হেসে বললেন, ‘না না, এ বাড়ি পাক আল্লার।’
লজ্জিত হয়ে বললাম, ‘সে তো একশোবার। তবু সামাজিকভাবে এ বাড়িতে তো আপনারই দখল। নাকি?’
‘হ্যাঁ, লোকে তো তাই বলে’— বলে মানুষটা উদাসভঙ্গিতে খানিকটা বসে রইলেন। পরে বললেন, ‘কী ঘর বানাইলাম আমি শূন্যের মাঝার।’
বোঝা গেল গৃহস্বামী সম্পন্ন ও বিত্তশালী কিন্তু ভূয়োদর্শী। ফকির দরবেশদের তাঁর বাড়ি আনাগোনা আছে, তাই এমনভাবে হাসন রজার গান এসে পড়ল। এসে পড়ল বাউলফকিরদের জাদুভাষা— হ্যাঁ, লোকে বলে বটে এ বাড়ি নাকি আমার! এরপরে বলবেন হয়তো, ধুস। ক’দিনের আর এই দুনিয়াদারি কীসের বা মালিকানা! এ দেহের মালিক মোক্তারন, আমি তার পরহেজগার বই তো নই।
গ্রামসমাজে এই এক অলক্ষ দান বাউলফকিরদের— তারা মহতের গান শুনিয়ে আর বৈরাগী জীবনের আদর্শে গৃহীমানুষকে উদাসীন করে দেয়। তাই বহুগ্রামে দেখেছি বাড়িতে ভিক্ষাজীবী বাউল বা বোষ্টমবোষ্টমী এলে তাদের সমাদর করে বসায়, তাদের কাছে অনেক কিছু জানার থাকে অন্দরের নারীসমাজের। দেহের কথা, ব্যাধি-নিরাময়ের পদ্ধতি, যৌনতা… কত কী। সবচেয়ে যেটা বড় আকর্ষণ তা হল অন্দরের মধ্যে বাহিরের স্রোতাবর্তকে টেনে আনা, পথের মানুষটার কাছে কতরকম খবর থাকে, কত রঙ্গকথা, কত রহস্যময় গান। এও কি কম বিস্ময় যে এদের বিয়েই হয়নি অথচ কেমন সুন্দরভাবে বেঁচে আছে… বাধাবন্ধন নেই, সন্তান নেই, মুক্ত। অথচ অজস্র বাধাবাঁধনে জটিল কিন্তু মোহময় জীবনকে, সংসারজীবনকে কি নিতে পারত না এরা? নিতে তো পারতই এমনকী সেই জীবনেই তো এরা ছিল। সংসারলতার বন্ধন ছিন্ন করে এরা স্বেচ্ছায় সানন্দে এসেছে দেহতত্ত্বের গুহ্য লতাসাধনায়।
এরা তাই রূপান্তরিত মানুষ— সুধাময় কিংবা সাধন, মিনতি কিংবা মাকি কাজুমি। এদের মধ্যে মাকি বিদেশি বলে তার রূপান্তরক্রিয়া ঘটেছে একটু বেশি সময় ধরে, মিনতির অত সময় লাগেনি, তার কারণ তার যে দেশজ অভিজ্ঞতার ধারা রয়েছে। দুজনেই বাউলসঙ্গিনী ও সেবাদাসী, দুজনেই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে না। দুজনেই বর্তমানের সুখ আর আনন্দকে অঞ্জলি ভরে পান করছে। এদের সারা শরীরে আমি আনন্দের হিল্লোল দেখি, মনের মধ্যে গভীর তৃপ্তির স্বস্তি। ‘সত্য বলো সুপথে চলো’ মাকি যখন গাইছিল তখন সেটা আর লালনের গান ছিল না, হয়ে উঠছিল এক জাপানি মেয়ের রূপান্তরিত জীবনভাষ্য। ‘সত্য বলো সুপথে চলো’— কথাটা কি নিজের কাছে নিজের অঙ্গীকার? নাকি বর্তমান জীবনের থেকে, তার ক্লিন্নতা থেকে মুক্তির আর্তি? এ প্রশ্নের উত্তর আছে আরেকটা গানে ‘গুরু আমায় নাও গো সুপথে’। এটাই