌন্দর্য থাকলে নিম্নবিত্ত অভিভাবকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন না।
প্রণতির বিয়ের নেমন্তন্ন আমি পাইনি। তার সঙ্গে বেশ কয়েকটা বছর দেখা হয়নি। গত বছর রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। কিন্তু তার সেই উজ্জ্বল লাবণ্য আর তত ছিল না। গায়ে মেদও জমেনি। বরং আরও রোগা হয়ে গেছে। কারণ হিসেবে সে অসুখ বিসুখের কথাই বলেছিল। স্বামী সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলেনি। তখনই আমার মনে হয়েছিল, দাম্পত্য জীবনে প্রণতি সুখী নয় হয়তো।
ডমরুনাথে এসে তার সঙ্গে এ-ভাবে দেখা হওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। প্রণতির চেহারা গতবছর যেমন দেখেছিলুম, প্রায় তেমনি রয়েছে। প্রথম বিস্ময় কেটে যাবার পর আমরা বারান্দার চেয়ারে বসলুম। তারপর প্রণতি ডমরুনাথে আসার কারণ যা বলল, তা এই: তার স্বামী নীতিশ ইঞ্জিনিয়ার। এখান থেকে তিন মাইল দূরে সারাঙ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সে সম্প্রতি বদলি হয়ে এসেছে। সারাঙে যেতে হলে ডমরুনাথে নামতে হয়। এখান থেকে দুর্গম পাহাড়ি পথ। তাই বিকেলে পৌঁছে এই বাংলোয় আশ্রয় নিয়েছে। খবর না দিয়ে আসার জন্য এই গণ্ডগোল। ভোরে খবর পাঠিয়েছে। নীতিশ জিপ নিয়ে এসে যাবে–সেই প্রতীক্ষা এখন।
