সম্মতি জানাতেই সে চলে গেল রান্নাঘরে আর আমার চোখ চলে গেল উঠোন পেরিয়ে একটু দূরে কলতলায়, যেখানে উঁচু বাঁশের বাতায় শুকোচ্ছে মাকির গেরুয়া, শাড়ি জামা ও শায়া। গড়পড়তা বাউলবাড়িতে এই দৃশ্য দেখতে আমি অভ্যস্ত কিন্তু এখানে দৃশ্যটি অপার্থিব হয়ে উঠেছে এক বিদেশিনীর আত্মউৎসর্জনের তাপে। সে তার জাপানি জীবনযাত্রার ছকটাই বদলে ফেলেছে হাটগোবিন্দপুরে এসে, সাধনদাসের সাধনসঙ্গিনী হয়ে। মনে পড়ল, ‘আমি বিদেশিনী হইয়া/ বসন রাঙাইয়া/ যাব গো তোমার সঙ্গে’ গানের আক্ষরিক রূপ। এক্ষেত্রে অবশ্য বিদেশিনী এখন হয়েছে আমারই ভাষায় কথা বলা স্বদেশিনী। টিউবওয়েলের পাশে একটেরে ছোট বেড়া দিয়ে ঘেরা স্নান-ঘরে ভোরের স্নান সেরে এই জাপানি নারী ফুল তুলে রাধামাধব বিগ্রহের পাট সেরেছে। ভক্তদের সেবা দিয়ে এবারে অতিথি আপ্যায়ন।
চা আর বিস্কুট নিয়ে মাকি এসে আমাকে দিয়ে সামনের মেটে দাওয়ায় বসল। সারা গায়ে খুব সুন্দর করে শাড়ি জড়ানো। ঘোমটা নেই, তাই চোখে পড়ল তার কানের দুটো ঝুলন্ত দুল। কোনও ডিজাইন নেই, শুধু ‘ওঁ’ লেখা। অপরূপ শোভাময় দৃশ্য। বিদেশিনীর কানে ঝুলছে দুটি ওঙ্কার। পরিচয় আগে থেকেই ছিল কাজেই এবার কুশলবার্তা নেওয়া।
—সাধনদাসকে দেখছিনে যে! নেই নাকি?
—একটা আসরে গেছেন কাল, ধাত্রীগ্রামে। টেলিফোন করেছেন একটু আগে। আপনি আসবেন খবর দিয়েছেন। রওনা হয়ে গেছেন গাড়িতে— এখনি এসে পড়বেন। দাদা, দুপুরে অন্নসেবা নেবেন তো?
পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ বাউল আখড়ার এমন শ্ৰীমন্ত রূপ নেই। বাড়িতে টেলিফোন, কোথাও যেতে ভাড়া করা মোটর। আশ্রমে বেশ ক’টা চালাঘর। একটা নতুন ঘরের পত্তনি হয়েছে তাতে দুজন ভক্ত নতুন বিচুলির ছাউনি দিচ্ছে। সেদিকে তাকাতে মাকি বলল, ‘গোঁসাই ওখানে একটা নতুন ভজনকুটির করছেন। পুরনোটায় উঁই লেগেছে। ওটা ভেঙে ফেলা হবে।’
কেমন চমৎকার জাপানি মেয়ের সঙ্গে আমার ঘর গেরস্থালির কথা হচ্ছে। কত বাউল ঈর্ষা মিশিয়ে আমাকে বলেছে, সাধনদাসের মতো ভাগ্য ক’জনের হয়? ভাল গাইতে পারে। ফাংশনে ডাক আসে। অনেক শিষ্যশাবক। সেবাদাসী মাঝে মাঝে দেশে গিয়ে টাকা আনে।
অচিরে সাধনের গাড়ি ঢোকে অঙ্গনে। সাঙ্গোপাঙ্গ বাজনদারদের নিয়ে সশিষ্য সাধনদাস প্রবেশ করে উঠোনে। সপ্রতিভভাবে বলে, ‘আরে সুধীরদা, এসে গেছেন? বাঃ।’
