এঁড়ে গরু বেড়া ভেঙে
খেজুর গাছে চড়েছে
কাল রাতের বেলা বউ আমাকে
বাবা বলেছে।
দু দু দুম দুদু দুম দুম দু-দু দুম
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে এমন উদ্ভট গান কেন বাউল গায়? উত্তরটাও জানা: আমরা শুনতে চাই বলে। এইখানটায় একটা মস্ত ফাঁকিবাজি তৈরি হয়েছে। কিছু ফন্দিবাজ মানুষ বাউল গানের নামে অদ্ভুত সব গান লিখে চলেছে। তা গাইবার মতো সাজা বাউলেরও অভাব নেই।
কিন্তু অরুণ নাগের আরও শাণিত প্রশ্ন আছে, রবীন্দ্রনাথের বাউল-অন্বেষা সম্পর্কে। তিনি বলতে চেয়েছেন, আমাদের কাছে পথিকৃৎরূপে রবীন্দ্রনাথ যে-বাউল মূর্তি রচনা করেছেন তাতে মিশেছে তাঁর আপন মনের মাধুরী। অরুণ খেদ করেছেন এই বলে যে,
জাতীয়তাবাদের অভ্যুদয়ে রবীন্দ্রনাথ বারবার গর্ব অনুভব করেছেন, ধর্ম জাতের লড়াইয়ে দীর্ণ ভারত ভারতবর্ষের একমাত্র চেহারা নয়, তার অন্তরালে যুগ যুগ ধরে বয়ে আসছে, নিরক্ষর দরিদ্র সাধারণজন যে স্রোতকে সজীব রেখেছে, সেই উদার মানবপ্রেমের স্রোতস্বিনী। কিন্তু সেই সব ধর্মের বাহ্যিক রূপ, আচার, সাধনপন্থা সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল নেই। ফলে কবির বাউল হয়ে উঠেছে আধেক কল্পনা, আধেক সত্যের বাউল, রবীন্দ্রানুরাগী শিক্ষিত বঙ্গ মানসে যার গভীর ছাপ পড়েছে।
আসল সংকট এই বাউল শনাক্তকরণ নিয়ে। কোন বাউলকে আমরা শিক্ষিত সভ্য মানুষরা চাই? কোন বাউলকে আমরা প্রোজেক্ট করছি? সে কি গরিব ট্রেনে-গান-গাওয়া অসহায় বাউল? সে কি বর্ণরঙিন বেশে নেচে কুঁদে আসর-জমানো বাউল? অথবা আমরা সত্যিই কি শরিক হতে চাই সেই রুদ্ধগীত বাউলের, মৌলবাদী মুসলমানরা যাদের হাতের একতারা ভেঙে দিচ্ছে? আমরা কি সেই বিপন্ন বাউলের সামাজিক বন্ধু ও প্রতিবাদী? অথবা আমরা শুধু জয়দেব কেঁদুলির মতো বার্ষিক মেলায় গিয়ে তাদের সঙ্গে গাঁজা খেতে উৎসাহী?
সারা দেশ ঘুরলে বাউল সম্পর্কে সংকটের আরও নানা চেহারা চোখে পড়ে। বেকার সমস্যা সমাধানের পক্ষে বাউল গান গাওয়া একটা ভাল পেশা। বর্ধমান, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া সর্বত্র এমন যুবক আমি অনেক দেখলাম গত চার বছরে। বাবরি অথবা ঝুঁটি বাঁধা চুল, লম্বা ঝুলের দামি পাঞ্জাবি, মোট দশটা বিশটা বাউল গানের পুঁজি— আসর কাঁপাচ্ছে কর্ডলেস মাইক ধরে।
সারা বছর নজরুল গীতির টিউশনি করা যার জীবিকা, প্রয়াগ সংগীত সমিতির ‘সংগীত প্রভাকর’, মেলার আসরে তার স্বনির্বাচিত নাম সুধাকান্ত বাউল, গাইছে ভবা পাগলার গান। কিংবা ধরা যাক সেই প্রসিদ্ধ গোষ্ঠগোপাল দাসের কথা। আধুনিক ধাঁচের বাউল গানে অল্প দিনে বাজার মাত করে, কাঁচা পয়সার ঝুঁজে, অপরিমিত মদ্যপানে অকালে বিদায় নিল। কণ্ঠে জাদু ছিল, গায়করূপে যেতে পারত অনেকটা, ঝরে গেল অকালে। পুরুলিয়ায় দেখেছি নামকরা ঝুমুর শিল্পী বাউল গাইছে। কথা বলে বোঝা যায়, বাউলতত্ত্ব ও সাধনার কিছুই জানে না, কিন্তু গাইছে লালনের গান ঝুমুরের ধাঁচে। কিংবা ধরা যাক মামণি দাসের কথা। হাতে গুঁজে দিল একটা ক্যাসেট। ক্যাসেট কভারে লং শটে কালার ফোটো। টাঁর জমিতে একতারা হাতে চলেছে মামণি দাস।
