তাছাড়া আর কেন এখন ডমরুনাথে লোকে আসবে? আপনারাও তো এসেছেন। বলে বদ্রী রহস্যময় হেসে চলে গেল।
বৃদ্ধ গোয়েন্দা এবার আরেক দফা কেসে আস্তে বললেন, তোমায় রীতিমতো উত্তেজিত মনে হচ্ছে ডার্লিং। তবে একটা কথা বলি শোনো। নরনারীর ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো অভদ্রতা। সুতরাং আশা করি আজ রাতে যদি তেমন কিছু ঘটেও–তুমি যেন ব্যস্ত হয়ো না!
আমি একটু অবাক হয়ে বললুম– এর অর্থ?
অতি সরল। বলে উনি কফির সঙ্গে সেই লাল গুলিও ফের মুখে চালান করলেন।
সিগারেট ধরিয়ে হাসতে হাসতে বললুম– আপনি কি গণক, না অন্তর্যামী? কারা ও-ঘরে এসেছে, আমরা এখনও তাদের চাক্ষুষ পর্যন্ত করিনি। অথচ আপনি দৈববাণী করছেন যে, আজ রাতে কিছু ঘটতে পারে।
বৃদ্ধ চোখ বুজে গুলি চুষতে থাকলেন। হাঁটুর ওপর কফির পেয়ালা। পেয়ালার ভাপ নিচ্ছেন হাতে এবং সেই হাত মাঝে মাঝে গালে ও কম্ফোর্টার সরিয়ে গলায় বুলোচ্ছেন।
ডাকলুম, কর্নেল!
বলো জয়ন্ত! ঐ দৈববাণীর কারণ কী?
কর্নেল চোখ খুলে একটু হাসলেন। বললেন, তোমার উত্তেজিত চেহারা দেখে যা মনে এল, বলেছি ডার্লিং!
ভ্যাট! আমার চেহারায় কিছু নেই।
গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন, যখন তুমি বারান্দায় গেলে, তখন তোমার চেহারায় প্রশান্তি ছিল। যখন তুমি ঘরে ঢুকলে, তখন তোমার চেহারায় রীতিমতো উত্তেজনা ছিল। তারপর তুমি বদ্রীকে জেরা করতে শুরু করলে। সব মিলিয়ে আমার মনে হলো, বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি ও-ঘরে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আড়ি পেতেছিলে! নিশ্চয় তেমন কিছু কানে এসেছিল তোমার–যাতে…
বাধা দিয়ে হাসতে হাসতে বললুম– হার মানছি। কিন্তু হে বৃদ্ধ ঘুঘুমশাই। ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি বড্ড গোলমেলে। আমি অকারণে উত্তেজিত হইনি!
কর্নেল চোখ বুজে বললনে, বলে যাও ডার্লিং! আমি সবকিছুতেই আগ্রহী।
চাপা গলায় বললুম– ওঁরা ভীষণ ঝগড়াঝাটি করছিলেন। কারণটা বোঝা গেল না। ভদ্রলোক বলছিলেন, তুমি নিজেই এ জন্যে দায়ী, এ সব কথা আগে জানলে কিছুতেই আমি আসতুম না এখানে। ভদ্রমহিলা বলছিলেন, ন্যাকামি কোরো না! তুমি জেনেশুনেই এসেছ। তুমি কী তা এতদিনে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছি। তারপর শুনি, ভদ্রলোক ক্ষেপে গেছেন যেন। বললেন এখনই আমি চলে যাচ্ছি। থাকো তুমি একা! বিশ্বাসঘাতিনী মেয়ে কোথাকার! তারপর ভদ্রমহিলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
হুঁ। ইন্টারেস্টিং। তারপর?
