আহ! এতক্ষণে জিপের শব্দ কানে এল। সামরিকবাহিনীর এই বিশেষ জিপের চাকা চওড়া এবং ভীষণ রুক্ষ। বালিতেও ছুটতে পারে। কোলমের আর্মি কামান্ডার রাজেন্দ্র সিং দলবল নিয়ে ঘিরে ফেললেন। রাজেন্দ্র, সহাস্যে বললেন, আমার ভয় হচ্ছিল নায়েক তার জঙ্গি কমান্ডো নিয়ে না হাজির হয়। দূর থেকে দেখলাম, দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে। যাগে। রক্তপাত হল না।
রাজেন্দ্রকে ফাইলটা দিয়ে বললাম, এটা জেরক্স কপি। আসলটা ডঃ রেড্ডি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। টাকার লোভও ছিল। আবার ভয়ও ছিল। এনি ওয়ে, এতে অনেক বে-আইনি অস্ত্র মজুতের ঘাঁটি চিহ্নিত করা আছে। আরও অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন। আমি চলি।
ছোট্ট বাহিনীটি এই অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ কর্নেলকে সামরিক রীতিতে অভিবাদন জানাল। আমিও প্রত্যুত্তর দিলাম। তারপর বালিয়াড়ি পেরিয়ে পিচরাস্তার দিকে হাঁটতে থাকলাম। হ্যাঁ, জেলেবসতি দিয়ে ওই বালিয়াড়িতে এলে আমার অবস্থা রেড্ডি সায়েবের মতো হত।
সোনার ডমরু
০১.
ডমরুনাথ নেপাল সীমান্তে একটি প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র। কিন্তু জনসমাগম বছরে সেই একবার-বৈশাখ মাসে বাবা ডমরুনাথের পুজো উপলক্ষে। বাকি এগারো মাস খাঁ খাঁ নিঃঝুম অবস্থা। আড়াইহাজার ফুট পাহাড়ের মাথায় বাবার মন্দির। ঘোরালো একফালি রাস্তা পাহাড় ঘুরে ঘুরে এগিয়ে গেছে ওপরে। মোটরগাড়ি নিয়েও অনায়াসে ওঠা যায়।
ছোট্ট একটা বাজার এবং বস্তী রয়েছে ডমরু পাহাড়ের পাদদেশে। সেখান দিয়েই গেছে নেপালগামী একটা পিচের সড়ক।
অক্টোবরের এক বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যায় আমি আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ভাড়া করা জিপ থেকে নামলুম। যে বাংলোয় আমরা উঠব, সেটা খুব কাছেই একটা টিলার ওপর। জিপের ড্রাইভার বুষ্টু সিং এবং তার ছোকরা অ্যাসিস্টান্ট হরিয়া তাদের প্রতিশ্রুতি মতো আমাদের অল্পস্বল্প মালপত্তর সেখানে পৌঁছে দিল। ওরা যত ভিজল, আমরা তত ভিজলুম না। কারণ আমাদের গায়ে বর্ষাতি চাপানো। কিন্তু বাংলোর বারান্দায় উঠেই আমার বন্ধুটি ভীষণ কাশতে শুরু করলেন।
চৌকিদার বদ্রীনাথ বয়সে প্রৌঢ়। পেটাই শরীর। বেঁটে, এবং মুখের গড়ন কিঞ্চিৎ বর্তুলাকার। তাকে অমায়িক ও আমুদে লোক বলে মনে হলো। সে আমার সঙ্গী ভদ্রলোকের কাশি দেখে কেন কে জানে হাসি চাপছিল। একটু পরে অনুমান করলুম সম্ভবত কাশির শব্দটাই তার হাসির কারণ।
