আখড়ায় চোখ মেলে দেখবারও কত কি থাকে। ধরা যাক, প্রথমেই ভূমিশয্যা। উঁচুনিচু মাটির ওপরে পুরু করে খড় বিছানো, তার ওপরে শতরঞ্চি বা পাটি। তার ওপরে আমার জন্যে বিশেষভাবে পাতা হয়েছে একটা বড় কাঁথা— বহু যত্নে বহু দিন ধরে চলেছে তার সীবনকর্ম। একেবারে সাদামাটা কাঁথা নয়, তার চারপাশে রঙিন সুতোর বর্ডার। হাতি হাঁস ময়ুরের মূর্তি আঁকা। এ প্রতীকগুলোরও আলাদা মানে আছে সে কি জানতাম? মিনতিই বুঝিয়ে বলেছিল: ‘হাতি মানে মত্ত মাতঙ্গ, যাকে বলে কামনা।’
—আর ময়ূর?
—ময়ূর মানে স্ত্রীলোক। পেছনে কলাপ মেলা রূপ— চোখ ধাঁধানো। ময়ূরের রং হল নীল, চোখটা লাল। নীল মানে ঈর্ষা, লাল মানে কামনা। নারীর অন্তরে থাকে ঈর্ষা, চোখে থাকে কামনা।
কামনার কথা জিজ্ঞেস করা উচিত নয়, তাই নিরীহ প্রশ্নটা করতে পারি, ‘তোমাদের অন্তরে কি ঈর্ষা থাকে নাকি? এত যে সেবা করছ, মানুষকে ভালবাসছ, কোথায় ঈর্ষা?’
‘ঈর্ষা কি চোখে দেখা যায়?’ মিনতি রহস্যের হাসি হেসে বলেছিল, ‘ঈর্ষা আছে আমার অন্তরভরা। গোঁসাই কত বকে, তবু ঈর্ষা কি মরে?’
—কাকে ঈর্ষা তোমার? কেন?
—ঈর্ষা হিংসা মেয়েমানুষের তো মেয়েমানুষের ওপরই থাকে। আমারও তাই আছে। গোঁসাইয়ের চোখ দ্যাখেননি তো? ভেতরে ভেতরে আরও সেবাদাসী খোঁজে। পেয়েও যায়। আমাদের এই লাইন ভাল নয়। ওই যে কাঁথাখানায় বসেছেন তার কোণে কার নাম লেখা? আসমানী দাসী। সে ছিল আমার সতীন। তাকে বিদেয় করে গোঁসাই চরণে স্থান দিয়েছেন আমাকে। সে নেই কিন্তু তার করা কাঁথাটা রয়ে গেছে।
কথার টানে মিনতি এক বিচিত্র জগতে এনে ফেলেছে। চোখ খুলে যাচ্ছে। এবারে আর প্রশ্ন করি না, বুঝতে পারি হাঁস মানে কী। হাঁস মানে সাধক— নির্বিকার পরমহংস।
এ বড় বিচিত্র জগৎ— আশ্চর্য বিশ্বাসের জগৎ। জলের ছুঁচ আর পবনের সুতো দিয়ে দিয়ে নাকি মানবদেহ গড়া। আপাতত অত ভাবালুতার প্রয়োজন নেই। আখড়ায় পাতা রয়েছে আসমানী দাসীর হাতে বানানো চিত্রবিচিত্র কাঁথা, প্রতীক প্রতিমায় দ্যোতনাময় কিন্তু আসমানী কোথাও নেই। সে কী নিজেই চলে গেছে না গোঁসাই তাকে তাড়িয়েছে? নাকি ঈর্ষাকাতর মিনতির আরেকটা রূপ আছে সেবাব্রতর আড়ালে? এখন সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গুনগুন করে গান গাইছে মধুরকণ্ঠে সেই হয়তো তীব্র কাংস্য চিৎকারে কলহ করতে পারে। এটা ঠিক যে লোকায়ত জীবনের নানান রূপ নানা ছন্দ।
