বাউলজীবন নিয়ে যারাই কাজ করে তাদেরই এমন দ্বিস্তরের অভিজ্ঞতা হয়— মোহ ও মোহভঙ্গ, তারপরে গড়ে ওঠে এক স্পষ্ট নবচেতনা, যা একটা বলিষ্ঠ প্রত্যয়ভূমিতে দাঁড় করিয়ে দেয়। বাউল বলে নয়, ফকিরি দরবেশি সহজিয়া ইত্যাদি বর্গের গুহ্য সাধনায় সবসময় যেমন দ্ব্যর্থ থাকে তেমনই তাদের ভেতর-বাইরের দুটো জীবন থাকে। বাইরে ভারী কোমল ও মরমি কিন্তু সাধনার ক্ষেত্রে খুব নির্মম ও নির্বিকার তারা। দেহগত সব সাধনারই এই এক তরিকা। শরীরটা বশ করতে হয়, তার জন্য দেহ নিয়ে চরম সাধনা করতে হয় এবং সেইসঙ্গে মনের সংযম আনতে হয় চূড়ান্ত পর্যায়ের। তাদের গানে বেশ সাদাসাপটা বলা হচ্ছে বড় কঠিন কথা ও প্রত্যাদেশ: ‘কামে থেকে হও নিষ্কামী।’ ক’জন পারে?
যুগলের মেলার কথা বলতে বলতে যুগলসাধনার কথা চলে এল এবং সেই সুবাদেই সুধাময় দাসের আখড়ার প্রসঙ্গ মনে পড়ল। সেবার তার আখড়ায় বসে আছি। দুপুরে খিচুড়িভোজন করে একটু গা এলিয়ে নিয়েছি। বিকেল-সন্ধের মুখোমুখি বসে গেছে বাউলের আসর। আখড়ার সর্বত্র মিনতি নামে একটি মেয়ে বেশ চোখ টানে। মিষ্টি দেখতে লম্বা ছেঁয়ালো চেহারা। সর্বদা ছোটাছুটি করে সবাইকে দেখাশোনা করছে। আমাকেই বার কয়েক লাল চা খাইয়েছে। বুঝতে অসুবিধে হয়নি, বৈরাগ্যের আখড়ার সবদিক এই নারী সামলে রাখে। সেবাযত্নে খরদৃষ্টি। সুধাময় তো ব্যাপক গঞ্জিকা সেবন করে দিব্যোন্মাদ, বসে বসে শুধু হাসছে। বাউল গায়করা আসরে আসছে, গেয়ে চলে যাচ্ছে। তাদের চা-মুড়ি তেলেভাজা খাওয়ানো, তাদের বসানো, দু-দণ্ড কথা বলা, রঙ্গ-রসের যোগান, কুশল নেওয়া সবই ওই মিনতি। গায়ের রং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, স্বেদ মাখানো হাস্যময়ী মুখশ্রী, সেবাদাসী। বেশ ভাল মধ্যবিত্ত বাড়িতে মানানসই বউ হতে পারত, মাথায় করে রাখত সংসার। সবরকম ঝকমারি সামলেসুমলে আবার দু’-তিনটে সন্তান পালন করত হাসিমুখে। স্নেহ মমতা তার চোখে ঝরে পড়ছে। কিন্তু আপাতত সুধার কব্জায়। তার গানেই মজেছে সন্দেহ কি?
