আসরে সেটাই দেখছিলাম মুগ্ধ হয়ে। ‘সত্য বলো সুপথে চলো’ দিয়ে মাকি শুরু করেছিল ঠিকই কিন্তু তারপর সাধনদাস তাকে এক একটা গানের নির্দেশ দিচ্ছিল আর মাকি গাইছিল, আমার টেপে সেগুলো ধরা পড়ছিল। ‘এটা গাও’ ‘ওটা গাও’ সাধনের নির্দেশ মেনে উদ্দিষ্ট গানটা মাকি গেয়ে দিচ্ছিল সাবলীল দক্ষতায়। একবারও তো খাতা দেখেনি, তবে? সেসব গানের ভাবে কি সে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল? এসব গান তার স্মৃতিধার্য বিষয়, এতদিনে তার জীবনের বিশ্বাসের অঙ্গ হয়ে উঠেছে নিশ্চয়। মাকির নিবিষ্ট তন্ময়তা আমাকে চমৎকৃত করছিল। এ তো আর কাজকর্মের ফাঁকে মিনতি দাসীর গুনগুনানি নয়। শান্তিদেব ঘোষের মতো মানুষ এই জায়গাটায় ভুল করেছিলেন। জাপানি বলে, বিদেশিনী বলে, মাকি কাজুমিকে তিনি শান্তিনিকেতনের বাউলমঞ্চে উঠতে দেননি, গাইতে দেননি। ভেবেছেন বাউল গান গাইতে হলে গিমিক চলবে না, হতে হবে সেই জীবনযাপনের শরিক। মাকি তো কোনও অর্থেই পোশাকি গায়িকা নয়? তা হলে গানে এমন ভাবের পরম্পরা রাখতে পারত কি? শান্তিদেব মাকিকে দেখেছেন খণ্ডরূপে, ভেবেছেন সাজা গায়িকা। আমি দেখছি তার অখণ্ডরূপ, একজীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকজীবনে মিলে যাওয়ার রূপান্তর।
এইখানে এসে একটা বড় খটকা লাগে আমার মনে। বাউলজীবনে যারা আসে, গুরুর কাছে নির্দেশ নিয়ে সাধনভজন করে, তাদের জীবন আসলে রূপান্তরিত জীবন। মূল সমাজস্রোতের যে অংশে তার জন্ম সেই গ্রামসমাজে মাহিষ্য বা বাগদি, কুর্মি, কাহার, ডোম, দুলে বা হাড়ি যে-বর্গেই তার জন্ম হয়ে থাকুক সেই পরিবেশে ও নীতিবেষ্টনীতে সে বাঁধা থাকেনি। বেরিয়ে এসেছে বাউল সমাজের আঙিনায়। এখানে সামাজিক নিয়মনীতির প্রহরা নেই, সমাজপতি নেই, সমাজের কোনও প্রত্যাশা নেই তাকে ঘিরে। গ্রামেরই একটা অংশে তারা থাকে, গ্রামে বা আশপাশের গ্রামে তারা গান গেয়ে মাধুকরী করে। বৃহত্তর গ্রাম্যসমাজবোধ ও তার জীবনদৃষ্টি বাউলফকির বৈরাগীদের উপেক্ষা বা ঘৃণা করে না। গৃহস্থ বাড়ির শ্রী ও স্বাচ্ছন্দ্যের একটা অচ্ছেদ্য অংশ হল এই বোধ যে বাড়িতে বাউলবৈরাগী ফকিরমিসকিন এলে তাদের চালজল সেবা, আনাজপাতি ফল দেওয়া উচিত, তাতে গৃহীজীবনের কল্যাণ। তাদের সঙ্গে খানিক আলাপচারি করলে কিছু জ্ঞান হয়, সে জ্ঞান সংসারজীবন দিতে পারে না। বাউলবৈরাগীর বলা কথায় সবসময় যে দিব্যজ্ঞানের অতলতা থাকে তা নয় কিন্তু তাদের বাক্যবিন্যাসে একটা মোহিনী শক্তি থাকে, একটা অব্যক্ত ব্যঞ্জনার আভাস থাকে। তাদের মতো করে কথা বলার নেশা কোনও কোনও পল্লিবাসীর জেগে ওঠে। যেমন ধরা যাক নদিয়া জেলার সম্পন্ন গ্রামে