পাকা প্রোফেশনাল। কথায় বার্তায় সাবলীল। একটু পরে সবাই মিলে বসা হল আরেকটা ঘরের প্রশস্ত দাওয়ায়। প্রথমে গাঁজা তৈরি করে শিষ্য দিল গুরুকে। বিশাল ক’টা টান দিয়ে কলকে চলে গেল শিয্যদের হাতে হাতে। তারপরে হল দুয়েকটা গান। নিমীলিত চোখে সাধনদাস গান গাইলেন ভারী সুন্দর— আত্মনিবেদনে গভীর ও উদাত্ত। এবারে মাকি কাজুমির পালা। একতারা আর বাঁয়া নিয়ে তার গানের ধরতাই: ‘সত্য বলো সুপথে চলো।’ জাপানি মেয়ে বাংলা ভাষায় গাইছে লালনের গান। মাকি যেন সাধনের জীবনে এক অপরূপ অর্জন। তাদের মিলনে গানের সুরের আসনখানি পাতা।
আমার মনে এ প্রশ্ন না উঠেই পারে না যে কোনটা সত্য কোনটাই বা সুপথ। মাকি গায় ‘সত্য বলো সুপথে চলো,’ ওদিকে মিনতি গেয়েছিল ‘এবারে খাঁটিপথে দাঁড়িয়েছি’— এখানেই দ্বন্দ্ব। যেটাকে এরা সুপথ বা খাঁটিপথ বলে সেই বাউলজীবনের ন্যায়নীতিসত্য কেমনতর? সে তো আমাদের স্বাভাবিক সমাজমূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না। দিল বা হৃদয় নিয়ে যাদের গানে এত কথা, তাদের হৃদয়হীনতা এতভাবে দেখি যে মনে কষ্ট হয়। অথচ সে কষ্টের কী মূল্য?
বাউলেরা নিজেদের বলে ‘পথবৈরাগী’, সংসারের নিয়ম তাই তাদের ক্ষেত্রে চলে না। এই পথের নিয়মে আসমানী যায়, মিনতি আসে…কাজুমিরাও আসে… কিন্তু থাকে কি? থাকতেও পারে, চলে যেতেও পারে। দুদিকেই দরজা খোলা বাউল বিশ্বে। তাই এই জাপানি সাধিকার স্বনির্বাচিত জীবনে প্রত্যাবর্তনের পথ খোলা আছে। কিন্তু তার ভাবজগতে এতদিন যে-তরঙ্গ উঠেছিল, যা তাকে নিয়ে এসেছে এত দূরে, এমন সুদূর সাধনায়, তা কি সে ভুলে যাবে? এই তার কপালের চন্দনরেখা, কানের দুলের ওঙ্কার, গেরুয়াবাস, নম্রবিনতস্বর, তার শিষ্যসেবা, অন্নপূর্ণারূপ সে মুছে ফেলবে একেবারে? সবচেয়ে যেটা বড়, তার দেহবাদী সাধনার দিনগুলি, তার গুরু সান্নিধ্য? তার গলার চিকন গান? ভেবে দেখতে গেলে মাকির গান তো কেবল কণ্ঠবাদন নয়, নয় কতকগুলো বাংলা শব্দের উচ্চারণ, এর প্রত্যেকটার ভাব তাকে যে বুঝতে হয়েছে। সে বোঝা বড় কঠিন, কতদিনের আয়াসসাধ্য। এমন গায়নের অন্তঃস্পন্দ, একতারায় চম্পক অঙ্গুলির সঞ্চালন, স্বরক্ষেপের মাধুর্য, বাঁয়ায় তাল রাখা অথচ নিজেকে ভাবনিবিষ্ট রাখার কৌশল— এতগুলি অর্জন বহু শ্রমে সিদ্ধ। তার সামনে ছিল অনেকগুলো লড়াই। বিদেশিনী হয়েও ভিনদেশি লোকায়তের মর্মোদ্ধার, খাঁটি বাউলসঙ্গিনী হওয়া, হয়ে ওঠা খরদৃষ্টি আশ্রমজননী, তারপরে গানের শিক্ষা, সুরের দীক্ষা এবং সবচেয়ে যেটা কঠিন— সাধনদাসের সমকক্ষ হয়ে তার গীতসঙ্গিনী হওয়া। সাধনদাস বাউল গানের একজন ভাল পারফরমার, গান তার জীবিকা। তাই তার গানে পারফেকশানের প্রশ্ন আছে, আসরে গানের তত্ত্ব বুঝে তাকে গান বাছতে হয়, তার চর্চা করতে বহু ভাবনা ও বিচার লাগে। এই পথটা— সাধনদাসের এই গতিপথটা তাকে বুঝতে হয়েছে, নিজেকে গড়ে নিতে হয়েছে।