তারপর আর কোনও সাড়াশব্দ ছিল না। চলে এলুম।
কর্নেল কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, বদ্রীও কী যেন আঁচ করেছে মনে হলো। কেমন হাসছিল।
এই সময় কড় কড় কড়াৎ করে মেঘ ডাকল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে বাতাসের শোঁ শোঁ শোনা গেল। জানলাগুলো বন্ধই ছিল। দরজার পর্দা দুলে উঠল। তখন দরজা বন্ধ করে দিলুম।
কর্নেল বললেন, সন্ধ্যা থেকে টিপটিপ করে ঝরছিল। তখনই বুঝেছিলুম, রাতের দিকে অবস্থা যোরালো হবে। জয়ন্ত তরাই অঞ্চলের পাহাড়ে ঝড়বৃষ্টির রাত বড় রোমাঞ্চকর। ওই শোনন, বাবা ডমরুনাথ ডমরু বাজিয়ে এবার বেজায় রকমের একটা নাচ জুড়বেন। খাসা!
বাইরে বাতাসটা বাড়তে থাকল। তার সঙ্গে মুহুর্মুহু বজ্রপাত এবং মেঘের গর্জন শুরু হলে বাংলো কাঁপতে থাকল। বললুম– সর্বনাশ! সেবার এ তল্লাটে এসে সাতদিন আটকে গিয়েছিলুম মনে পড়ছে কর্নেল? ধস ছেড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবারও তাই হবে নাকি?
হলেও অবাক হব না। কর্নেল নিরাসক্তভাবে বললেন।
তবে স্বস্তির কারণ, ওঁর কাশিটা কমেছে। আমি পা ছড়িয়ে আরাম পাওয়ার চেষ্টায় সিগারেট ধরালুম। কিন্তু মনের ভেতর পাশের ঘরের সেই তর্কাতর্কি সারাক্ষণ প্রতিধ্বনি করে চলেছে। একটা যুক্তিসঙ্গত ঘটনা দাঁড় করার চেষ্টা করছি। কিন্তু দাঁড়াচ্ছে না। ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাকে কিসের জন্য দায়ী করেছে? কী জানতে পারলে এখানে আসতেন না? আর ভদ্রমহিলাই বা কেন বলছেন, জেনেশুনেই এসেছ তুমি! ব্যাপারটা কী হতে পারে?
এতকাল ধরে গোয়েন্দার সঙ্গগুণে সবতাতে কৌতূহলী হওয়ার স্বভাব আমাকে পেয়ে বসেছে। ঝোঁকের মাথায় উঠে দাঁড়ালুম। কর্নেল চোখ বুজে শরীর এলিয়ে বসে আছেন। বর্ষাতিটা গায়ে চড়িয়ে দরজার দিকে এগোলে বললেন, বেরিয়ো না জয়ন্ত। ঝড়ে উড়ে যাবে। তাছাড়া কৌতূহল জিনিসটা অনেক সময় অকারণ বিপদে ফেলে। চুপ করে বসো।
কথা কানে নিলুম না। দরজা খুলতেই ভেজা পর্দা গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। কর্নেল বিরক্ত হয়ে ফের বললেন, তুমি দেখছি কেলেংকারি না বাধিয়ে ছাড়বে না জয়ন্ত! লক্ষ্য করেছ কি, আমার স্বরভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ? যে ঠাণ্ডা বাতাসটা এইমাত্র ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে, আজ রাতে সে আমার গলার বারোটা বাজাবে। দরজা বন্ধ করো শীগগির!
দরজা বন্ধ করার মুখে আবছা একটা চিৎকার কানে এল যেন। ভুল হতেও পারে। কিন্তু গা শিউরে উঠেছিল। দরজা বন্ধ করে বললুম– কে চেঁচাল, শুনতে পেলেন?
কর্নেল ওভারকোটের কলার আরও তুলে মাথার দুপাশটা ঢেকে বললেন, না।
আমার ধারণা পাশের ঘরে একটা কিছু..।
কথা কেড়ে বৃদ্ধ গোয়েন্দা বললেন, শুনেছি ডমরু পাহাড়ে ঝড়ের রাতে অনেক বিদঘুটে চিৎকার শোনা যায়। ভূতপ্রেত থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাবা। ডমরুনাথ স্বয়ং মহাদেব কি না!
