বাউলরা প্রচলিত ধর্ম, জাতি বা বর্ণবৈষম্য, দেবদেবী, পূজা-আচার, নামাজ-রোজা, মন্দির-মসজিদ কণ্টকিত সামন্ত সমাজের ধ্যানধারণাকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করতেন, এবং সেই ভাবধারাতেই আপ্লুত তাঁদের ‘মনের মানুষ’ এক নতুন মানবতাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সামন্ত সমাজে নিপীড়িত জনসমাজে তাই সেই মানুষটি আসন পাততে পেরেছিল।
তিনি বোঝেননি যে ‘মনের মানুষ’ তত্ত্ব কোনও নতুন মানবতাবাদের প্রতীক নয়— নিতান্তই যৌন-যৌগিক পরিভাষা। সেই ‘মনের মানুষ’-কেই তাঁরা সকলের কাছে আবৃত রাখতে চেয়েছিলেন। লালন-পাঞ্জু-দুদ্দু শাহ-র মতো মানুষতত্বে বিশ্বাসী বাউলদের আসল সংগ্রাম সামন্ত সমাজের সঙ্গে ছিল না, তাঁরা চেয়েছিলেন অজ্ঞ অশিক্ষিত কুহকে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সাধারণ মানুষের ভ্রান্তিমোচন ও নতুন পথ নির্দেশ। ভদ্রলোক শ্রেণি বা সামন্তশ্রেণি নিয়ে তাঁদের কোনও উৎসাহ বা দুশ্চিন্তা ছিল না, সেই শ্রেণির জন্য তাঁরা গানের একটি পঙ্ক্তিও রচনা করেননি। তাঁদের ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন করেছিল গ্রামীণ সমাজে প্রবর্ধমান ‘বুত্পরোস্তি’ (পৌত্তলিকতা), ‘পীরপরোস্তি’ (ধর্মের অলৌকিকতায় অন্ধবিশ্বাস) এবং জাতিবর্ণভেদের তীব্রতা। দরগাতলায় হত্যে দেওয়া, আলেয়া, পেঁচোপেঁচি, ভূতপ্রেত, ফেরেস্তা, কাঠের ছবি, মাটির ঢিবি, হরিষষ্ঠী-মনসা-মাখালের মতো অপদেবতা নির্ভরতা, নামাজ রোজা, ব্রত উপবাস, তীর্থভ্রমণ ও নির্জনে গিয়ে বৈরাগ্য সাধন— এ সবই তাঁদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল। তাঁরা চাইছিলেন সাধারণ মানুষের মানস-উত্তরণ— অন্ধতা, কুসংস্কার আর আচরণবাদী শাস্ত্রসর্বস্বতা থেকে। এর পাশে মানবতার আদর্শ বা মানবতাবোধকে তাঁরা জাগাতে চাননি— কেননা সেসব উচ্চভাব তাঁদের অজ্ঞাত ছিল। যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে দেশপ্রেম বিষয়টি বাঙালির অজ্ঞাত ছিল। এগুলি বিদেশাগত ধারণা, ঔপনিবেশিক সূত্রে প্রাপ্ত।
তা হলে লোকায়ত বাউলরা মানুষ বলতে কী বুঝেছিলেন? অন্তত হিউম্যানিজম বা হিউম্যানিটি বোঝেননি। তাঁদের কথার ধরতাই আগেও ছিল এখনও আছে যে, মানুষ ধরো। মানুষ রতনকে যত্ন কর। তাঁদের স্পষ্ট কথা: ‘মানুষ-তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে/ সে কী অন্য তত্ত্ব মানে?’ এই মানুষতত্ত্ব গড়ে ওঠে মানুষরতনদের সমন্বয়ে। কিন্তু মানুষ রত্ন জন্মসূত্রেই অর্জনীয় গুণ নয়— তা হয়ে উঠতে হয়। তার জন্য আকুলতা, গুরুকরণ ও সাধনা চাই— চাই যৌনতার পথ, নারী ও আত্মসংযম। তবেই মানুষ হতে পারে মানুষরতন। কাজেই প্রথমে চাই মানুষতত্ত্বে বিশ্বাস—দেবতত্ত্বে বা কুহকতত্ত্বে নয়, অলৌকিকতায় নয়। দেবদেবতারা পর্যন্ত এই মানুষজন্মের জন্য পাগল, লালন বলেন। বাউল আসলে ‘মনের মানুষ’-চর্যার পথে মানুষকে ধরে, স্থিত হতে চায় অবিকল্প মানুষতত্ত্বে।
