আবার একটু দ্বিধা যেন। তারপর নায়েক বলল, কত দিতে হবে?
এক লাখ।
ঠিক আছে। ভোর পাঁচটায় জেলে বস্তির পশ্চিমের বালিয়াড়িতে যাবেন। দেখা হবে।
আপনার নিজে আসা চাই।
বোকার মতো কথা বললেন না। আমি নিজেই সমস্যার সমাধান করি।
তাহলে সেই কথা রইল। রাখছি।
টেলিফোন রেখে দিলাম। আজ ইচ্ছে করেই বেরোইনি। শান্তনুর কোয়ার্টারের বাইরে থেকে ওই বারান্দাটা দেখা যায় না। বাউন্ডারি ওয়ালের তারকাটা ঘন ঝুমকোলতায় ঢাকা এবং দেবদারু গাছগুলোও পরস্পর গাড় আলিঙ্গনাবদ্ধ। লনের দুধারে উঁচু রঙ্গনা এবং ঝাউ। বারান্দাটা গেট থেকে সরাসরি নজরে আসে না।
ফিরে গিয়ে দেখি, তেলেভাজা এবং পপিরভাজা খাওয়া হচ্ছে। ডঃ পোট্টেকাটের পাশে বসে আস্তে বললাম, একটা অনুরোধ। আপনার এবং শান্তনুর নিরাপত্তার স্বার্থে বলছি। নায়েকের ডিনারে যেন ভুলেও আমার কথা বলবেন না। বরং ভুলে যান, আপনার সঙ্গে আমার দেখা বা আলাপ হয়েছে।
ডঃ পোট্টেকাট দ্রুত বললেন, আমি কি রেড্ডির মতো উন্মাদ?…
.
আমার কিটব্যাগে অনেক জিনিস থাকে। কখন কী কোন প্রয়োজনে লাগে, ঠেকে শিখেশিখে জোগাড় করেছি। শান্তনুকে বলা ছিল। রাত চারটায় বেরোলাম। ওকে কিছু জানাইনি। তাই তার মুখে উদ্বেগ লক্ষ্য করলাম। সে একবার বলল, আমি যেতে পারি, যদি বলেন। তাকে ইশারায় থামিয়ে দিলাম।
কুম্ভকোণমের ম্যাপটা দেখে রেখেছিলাম। কিন্তু সতর্কতার জন্য সংকীর্ণ রাস্তার ধারে যত্নে সাজানো গাছপালার ছায়ায় হাঁটছিলাম। সরকারি কোয়ার্টার এলাকার পর পাথর, বালি এবং কাশবনে ঢাকা অসমতল জমিটা পেরিয়ে কাটাতারের বেড়া। দূরে-দূরে আলো। গুঁড়ি মেরে এগিয়ে নিচের বিদ্যুৎবাহী তারটা খুঁজে বের করলাম। তারপর রবারের দস্তানা পরে প্রথমে বাঁদিকের লোহার খুঁটির গায়ে আটকানো বিদ্যুতের তারটা কেটে সাবধানে একটুকরো পাথরে রাখলাম। ঈষৎ ঝিলিক দিয়েছিল। প্রায় দশ ফুট দূরে ডাইনের খুঁটিতে আটকানো সেই তারের অন্য অংশটা কেটে ফেললাম। এখানেও ঈষৎ ঝিলিক দিল বিদ্যুৎ। কিন্তু বিদ্যুত্বহী তারের দুটো দিক নন-কন্ডাক্টিভ রবারের মুখে থেকে গেল। কাঁটাতারটা কাশবনে ছুঁড়ে ফেললাম। দ্বিতীয় বিদ্যুত্বহী তারটা প্রায় তিন ফুট উঁচুতে। ওটা কাটার দরকার ছিল না। এবার নিচের দিক থেকে দুসারি কাটাতার একবার কেটে দেওয়াই যথেষ্ট। এবারে সরীসৃপের মতো ঢোকা সহজ হবে।
প্রায় আধঘণ্টা লেগে গেল। কাঁটাতার দুটো টেনে মুচড়ে সরালাম। পেরিয়ে যেতে একটুও অসুবিধে হল না। সামরিক জীবনে এ কাজ অজস্রবার করতে হয়েছে।
বালিয়াড়িতে গুঁড়ি মেরে এগোতে হচ্ছিল। কারণ কৃষ্ণপক্ষের একফালি পাণ্ডুর চাঁদ আমার গতিপথের ওপর ঝুলে আছে। খুঁজে একটা গর্ত মতো পাওয়া গেল। এই সব সামুদ্রিক বালিয়াড়িতে সাপ থাকে। খুদে টর্চের আলোয় দেখে নিলাম জায়গাটা। ওপরে ঢেউ খেলানো উঁচু বালির ঢিবি। কোথাও লম্বাটে, কোথাও ক্রুপের মতো। পৌনে পাঁচটা বাজে।
এখান থেকে জেলেবসতির টিলা এবং গির্জাঘরটা দেখা যাচ্ছিল। ক্রমে ভোরের আলো ছড়িয়ে আসছিল। এবার বাইনোকুলারে যতটা দেখতে পাওয়া সম্ভব, দেখতে থাকলাম।
