—না। যতটা ওরা দিয়েছিল তার হিসেবটা তো ওই বাউল নেতা আমাদের বলেনি। শুধু কথা হয়েছিল পনেরো দিনের প্রোগ্রাম আর দশ হাজার নগদ টাকা।
—সেটা পেয়েছিলে তো?
—না। দিয়েছিল শেষ পর্যন্ত আট হাজার। দু’হাজার নিয়ে নিয়েছিল। কি করব? বিদেশ বিভুঁই, কাউকে চিনি না, ভাষা জানি না, অসহায়। তারপর ধরুন চটে গেলে ভবিষ্যতে আর দলে নেবে না। আমি তো সাধক বাউল নই, গায়ক, বলতে পারেন সাজা বাউল। গৃহী মানুষ। তিনটে কন্যা সন্তান। তাদের বিয়ে দিতে হবে, তাই টাকা চাই। গরিব মানুষ আমি, জাতে দুর্লভ মানে দুলে। পরের জমিতে মুনিশ খাটি দৈনিক তিরিশ টাকা রোজে। আট হাজার টাকা কখনও দেখেছি একসঙ্গে?
—ওখানে কী রকম সমাদর পেলে?
—খুব সমাদর, বলতে পারেন পাগলের মতো ওদের উচ্ছ্বাস আর নাচানাচি। সত্যি বলতে কি দাদা, সমাদর আমার এখানেও খুব। সারারাত গাইলেও গ্রামের শ্রোতারা শুনে যাবে, সাধুবাদ দেবে, তবে ওই পর্যন্তই। গরিব মানুষ তারা, শুষ্ক সমাদর তাই। দেবে যে কিছু পাবে কোথায়? তা ছাড়া সারাবছর তো তারাই দিচ্ছে, মাধুকরীর অন্নসেবা। কিন্তু বিদেশে অন্য ব্যাপার। গান শেষ হলে ওরা মঞ্চে উঠে পাগলের মতো চুমো খায়। হ্যাঁ, মেয়েরাও। সে কি অস্বস্তি দাদা— আমাদের তো অব্যেস নেই, লজ্জা করে।
—আর কী হয়?
—কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে দেয়, গায়ের সোয়েটার বা কোর্ট খুলে পরিয়ে দেয়, হাতে ধরিয়ে দেয় দামি টেপরেকর্ডার। আরও কত কী উপহার দেয়— শার্টের কাপড়, প্যান্টপিস, ঘড়ি। সেগুলো নিয়ে আমি কি করব? রাখব কোথায়? তাই গাঁয়ে এসে বেচে দিয়ে হাজার পাঁচেক টাকা পেয়েছিলাম। তারপরের ঘটনা বড় দুঃখের।
—কী রকম?
—ধরুন তা হাজার পনেরো টাকা জমা রেখেছিলাম সোনামুখির গ্রামীণ ব্যাঙ্কে। বড় খুকির বিয়ে ঠিক করে ফেললাম ওই টাকার ভরসায়। ছেলে দেখা হল, পাকা কথা হল, বিয়ের দিন ধার্য হল। সবই দেখুন ওই গুরুর কৃপা, ওই দেখুন আমার গানের গুরু ত্রিলোকেশ্বর বাউল ছবিতে রয়েছেন। এখন তো দেহ নেই, অপ্রকট, তাঁর কাছে এই সামান্য দুলের ছেলে গান শিখেছিলাম। লাঙলটানা আর কাস্তেধরা দু’হাত আমার, তাঁর কৃপায় সেই হাতে উঠেছে দোতারা। গুরুর কৃপায় সুধন্যদাসের মতো দোতারা এ দিগরে কে আর বাজাতে পারে? অথচ সেই কাজ প্রথমে কত কঠিন ছিল।
—কেন?
—গোড়াতেই কি দোতারা দাদা? প্রথমে দশ-এগারো বছর বয়সে টিনের কৌটোতে বাঁশের ফালি বেঁধে, তাতে মাছধরা সুতোর তার বানিয়ে তৈরি করেছিলাম খমক। আগে সেই খমক বাজিয়েই গাইতাম। পরে, অনেক পরে, শুশুনিয়া পাহাড়ের নীচের গাঁ কাটিগড়ে ওস্তাদের কাছে দোতারা শিক্ষা। দোতারার সুরে গান শুনে বশ হলেন গুরু ত্রিলোকেশ্বর গোঁসাই। তার থেকে এত নাম, যশ, মান— বিদেশ যাওয়া, টাকা রোজগার— প-নে-রো-হা-জা-র। কিন্তু শেষমেশ সইল না।
—কী হল?