এসব কি আমরা উপেক্ষা করব? দেখেও দেখব না? শহরের শিষ্ট মঞ্চে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে গান হচ্ছে ‘বাদল-বাউল বাজায় রে একতারা।’ হঠাৎ উইংস থেকে মঞ্চে ধেয়ে এল এক বালিকা। চুড়ো করে বাঁধা চুল, লুঙ্গির মতো ধুতি আর গেরুয়া আলখাল্লা পরনে, হাতে একতারা (যা বাজছে না) নিয়ে দুরন্ত নাচ শুরু করে দিল। খেয়াল করলে চোখে পড়বে কপালে নাকে রসকলির ছাপ। পায়ে ঘুঙুর। মুখে বাঁধানো হাসি। ছোটবেলায় মফস্সলে জজকোর্টের মাঠে দেখতাম একজন ঠিক এইরকম বাউল সেজে পরিত্রাহি চেঁচিয়ে গান গাইত। তারপরে প্রচুর লোক জমে গেলে দাঁতের মাজনঅলা তার মাজনের গুণাবলি বলত। নানাভাবে বাউল আমাদের স্বার্থে ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে…।
১.৫ সাধনসঙ্গিনীর রহস্যলোক
ঘোর জষ্টিমাসে বসে আড়ংঘাটায় যুগলকিশোরের মেলা। লোকে চলতি কথায় বলে ‘যুগলের মেলা’। আর পাঁচটা বাংলা মেলার সঙ্গে খুব একটা তফাত নেই। ওই খেলনা, হাঁড়িকুড়ি, নাগরদোলা, বাঁশি, সার্কাস আর বড় বড় মিষ্টির দোকান। না, কেঁদুলির মেলার মতো নগরজীবনের ততটা স্পর্শ পড়েনি তাই ওয়াইন শপ এখনও গজায়নি। অবশ্য মেলার আশেপাশে, লুকোছাপা করে ধেনো বা চোলাই যে চলে না তা হলফ করে বলতে পারব না। তবে যুগলের মেলায় যেটা বড় আকর্ষণ সেটা সন্ধের পরে বাউলগানের আসর, চলে অনেক রাত অবধি। আড়ংঘাটায় আশেপাশে বেশ ক’জন বাউল আছে। দু’দশক আগে খুব নাম ছিল সুধাময় দাস বাউলের। চমৎকার মানুষ, চমৎকার গাইত। তারপরে যা হয়, গাঁজার টানে গেঁজিয়ে যাওয়া। গান গাইতে বিদেশ গিয়েছিল— সাহেবমেমরা তাকে মাথায় তুলে মাটিতে আছড়ে ফেলেছে। গাঁজার বদলে হাসিস খেয়ে অবস্থা তুরীয়— গানের গলা ভেঙে গেছে, স্বাস্থ্য গেছে চুপসে। সাহেবি ট্রাউজার আর দান করা জাম্পার পরা সুধাময় এখন এক ট্রাজিক চরিত্র।
তবু তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ, কারণ বছর পঁচিশ আগে, যুগলের মেলাতে তার আখড়ায় আমি একরাতের আশ্রয় ও আহারের সুযোগ পেয়েছিলাম। তখনও বাউলদের জীবনে তত পাকাপোক্ত হইনি। বেশ খানিকটা রোমান্টিক ধারণা নিয়ে গড়পড়তা শিক্ষিতদের মতো তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি। ভাবি, আহা কী মুক্ত বাউলজীবন, কী উদার মানবিকতার স্ফুরণ! মনের মানুষের তত্ত্বে একেবারে আপ্লুত যাকে বলে। খাঁচার ভিতরে অচিন পাখির আনাগোনার রূপক আমাকে রবীন্দ্রনাথের মতোই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তখনও জানি না ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই চণ্ডীদাসীয় উচ্চারণের মানুষ কথার অর্থ হিউম্যানিটি বা হিউম্যানিজম আদৌ নয়— মানুষ শব্দের আসলে একটা যৌন-যোগাত্মক ইঙ্গিত আছে। তখনও কবীরের লেখা দোঁহা ও বীজক তেমন করে পড়িনি অর্থাৎ ‘টেক্সট’ রূপে। তাই লালন শাহের গানে ‘ছুন্নৎ দিলে হয় মুসলমান/ নারীর তবে কী হয় বিধান’ পড়ে লালনের মৌলিকতায় তো ডগমগ হয়ে আছি, পরে আবিষ্কার করি— আরে, এতো কবীরের একটি বীজকের আক্ষরিক অনুবাদ!
