এর সম্পূর্ণ বিপরীত একটা ঘটনা এবং দুটো আশ্চর্য চরিত্রের কথা মনে পড়ছে। সেবার পিরনিবাসে গিয়েছিলাম প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্রে। কেন্দ্র মানে একটা দুটো হল ঘর, বেশ খানিকটা জমি যাতে রয়েছে সবজিবাগান আর টিউবওয়েল, এই সংগঠনে রবিবার রবিবার ডাক্তার আসেন। প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা হয়। এরা দৈহিক প্রতিবন্ধী। কেউ অন্ধ, কেউ খোঁড়া, কেউ বিকলাঙ্গ। প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির এই কেন্দ্রীয় সমাবেশে আমার আসার কারণ হল সরেজমিনে প্রতিবন্ধী লোকশিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় করা। তাদের মধ্যে অনেকে নাকি বাউল গান গেয়ে সংসার চালায়। ট্রেনে বা বাসে, বাসস্ট্যান্ডে, মেলামচ্ছবে তারা গায়। আজকাল সরকারি অনুষ্ঠানে বা লোকসংস্কৃতি উৎসবে প্রতিবন্ধী বাউল শিল্পীদের ডাক পড়ে— কিছু অর্থপ্রাপ্তি ঘটে। এরা গায়ক বাউল বটে তবে জীবনাচরণে কেউ বাউল নয়। কোনও সাধু বা গোঁসাই গুরুর কাছে দীক্ষা শিক্ষা হয়ে থাকতেও পারে, নাও পারে। গেরুয়া পোশাক আছে এক সেট। অনুষ্ঠানের আগে সেটা পরে নেয়। যেসব গান গায় তার তত্ত্ব জানে না। গোষ্ঠগোপাল, পূর্ণদাস বাউল, পরীক্ষিৎ বালার হিটগান গাইতে পারে। কেউ শিখেছে দু’-চারখানা ভবা পাগলার গান। কেউ একতারা বাজিয়ে গায়, কেউ হারমোনিয়াম। সহশিল্পীর হাতে থাকে খমক বা খঞ্জনি। এরা করুণাভিক্ষু, অসহায় ও বিনীত। নিজেদের জোরে বাঁচতে পারে না।
কিন্তু ‘প্রতিবন্ধী বাউল’ শব্দবন্ধটি ভারী অস্বস্তিকর, কারণ বাউল তো সচলতার প্রতীক— সে সাধনা মুক্ত ও স্বয়ম্বশ, তাতে কোনও প্রতিবন্ধ নেই, সাংসারিকতা নেই, সংস্কার নেই। তবু অনুষ্ঠানের ঘোষক বলেন: ‘এবারে গান গাইবেন প্রতিবন্ধী বাউল উদ্ধবদাস।’
উদ্ধবদাস বাউলের গান সত্যিই ভাল লাগল। সুন্দর সুমিষ্ট কণ্ঠ, স্পষ্ট উচ্চারণ, গায়নপদ্ধতিতে নিজস্বতা আছে। গানের শেষে তার বসার জায়গাটায় হাত ধরে নিয়ে গেল যে-মেয়েটি সে সম্ভবত তার স্ত্রী, সে-ই তাকে খানিকক্ষণ আগে অতি যত্নে মঞ্চে এনে হার্মোনিয়ামের সামনে বসিয়ে দিয়েছিল। গানের শেষে উদ্ধব যখন বসল তখন মেয়েটি জননীর মমতায় তার ঘাম মুছে দিল শাড়ির আঁচলে, জল খেতে দিল এক গেলাস। সস্তা সিনথেটিক শাড়ি পরা, কপালে সিঁদুর আর হাতে দু’গাছি পলার চুড়ি, একটা নোয়া। মেয়েটির নাম পাপিয়া। সে মিনতি বা মাকি কাজুমি গোত্রের নয়, গানও জানে না। কথায় কথায় জানা গেল উদ্ধবদাসের পদবি ‘বালা’, জাতে নমঃশূদ্র, উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান, এখনকার নিবাস উত্তর চব্বিশ পরগনার গাড়াপোঁতায়। মাতৃপিতৃহীন, কিশোর বয়স থেকেই গান গেয়ে চলে। বনগাঁ স্টেশনে গান গাইত। স্টেশন চত্বরেই আলাপ এই পাপিয়ার সঙ্গে। পাপিয়া দাসবৈরাগ্য, জাতি-বৈষ্ণব। তার বাবা সম্পন্ন গৃহস্থ, জোতজমি প্রচুর, দাদা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাপিয়া নিজেও মাধ্যমিক পাশ। উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে ট্রেনে করে বনগাঁ আসত। উদ্ধবের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে আলাপ, ভাললাগা ও বিয়ে।
শুনতে যত সোজা কাজটি তত সোজা হয়নি। অন্ধ গায়ক তায় নমঃশূদ্র, সহায়সম্বলহীন উদ্ধবের সঙ্গে সচ্ছল গেরস্থ বাড়ির মাধ্যমিক পাশ বৈষ্ণববংশের মেয়ে পাপিয়ার কি স্বাভাবিক বিয়ে হতে পারে? পাপিয়া বলল, ‘দাদা প্রচণ্ড মেরেছে। বাবা-মা ঘরে বন্ধ করে রেখেছে, এই মানুষটার ওপরেও শাসানি মারধর করেছে কেউ কেউ। কলেজে আসতাম সঙ্গে একজন না একজন থাকত পাহারা দিত। তবু শেষ পর্যন্ত পারল কি?’