হাসি আমারও পাচ্ছিল। কারণ, এযাবৎকাল এই খ্যাতনামা গোয়েন্দা এবং প্রকৃতিবিদ বৃদ্ধলোকটির এমন দুরবস্থা কখনও প্রত্যক্ষ করিনি। কাশতে কাশতে উনি যেভাবে ঝুঁকে পড়ছিলেন ভয় হচ্ছিল, দম আটকে বেঘোরে মারা না পড়েন। কিন্তু কাশি থামার সঙ্গে সঙ্গে ওঁর দুচোখে সেই সুপরিচিত উজ্জ্বল হাসি ছলছল করে উঠছিল। এ হাসি প্রতিফলনের দরুণ দ্বিগুণ উজ্জ্বল-জলে আলোর ছটা পড়লে যা হয়। ওঁর চোখে কাশি জনিত জল ছিল।
অক্টোবরেই উচ্চতার দরুন এ তল্লাটে আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। তার ওপর এই বৃষ্টি। শূন্য ফায়ারপ্লেসের দিকে চেয়ে আমি একটা মতলব ভঁজছি টের পেয়ে উনি বললেন, দরকার হবে না ডার্লিং! বরং তুমি বদ্রীকে বলল, ঝটপট কফিটা নিয়ে আসুক। আর শোনো, আমার কিটব্যাগ খুলে ডানদিকে খোপ থেকে ক্ষুদে শিশিটা বের করো।
বদ্রীর উদ্দেশ্যে হাঁক মেরে জলদি কফি করতে বলার পর কিটব্যাগ খুলে। শিশিটা এনে দিলুম। টেবিলের পাশে পা ছড়িয়ে আরাম কেদারায় বসে উনি শিশি থেকে লালরঙের কয়েকটা গুলি বের করলেন। মুখে ফেলে চুষতে থাকলেন।
জিজ্ঞেস করলুম, হাই ওল্ড ম্যান! বস্তুটি কি তানসেন গুলি?
টাকওলা প্রকাণ্ড মাথাটি দোলালেন মাত্র। তারপর অভ্যাসমতো সাদা দাড়িগুলোতে আঙুল বোলাতে থাকলেন। আমি বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখতে থাকলুম।
বৃষ্টিঝরা অন্ধকার রাতে ডমরুনাথকে রহস্যময় দেখাচ্ছিল। একটু নীচে ওই বস্তী ও বাজারে সামান্য কয়েকটা আলো আবছা ঝিকমিক করছে। শুনেছি, তিনমাইল দূরের হাইড্রো-ইলেকট্রিক সেন্টার থেকে এখানে বিদ্যুৎ আসে। আসার কারণ বাবা ডমরু ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। সেই সুবাদে এই বাংলোও বিদ্যুৎ লাভে বঞ্চিত হয়নি।
এই সময় হঠাৎ কানে এল পাশের বদ্ধ ঘর থেকে কাদের কথাবার্তা চলেছে। আড়িপাতা স্বভাব আমার নয়। কিন্তু ওই কথাবার্তা স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা, একটি কণ্ঠ মহিলার।
অনেক সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও অন্যদের আলোচ্য কানে এসে ঢোকে এবং কিছু করার থাকে না–নেহাত শুনে যাওয়া ছাড়া। বদ্রীর কফি করতে মিনিট সাতেক লাগল। তার মধ্যে আমি অনেকগুলো কথা শুনে ফেললুম।
কিছুক্ষণ পরে কফি খাচ্ছি, গোয়েন্দাপ্রবর মাঝেমাঝে অদ্ভুত শব্দে কেশে উঠছেন–বদ্রী এসে জিজ্ঞেস করল, সায়েবরা সঙ্গে রাতের খাবারদাবার এনেছেন, নাকি তাকে খানার বন্দোবস্ত করতে হবে?
আমরা কিছু আনিনি এবং তাকেই সব ব্যবস্থা করতে হবে, শুনে সে চলে যাচ্ছিল। আমি ডাকলুম, বদ্রী, শোনো।
বদ্রী জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
বললুম– পাশের ঘরে কারা এসেছেন মনে হলো?
হ্যাঁ স্যার। ওনারাভি বাঙালী আছেন। কলকাতা থেকে আজ সকালে এসেছেন।
স্বামী স্ত্রী?
বদ্রী কেমন হাসল শুধু।
স্বামী-স্ত্রী নয়?
বদ্রী ফের হেসে বলল, নয়–তা তো বলিনি স্যার!
বেড়াতে এসেছেন বুঝি?