হঠাৎ আমার চোখের সামনে থেকে আখড়ার সমস্ত উৎসব আনন্দগানের আবহ সরে গেল। জেগে উঠল এক অসহায় নারীর অদেখা চেহারা— আসমানী দাসী। নামটা শুনলে মনে হয় বুঝিবা মুসলমান ঘরের মেয়ে। সম্ভবত তা নয়, কারণ গাঁ-ঘরে নারীর কতরকম নাম থাকে। যাকে আসমানী শুনে ভাবছি মুসলমান সে হতেই পারে হিন্দু, আবার খোদ মুসলমান বাড়িতে মেয়ের নাম শুনেছি গোপালিবালা। তাই এসব থেকে কিছু বোঝায় না। আমার কাছে অনেক বেশি করে জেগে উঠছে এক নারীর নিষ্ক্রমণ বার্তা। যে চলে গেছে কিন্তু রেখে গেছে তার হাতে তৈরি কাঁথা। সে-কাঁথায় আসমানী ফোঁড় তুলে এঁকে গেছে গুরুর শেখানো চিত্রমালা— হাতি-হংস-ময়ূর। অথচ সেই চিত্রণের তাৎপর্যে সে আর নেই। মত্ত কামনা, উদ্যত ঈর্ষা আর তার মধ্যে শমশান্ত সাধকের জগৎ আজ তার কাছে ধ্বস্ত, ভ্রান্ত ও অতীত।
এতদিন পরে আসমানী বা মিনতির কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল হাটগোবিন্দপুরে সাধন বৈরাগ্যের আশ্রমে মাকি কাজুমির মুখ। নাদনঘাট থেকে বর্ধমান যাবার পথে বাসরাস্তায় পড়ে হাটগোবিন্দপুর। বাস থেকে নেমে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল নিশানা। মিনিট দশেক হেঁটে সোজা সরান ধরে পৌঁছে গেলাম সাধনদাসের আশ্রমে। চোখ জুড়িয়ে যায় আশ্রমের শ্রী আর সমৃদ্ধি দেখলো একেবারে ঝকমকে তকতকে। প্রচুর গাছ— আম জাম কাঁঠাল কদম্ব ছাতিম। উঠোন গোবর লেপে মোছা। এক পাশে গন্ধরাজ আরেক পাশে টগরের ঝাড়। সারিবাঁধা চিনে গোলাপ। সুন্দরের আসন বিছানো এমন সচ্ছল স্বচ্ছন্দ আশ্রমের মধ্যমণি এক ছবির মতো জাপানি মেয়ে, মাকি কাজুমি। রোগা একহারা চেহারা কিন্তু লাবণ্যে ভরা। গায়ের রং সাদাটে, চোখদুটো জাপানিদের যেমন হয় ছোট কিন্তু শান্ত। পাতলা ঠোঁট। পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি ব্লাউজ, শীতকাল বলেই বোধহয় পায়ে সাদা মোজা কিন্তু স্লিপার নেই। মেটে দাওয়ায় জন পাঁচেক ভক্ত হাপুসহুপুস করে গরম জাউভাত খাচ্ছে। পরিবেশন করছে মাকি, জননীর স্নেহ দিয়ে। এতদিনে তার বাংলা উচ্চারণে জড়তা তত নেই। স্পষ্ট বলছে, ‘আর দুটো ভাত নেবে?’
‘না, মা। আর নয়।’ পরিতৃপ্ত জবাব তাদের। মা? ভাবতে গেলে আশ্চর্য লাগে বই কী। চিত্ৰশোভাময় জাপানের এক উচ্চশিক্ষিতা মেয়ে এখানে এই হাটগোবিন্দপুরে এসে হয়ে বসেছে অন্নপূর্ণা আশ্রমজননী। সন্তান নেই, শিষ্যসেবকরাই সন্তানের মতো। মাকির ক্ষুদ্র কিন্তু প্রসন্ন চোখে প্রকৃত স্নেহের বাতি জ্বলছে। কবে বুঝি পনেরো বছর আগে সাধনদাস জাপানে গিয়েছিল গান গাইতে। মাকি চলে এসেছে তার সঙ্গে। অশনে বসনে ভাষায় ও ধর্মে কোনও মিলই নেই। তবু চলে আসা প্রাণের টানে। সে টান বড় অন্তরের।
ভক্তদের অন্নসেবা দিয়ে মাকি আমার কাছে এসে নত হয়ে বলল, ‘প্রণাম।’ দাওয়ায় একটা কাঠের চেয়ার দিয়ে বলল, ‘বসুন। একটু চা সেবা করবেন তো?’