—কী করলে?
—একদিন পালিয়ে এলাম সোজা। রানাঘাটে গিয়ে দু’জনে রেজিস্ট্রি বিয়ে করলাম। দু’-চার গাছা গয়না যা ছিল তাই বিক্রি করে গাড়াপোঁতায় একটা টিনের চালার ঘর করেছি। একটু স্নানের ঘর, পায়খানা, টিউকল। চলে যায় দাদা, সুখে দুঃখে। মানুষটা গান গেয়ে কিছু রোজকার করে হাটে বাজারে। আমি ক’টা মেয়েকে পড়াই, অবসরে ঠোঙা বানাই। না, বাপদাদারা সম্বন্ধ রাখেনি। তাদের মুখ পুড়িয়েছি তো, মানে মর্যাদায় লেগেছে।
আশ্চর্য এমন নবীন দম্পতির দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে থাকি। নবীন দম্পতি বই কী। একজনের বয়েস যদি বছর পঁচিশ হয়, আরেকজনের কুড়ি-বাইশ। দু-বছর ঘরসংসার করছে, সন্তান আসেনি এখনও। স্বাভাবিক বুদ্ধিবিবেচনা থেকে মনে হল উদ্ধবদাসের গান শুনেই নিশ্চয় পাপিয়া আকর্ষণ বোধ করেছে— এমন সিদ্ধান্ত করার কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা। মিনতি বা মাকি বলে নয়, দেখেছি বেশির ভাগ বাউলের সঙ্গিনী জুটে যায় গানের মোহে, কেউ কেউ আসে যৌন আকর্ষণে। পাপিয়ার ক্ষেত্রে কোনটি? নিরপেক্ষ বিচারে বলতেই হয় উদ্ধবের গান ভাল, তবে পাগল করা আবেদন নয় তার। উদ্ধবকে দেখতে একেবারে সাধারণ। বেশ কালো, বেঁটে, জন্মান্ধ। সাধারণত পথে ঘাটে ট্রেনে বাসে কিংবা স্টেশনচত্বরে যেসব অন্ধকে গান গাইতে দেখি তাদের সঙ্গিনী বা স্ত্রীরাও হয় অন্ধ। পাপিয়ার মতো চক্ষুষ্মতীর পক্ষে অন্ধ গায়ককে বিয়ে করা, ভালবেসে, বেশ কঠিন কর্ম। সেকথা ভেবেই জিজ্ঞেস করি, ‘উদ্ধবের গান শুনেই কি তোমার তাকে ভাল লেগেছিল?’
—না তো। একদিন ট্রেন থেকে নামতেই এল ঝেঁপে বৃষ্টি। ছুটে গিয়ে দাঁড়ালাম প্ল্যাটফর্মের সেই জায়গাটায় যেখানে ও বসে গান গাইত। কোনওদিন তেমন করে ওর গান শুনিনি আলাদাভাবে। ওই গান কানে আসে এইরকম আর কী। কিন্তু সেদিন ব্যাপারটা হল অন্যরকম। বৃষ্টির ছাটে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাচ্ছে, কোনওদিকে যে সরে বসবে ঠাওর করতে পারছে না, ভাবলাম, আহা রে কত অসহায়!