কখনও কখনও এমন হতে পারে যে বরাবর আমরা বাউলদের ভুল বুঝে চলেছি এবং হয়তো তাদের ভুলপথে চালনা করছি। অরুণ নাগ যেমন লক্ষ করেছেন:
পশ্চাদপটে শোলার কাজে আল্পনার মোটিফ, কর্তারা ধুতি পাঞ্জাবিতে মঞ্চে শোভিত, তেমন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে বাউল গানও অবধারিত।
অরুণ অভিযোগের আঙুল তুলেছেন রবীন্দ্রনাথের দিকে, কেননা বাংলার বাউল নিয়ে আজ মধ্যবিত্ত শিক্ষিতজনের যে ভাবালুতা তার মূল কারণ রবীন্দ্রনাথের বাউল সম্পর্কে উৎসাহ, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি বাউলদের সঠিকভাবে বুঝে তাদের যথাযথভাবে উপস্থাপিত করেছেন বাঙালির ভাবলোকে? অরুণ মনে করেন:
বাউল সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ, দরদ সুপরিজ্ঞাত। আন্তরিকতা নিয়ে কোনোই সংশয় নেই, তবে সত্যের খাতিরে স্বীকার করা উচিত, তাঁর দর্শন খণ্ড-দর্শন। তার কারণ এই নয় যে বাউলদের ধর্ম তথা জীবনাচরণ নিয়ে সমকালে যে নিন্দাস্রোত প্রবহমান, সে সম্পর্কে তিনি নীরব। নিশ্চয় তা সমর্থনের নীরবতা নয়, পঙ্কজের সমাদর করতে পঙ্কের উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা তিনি বোধ করেননি। তাঁর দর্শনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হবে অন্য একটি উদাহরণ দিলে। তিনি বাউল গানের রসিক, বহু গান প্রকাশ করেছেন, উদ্ধৃত করেছেন, কিন্তু বাউল গানের বিশিষ্ট শাখা, দেহতত্ত্বের গান তাঁর বিশেষ মনোযোগ পায়নি। বাউল ধর্ম অনুগামীর সংখ্যায় গৌণ হলেও যে-কোনো মুখ্য ধর্মের মতো তারও নিজস্ব সাধনপন্থা আছে, আছে আচার, পালনীয় অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথ তাতে অনাগ্রহী। স্বয়ং কবি, তথা ধর্মের উদার মানবতাবাদী। তিনি বাউলদের দেখতে চেয়েছেন মূলত মরমীয়া কবি হিসাবে, যাদের জাত পাতের ঊর্ধ্বে উদার মানবপ্রেমের কথা।
অরুণ নাগ এখানে অভিযোগটি সঠিক লক্ষ্যে নিক্ষেপ করেছেন কিন্তু তাঁর বক্তব্যও সম্পূর্ণ নয়। তিনি বলতে পারতেন, বাউলের জীবনচর্যার সামান্যই প্রতিফলিত হয়েছে বাউল গানে, কেননা তাদের মধ্যে ক’জনই বা গীতিকার? মূল বাউল স্রোতে সাধনমার্গী মানুষের সংখ্যা তো শত শত। তাদের মধ্যে ক’জনই বা গায়ক? তার মধ্যে আবার ক’জনই বা তত্ত্বজ্ঞ গায়ক? আমরা সভাসমিতিতে শোলার আল্পনার মোটিফ টাঙিয়ে রবীন্দ্র গানের পাশে যে বাউল গান শুনে থাকি, শুনতে চাই তা তো কোনও তত্ত্ব গান নয়— খানিকটা প্রহেলিকাময় গান, খানিকটা নাচ ও তালে স্পৃষ্ট মজার গান। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এমন একটা বাউল গানের নমুনা দিয়েছেন, যেমন—