চরম কথা। সাধিকা বা সঙ্গিনী কখনই প্রকৃতপথ জানে না— জানে গুরু। এইখানে গুরুর আধিপত্য এসে যাচ্ছে। সাধনদাস না দিলে মাকির পাবার কিছু নেই। সাধনদাসও তো একজন রূপান্তরিত মানুষ। যে সমাজ পরিবেশে তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা, তার কোনওদিকেই বাউল হবার মতো প্ররোচনা ছিল না। সে বাউলের সন্তান নয়, গানও তেমন জানত না। কেন সে বাউল হল? কীসের লোভে? আজকে হাটগোবিন্দপুরে তার যে স্বচ্ছন্দ শান্তিকল্যাণ ভরা আশ্রম তার উত্তরাধিকার সে পেয়েছে গুরুর কাছ থেকে। সাধনভজনের একাগ্রতা, গানের তত্ত্বজ্ঞান ও গায়ন, গুরুসেবা দিয়ে সে অর্জন করেছে এখানকার অধিকার। গুরুর নামেই তার আশ্রম, প্রাঙ্গণের মুখে সেই সাইনবোর্ড দেখা যায়। আজ মোটর চড়া বা টেলিফোন রাখা সাধনদাসকে দেখে বোঝা যাবে না সে কতখানি রূপান্তরিত। যতখানি পূর্ণতা ও গায়ন-ব্যক্তিত্ব পেলে বিদেশি নারীর মন জয় করা যায় সেটা সে আয়ত্ত করেছে। মাকি তার কাছে ধরা দিয়ে সফল ভাবছে নিজেকে। গুরুকে তার ধ্যানজীবনের সুপথের কান্ডারি করেছে। সাধনদাসের এই ব্যক্তিত্ব একটু ব্যতিক্রমী তাতে সন্দেহ নেই, কারণ সচরাচর আমরা উলটোটা দেখি। দেখি বাউল আর বিদেশিনীর যে জোট তাতে বাউলের তরফে হ্যাংলামি বেশি। আমাদের অভাব ও দারিদ্র্যের দেশে বাউলের চালাঘরে যদি একজন মেমসাহেব এসে উদয় হয় তবে সে হল ভাঙাঘরে চাঁদের উদয়। তখন সেই বিদেশিনীর কৃপাধন্য বাউলকে দেখে সমাজের সবাই ঈর্ষাবোধ করে। বাউলের মধ্যে জাগে এক ধন্যতার বোধ।
অথচ এই জোটের সংগঠনে বাউলের কতটুকুই বা ভূমিকা? মেমসাহেবকে তো সে নির্বাচন করতে পারে না, মেমসাহেবই তাকে নির্বাচন করে। তার সঙ্গী হবার জন্য সে দু’পায়ে খাড়া। তার সুবাদে বাউল যেতে পারে বিদেশেও। তীব্র আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত বিদেশি মঞ্চে গেরুয়াপরা কালোকোলো নিরক্ষর মানুষটি নেচে নেচে ‘ভোলামন’ বলে গান গায়। রঙ্গপ্রিয় তরলমতি বিদেশি শ্রোতারা বাউলগানের ডুবকির তালে তালে নাচে, ভিডিও ছবি তোলে। যেন উন্মাদ হয়ে যায় প্রাচ্যদেশের অজানা গানের গর্বে তাদের প্রতীচ্য জীবনের যান্ত্রিক মন।
সোনামুখির বাউল সুধন্যদাস এ ব্যাপারে আমাকে তার অভিজ্ঞতা বলেছিল এইরকম ভাষায় যে, ‘আমেরিকা, ফ্রান্স আর জার্মানিতে আমি গান গেয়েছি। না, আমি একা নই, বাঁকুড়ার এক নামকরা বাউল, আপনাকে তার নাম করব না, জনদশেকের দল বেঁধে গিয়েছিল। আমাকেও নিয়েছিল দলে, কারণ আমার গানের গলা তেজি, তা ছাড়া অনেকরকম বাউলগান আমি জানি।’
—অনেক টাকা রোজকার করলে?