সুধাময় দাসবৈরাগ্যের সেবাদাসী মিনতি দাসী— বেশ তো চমৎকার লোকায়ত জীবনের ফ্রেমে বাঁধানো এক তেলচকচকে আলেখ্য। মিনতিকে তো ফুসলে আনেনি সুধা। সে নিজেই এসেছে, মেনে নিয়েছে এই সুখদুঃখের দৈনন্দিন। গান শিখেছে গুরুর কাছে, শিখেছে দেহতত্ত্বের খুঁটিনাটি। কোনও সংশয় সন্দেহ নেই, ফেলে-আসা পিত্রালয়ের জন্যে দরদ বা মা-ভাই-বোনের স্নেহনীড়ের স্মৃতি তাকে উন্মনা করে কিনা কে জানে? বেশ তো গুনগুন করছে নিরন্তর কাজের ফাঁকফোকরে। গাইছে:
ঘুচিয়ে মলামাটি
হয়েছি পরিপাটি
করিনে নটিখটি—
এবার খাঁটি পথে দাঁড়িয়েছি।
সাংসারিকতার ময়লামাটি নাকি তাকে আর স্পর্শ করে না— গৃহীজীবনের ‘নটিখটি’ অর্থাৎ তুচ্ছ ব্যাপারে নাক গলানোর প্রবৃত্তি তার আর নেই। পরিপাটি হয়ে মিনতি দাসী এবার খাঁটি পথে দাঁড়িয়েছে। খাঁটি পথ? এটাই যে খাঁটিপথ জানল কী করে? এই বিবাহবিহীন একত্র থাকা, এই সন্তানহীন যুগলজীবন, ভবিষ্যৎ স্বপ্নহীন, বর্তমান অনিশ্চিত, এটাই খাঁটি? সামাজিক সম্মান নেই, আর্থিক স্বাধীনতা নেই, রোজকার অন্ন নেই, তবু এটাই খাঁটি পথ?
মিনতির চলে আসাটা খাঁটি, বৈরাগীর প্রতি টানটা প্রবলভাবে খাঁটি, এই দেহসাধনার কবোষ্ণ তাপ সেটাও খাঁটি, কিন্তু তার জীবনসঙ্গীটি কি সৎ ও মিনতিনিষ্ঠ? না। সেটা এতক্ষণে আমি যেমন জেনে নিয়েছি এর-ওর কাছ থেকে, তেমনই আন্দাজই করতে পারি মিনতিও জেনেশুনে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছে। সবাই জানে, সুধাময় দাস মোটেই একনিষ্ঠ নয়। দু’-চারজন এমন ধরনের মিনতি তার কাছে এসেছে আবার চলে গেছে। মানুষটা বাউন্ডুলে, গ্যাঁজালে কিন্তু ভারী সুন্দর গান গায়, বড় চমৎকার দরদি ভাষায় কথা বলে। তত্ত্বগানের আসরে সে যেন বাচস্পতি। পুরাণ কোরান কণ্ঠস্থ। তার সঙ্গে গানে পাল্লা দেবে এমন কেউ নেই নদে-মুর্শিদাবাদ-বর্ধমানে। ইউসুফ ফকিরও হার মানে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এত কথায় আমার দরকার কী? সত্যিই কিছু এসে যায় না, অন্তত ওদের, যারা দিব্যি মেনে নিয়েছে অনিশ্চিত বাউল জীবনের ধূসর ভবিষ্যৎ। ধূসর তো নয়, সমুজ্জ্বল— অন্তত নিজেদের বোধে। ওরা বেশ আছে ওদের মতে, বাধাবন্ধন নেই, আসাযাওয়া দু’দিকেই দরজা খোলা। খুব আনন্দ করতে পারে। ভক্ত বা সমাগত সবাইকে সেবা দেয় হৃষ্ট মনে। স্বার্থবোধ নেই, কেরিয়ার নেই, সন্দেহবাই নেই। এগুলো সবই আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একচেটিয়া।
পুরুষশাসিত সমাজের কর্তৃত্বপরায়ণতা কতটা আছে বাউল সমাজে? এখানে অধীনতার তাৎপর্য কতদূর? নারীবাদের তত্ত্ব প্রয়োগ করলে আমাদের সমাজ-আদলের মতো এখানেও কী দেখা যাবে পুরুষের সদম্ভ স্বাধিকার? যৌন নিগ্রহ বা যৌন আধিপত্য এখানে কতটা? এসব প্রশ্ন এখন আমার মনে আর তত ওঠে না, কিন্তু দু’দশক আগে উঠত। যুগলের মেলায় যখন গিয়েছিলাম তখন এসব জিজ্ঞাসায় আমি ভারাতুর ছিলাম। সামনে বেশি উদাহরণ ছিল না, বাউল জীবন তখনও দেখিনি সানুপুঙ্ক্ষে। তাই মিনতিকে দেখে যাচ্ছিলাম অনেকটাই সাগ্রহে, পদে পদে। ভাবছিলাম কোন উৎস থেকে মিনতি পাচ্ছে এত উৎসারিত স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের রসদ? সেকি কাম? দেহগত কামনার পরিপূর্তি? না প্রেম?