—মেয়ের বিয়ের সাতদিন আগে সোনামুখি গিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে টাকাটা তুললাম। খরচপাতি, গয়নার দাম, ঘর সারানি এসব করতে হবে তো। কিন্তু সেই রাতেই বাড়িতে ডাকাত পড়ল। সর্বস্ব নিয়ে গেল দাদা। রাগে দুঃখে আমি বাস্তুগ্রাম ছেড়ে দিয়ে সোনামুখিতে ঘর বানিয়েছি। আর ও-মুখো হই না।
—কেন? গাঁয়ের কী দোষ?
—গাঁয়ের মানুষই তো ডাকাতি করেছিল। ঈর্ষা, হিংসা। ওই যে বিদেশ গিয়ে নামযশ খুব হয়েছিল— সেটা সইল না মানুষের। অথচ আমরা প্রায়ই গাই ‘ভজো ভজো মানুষ ভগবান।’ মানুষের যা সব রূপ দেখলাম এ জীবনে।
বাউল ফকিরদরবেশদের চেতনায় মানুষ একটা বহুদ্যোতনাময় কনসেপ্ট, তার আবার দেহতত্ত্বগত প্রতীকী অর্থও আছে। ‘ভজো ভজো মানুষ ভগবান’ আর ‘মানুষরত্ন সযত্ন করলে না’ এই দুই উচ্চারণে মানুষ শব্দের গুহ্য অর্থ একেবারে আলাদা— অবশ্য এতসব গোপ্য তত্ত্ব সুধন্যদাসের মতো গায়ক বাউলের জানার কথা নয়। একথা বুঝবেন খয়েরবুনি আশ্রমের সনাতন দাস। প্রয়োজনে মানুষতত্ত্ব বুঝিয়ে দেবেন গান গেয়ে— নিত্য খ্যাপার সেই গান:
মানুষেতে মানুষ আছে
মানুষ নাচায় মানুষই নাচে।
মানুষ যায় মানুষের কাছে
মানুষ হইতে।
মানুষ মানুষ বলতে বলতে রূপান্তরিত মানুষের কথা আবার এসে গেল। সাধনদাসের মতো সাধকদের জীবন রূপান্তরিত আর সুধন্যদাসের জীবন সন্তাপ ও মর্ত্য কান্নায় আচ্ছন্ন। জমির কাজে মুনিশের তিরিশ টাকার রোজ থেকে নিছক গান গেয়ে থোক পনেরো হাজার টাকা পাওয়ার যে অলীক আর্থিক উত্তরণ তা শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকে না কারণ বস্তু তো সঞ্চয়যোগ্য নয়, তা ক্ষয়িষ্ণু। উত্তরণ চাই ভাবের দিকে খাড়াখাড়ি। তার জন্য প্রয়োজন আত্মসংবরণ ও কাম মুক্তি।
সাধনদাসের আশ্রম, সেখানকার শ্রী ও স্বাচ্ছন্দ্য, তার বিদেশিনী সঙ্গিনী দেখে মনে হতে পারে বোধহয় এসবই ভোগবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর অন্যতর রূপ। তা কিন্তু নয়। আশ্রম তার গুরুর দান, গান তার প্রযত্নলব্ধ, মাকি তার অর্জন। পঁচিশ বছর আগে সুধাময় দাসের আড়ংঘাটার আখড়ার এমন পূর্ণাঙ্গ শান্তি ও উজ্জ্বলতা দেখিনি। বরং দেখেছিলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য। সন্ধের পর পবনদাসের গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে মিনতি হঠাৎ পেট চেপে ধরে শুয়ে পড়ল আর কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে লাগল। সুধাময় তাতে ভ্রূক্ষেপও করল না, গানও থামল না। ছুটে গিয়ে ক’জন শিষ্য আর মহিলা টেনে তুলল মিনতিকে। সে তখন অর্ধচেতন। খানিকটা সুস্থ হলে জানা গেল তার পেটে গুরুতর পেপটিক আলসার। খাওয়াদাওয়া থেকে সব কিছুতেই তার অনেক নিষেধাজ্ঞা আছে ডাক্তারের। কিন্তু কে তাকে দেখবে? অন্তত বৈরাগীর সে দরদ নেই। মিনতি তাই একদিন আসমানীর মতো বিদায় নিতে বাধ্য হবে।