এক বাউলফকির সম্মেলনে গিয়েছিলাম সেবার। মধ্যরাতে যখন গানের আসর ভাঙল তখন প্রখর শীত, মাঘ মাস। এক চাষির অঙ্গনে বসে গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে শীত খানিকটা কাটল। এবারে আমরা যাব কোথায়, শোব কীভাবে? এই নিষ্ঠুর শীতের রাতে? সম্মেলনের এক উদ্যোক্তা আমাদের চার-পাঁচজনকে পায়ে পায়ে নিয়ে চললেন গ্রামপ্রান্তের একটা বাড়িতে। গাঢ় অন্ধকারে সব কিছু ঠাওর হচ্ছিল না, তবে একটা বাড়ির সামনে পৌঁছলে কেউ দরজা খুলে দিল। লণ্ঠনের আলোয় দেখলাম, বাড়ির বারমহলের একটা বড় ঘরের মেঝেয় লম্বা করে বিছানা পাতা, মশারি টাঙানো। শীতে তখন আমরা জড়তাপ্রাপ্ত তাই কোনওরকমে দাওয়ায় পা ধুয়ে, গামছায় পা মুছে, বিছানায় ঢুকে নাক পর্যন্ত লেপ টেনে নিলাম। সারাদিনের শ্রান্তি ক্লান্তি, ওই তীব্র শীত আর খিচুড়ি ভক্ষণের উদরতৃপ্তি আমাদের ঘুম এনে দিল অচিরে।
একটানে ঘুমিয়ে বেশ ভোরে উঠে পড়া আমার স্বভাব। ঘুম ভাঙতে দেখি ঘরের কারুরই নিদ্রাভঙ্গের কোনও আশু সম্ভাবনা নেই, তাই দরজা খুলে বাইরে বেরোলাম। সামনেই গ্রামের অপরিসর কাঁচা পথ, অদূরে একটি পুকুর ও বনঝোপ। পুকুরে গিয়ে মুখেচোখে জল দিয়ে, একটা কচার ডাল ভেঙে দাঁত মাজতে মাজতে বাড়িটার দিকে ফিরে চাইলাম: চকমেলানো বিশাল তিনতলা এক বাড়ি, অ্যালা রঙের। তার মানে আমাদের গৃহস্বামী একজন সম্পন্ন গৃহস্থ। বাড়ির দরজায় ‘এলাহি ভরসা’ দেখে বোঝা গেল মানুষটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম। অথচ তাঁর বাড়িতে যাদের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা বাউলফকিররা করেছে তারা আমার মতো ধর্মনির্লিপ্ত মানবতাবাদী। এতে কোনও বিস্ময় নেই, বিরোধও নেই। গ্রামের মারফতি ফকিররা একটা গানের আসর বসিয়েছে, তাদের দীন বাসস্থান অতিথিসেবার উপযুক্ত নয়। কিছু মান্যমান শিক্ষিত মানুষ এসেছেন আমাদের গাঁয়ে, হলেই বা আমি ধর্মনিষ্ঠ শরিয়তবাদী মুসলমান কিভু সেবাধর্ম তো ইসলামে ‘ফরজ’ মানে কর্তব্য, কাজেই দিয়েছি ঘরখানা খুলে। থাকুন মেহমানরা— এক রাতের ব্যাপার তো। হ্যাঁ ফকিরদের সঙ্গে আমাদের পথের মিল নেই, ওরা বেনামাজি, কিন্তু শান্ত ও উদার। আর সবচেয়ে বড় কথা, খুব সুন্দর ভাবের গান গায়— গৃহস্বামীর এটাই হল মনের কথা।
পুকুর থেকে ফিরে এবারে ঠাওর হল যে বাড়ির সিমেন্টের রোয়াকে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। সাদা লুঙ্গি সাদা পিরান সাদা দাড়ি, হাতে তসবিমালা। ভোরের ফজরের নামাজ সাঙ্গ করে এসে বসে আছেন পূৰ্বাস্য হয়ে। গায়ে দামি শাল। স্বভাবতই তাঁকে গৃহস্বামী ভেবে বললাম, ‘এ বাড়ি আপনার?’