অন্তত দুটো ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। জগদীশ নায়েক জঙ্গি কমান্ডো বাহিনী সঙ্গে আনবে না। কারণ আমার নামের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আছে। দ্বিতীয়টা পরে বলছি।
পাঁচটায় গির্জার ঘণ্টা বাজল। জার্মান মনোবিজ্ঞানী জুংয়ের একটা কথা মনে পড়ছিল। তাঁর এক আত্মীয় তাঁকে একদিন হঠাৎ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে বলেন, শয়তান নরকে আত্মাদের কীভাবে পীড়ন করে জানো? তাদের সে অপেক্ষা করিয়ে রাখে। হি কি দেম অ্যাওয়েটিং! আহ, এই অপেক্ষা করে থাকার মতো অত্যাচার সত্যি আর নেই। প্রতিটি সেকেন্ড একেকটি ঘণ্টার মতো দীর্ঘ।
সওয়া পাঁচটায় হঠাৎ চোখে পড়ল, টিলার ঢালে একটা পাথরের আড়ালে গুঁড়ি মেরে বসে আমার মতোই বাইনোকুলারে জগদীশ নায়েক বালিয়াড়ি দেখছে। পরনে শর্টস। কাঁধে একটা ছোট্ট ব্যাগ। হুঁ, এক লাখ টাকা!
সে নিশ্চিত হওয়ার পর উঠে দাঁড়াল। আমিও উঠে সামনের বালির ক্রুপের ওপর গেলাম। দেখতে পেয়ে সে জগিংয়ের ভঙ্গিতে নেমে এল। তারপর প্রায় পাঁচ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে বলল, ফাইলটা দেখতে চাই।
তার দিকে সাবধানে লক্ষ্য রেখে জিপ টেনে ফাঁক করে জ্যাকেটের ভেতর। থেকে ফাইলটা বের করলাম। ফিতে খুলে ভেতরটা দেখিয়ে দিলাম। সে কয়েক পা এগিয়ে এল।
আগেই আভাস দিয়েছি, এবার সে কী করবে সেই বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম। তাই মুহূর্তে রিভলবার বের করে বললাম, ডুয়েলে হেরে যাবে নায়েক! পকেট থেকে খালি হাত বের কর। হাতের সঙ্গে পয়েন্ট ২২ ক্যালিবারের রিভলবারের বাঁট দেখামাত্র হাত গুঁড়ো করে দেব। আর তোমার ওই খালি ব্যাগটা ফেলে দাও। এক লাখ টাকা বলা মাত্র তুমি রাজি হওয়ায় আমি জানতাম তুমি কী করবে। হাত ওঠাও! তোমার মতো জঘন্য খুনীকে এখানে কুকুরের মতো মেরে ফেলে রেখে যেতে আমার হাত কাঁপবে না। ওঠাও হাত!
সে দুহাত তুলল। তার চোখে অসহায় ক্রুরতা ঝিলিক দিচ্ছিল। তবে আমি খালি হাতেও ওকে ধরাশায়ী করতে পারি। কয়েক ঘণ্টার জন্য অজ্ঞান করে ফেলে রাখতে পারি। কিন্তু ওই যে বলেছি, অপেক্ষা করতে হবে।
তাই বললাম, আমার এটা পয়েন্ট ৩৮ ক্যালিবারের। কাজেই তুমি ডঃ রেড্ডির ক্ষেত্রে যা করেছ, আমার ক্ষেত্রে তা করে লাভ হত না। তুমি ওঁর ডানপাশে জগিং করতে করতে হঠাৎ তোমার ফায়ারআর্মস থেকে গুলি করেছিলে। তারপর ওঁর শর্টসের পকেট থেকে ওঁর অস্ত্রটা বের করে এক রাউন্ড ফায়ার করে ডান হাতের কাছে ফেলে রেখেছিলে। ওঁর রিভলবার কত ক্যালিবারের তুমি জানতে পেরেছিলে। কিন্তু হঠাৎ হত্যার চমৎকার মওকা পেয়ে একটা মত ভুল করে ফেলেছিলে। এই ধরনের ভুল সব অপেশাদার খুনীই করে। আকস্মিকতার ধাক্কায় বুদ্ধি গুলিয়ে যায়। তুমি জানতে, ডঃ রেড্ডি লেফট্যান্ডার। কিন্তু সে মুহূর্তে কথাটা তোমার মনে পড়েনি। পরে সময় মতো পুলিশকে চুপ করিয়ে দিয়েছ। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী এবং শিল্পপতি বলে কথা! কিন্তু আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আমি অন্য ধাতুতে গড়া।
