বলো আমার বাবা কোথায় গেল?
দেখিতে দেখিতে আমার দিন গত হল।
শুধাই বৃদ্ধ মাতার কাছে
বাবা আমার কোথায় গেছে?
মা বলে তোর ঘরের ভেতর ছিল।
সহোদর বলে ভাই হাটে মিলে নাই
ভগ্নী বলে অগ্নিবেশে ঘর করেছে আলো।
বাবার দেহ বাবার মায় বাবার দোহাই দিয়ে বেড়াই
পিতাপুত্রে আলাপ নাই যে ভাল—
ইতিপূর্বে মাতৃগর্ভে দেখা হয়েছিল।
রহস্যভরা এমন দেহতত্ত্বের গানের উপজীব্য হল পিতৃবস্তু বা বীর্য— যা সন্তানের দেহেও বর্তমান। তাই মা বলছেন ‘তোর ঘরের ভেতর ছিল’। ঘর মানে দেহ, দেহঘর। সেই অমোঘ পিতৃবস্তু, যা সন্তান-সন্ততিক্রমে চলছে মানবসভ্যতার উষাকাল থেকে, তার বিলয় নেই। তা সদা সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে মাতৃগর্ভে গিয়ে। বাউল গানে চমৎকার কিছু পরম্পরার ছক থাকে, যেন অনন্ত সত্যের বিচ্ছুরণ। যেমন একটা পদে আছে, ‘ঝিয়ের পেটে মায়ের জনম।’ ঝি মানে মেয়ে বা কন্যা, সে জন্মেছে তার মা’র গর্ভ থেকে। আবার সে একদিন হবে মা, তখন বলা যাবে ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম। তেমনই পিতৃবস্তু থেকে জন্মায় সন্তান, তার মধ্যে থাকে পিতৃবস্তু, যৌবনে সেই বস্তু থেকে সেও অর্জন করে পিতৃত্ব। তবে সেক্ষেত্রে মাতৃবস্তু বা রজের সংস্পর্শ চাই, অর্থাৎ ডিম্বাণু। বাউল ভারী রহস্য করে প্রতীকী আবরণ দিয়ে গানে বলেছে শুক্ররস আর ডিম্বাণুর মিলন কাহিনি— বলেছে,
বসত তাদের শুনি ভাণ্ডের মাঝেতে।
দুই দেশেতে তারা দুইজন বসত করে—
কী প্রকারে দেখা রাস্তার মাঝারে।
এদের রসান দিয়ে বলা হয়েছে ‘কালা’ আর ‘বোবা’। চমৎকার।
পিতৃসন্ধানী সেই সন্তানের কথা হচ্ছিল, যার প্রশ্ন: ‘মা, আমার বাবা কোথায় গেল?’ পিতাপুত্রে আলাপ নেই তেমন, কেবল অস্পষ্ট স্মৃতি চেতনায় মনে পড়ে যেন মাতৃগর্ভে একবার চকিতে দেখা হয়েছিল পিতাকে। সেই ধূসর স্মৃতি থেকে পিতৃসন্ধান কি সম্ভব? বিভ্রান্তিও তো কম নয়—
কেউ বলে গেছে এই পথে
কেউ বলে গেছে ওই পথে
নানা মুনির নানা মত কোন পথে বলো?
কেউ বলে নেমেছে জলে
কেউ বলে তব অনিলে
কেউ বলে অনলে পুড়ে গেল।
বাউল কল্পনায় শূন্যতার একটি ভূমিকা থাকে— ‘আছে শূন্যভরে একটি কমল।’ পিতৃবস্তু, যা জনয়িতা, তা পঞ্চভূত থেকে শরীরে আসে, পুষ্টির পথে, খাদ্যে ও জলে। আব-আকাশ-খাক-বাত, এই চার উপাদানে সব কিছু গড়া, তাই অনল-অনিল-জলের উল্লেখ। এরপরে শেষ কথাটা উচ্চারিত:
আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে বাবার খবর সে পেয়েছে
সত্য করে আমার কাছে বলো।
বলো বাবার রূপবর্ণ নাম রূপ তার ভিন্ন ভিন্ন
অনন্ত কয় বিশেষ চিহ্ন
বাবা আমার কালো নয়, ধলো।
অনবদ্য এই জীবনমুখী গান। পিতৃবস্তু অর্থাৎ সাদা। এইজন্যই দীক্ষাবস্ত্রের সবই সাদা। আবুবকর ও পারুল এতদিনে বুঝেছে পিতৃবস্তুর বর্ণচিহ্ন আর মর্ম। সেইজন্যই তাদের সামনে উন্মোচিত হবে এবার দীক্ষান্ত জীবন, প্রসারিত ও প্রেমময়। কামের ঘরে কপাট মেরে সেখানে যেতে হবে। ঘরের চাবি দিতে হবে গুরুর হাতে। উষ্ণ সংযত সংবেদনে ভরা অনন্ত সাধনজীবন তো বৈরাগ্যের নয়, তাই লালনপন্থী বাউল কখনও গেরুয়া পরে না। আবুবকররাও পরেনি।
এবারে আমরা ফিরে যাই ছেঁউড়িয়ায় লালনের মাজারে— যেখানে চলছে এক আগ্রহী নরনারীর খিলাফতের প্রস্তুতি-পর্ব। প্রত্যক্ষদর্শী লিখছেন,
নিম্নস্বরে কলেমা বা মন্ত্র পাঠ করালেন খাদেম নিজাম শাহ। জীবিতের জানাজা শেষ হলে সকল দুষ্কর্ম ও পাপ থেকে দূরে থাকার হুকুম হিসেবে শাদা কাপড় দিয়ে দুজনের চোখ ও হাত বেঁধে দেওয়া হল। এরপর গুরু গোলাম ইয়াসিন শাহ্ কম্পিত হাতে মাজার-আঙিনায় একমুঠো চাল ছিটিয়ে বললেন, ‘ভূ-মণ্ডলে ছড়িয়ে দিলাম তোমাদের দানা, খুঁটে খাও।’ পারুল-আবুবকর গুরুর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে ভক্তি দিলেন। সকল মায়া-মোহ থেকে আজ তাঁরা মুক্ত হলেন। স্বজন-সংসারের কোনো দাবি আর তাঁদের কাছে রইল না। জীবন মরণ, সাধ-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা সবকিছু আজ তাঁরা সঁপে দিলেন সাঁইজীর চরণে। জগৎ সংসারের কাছে তাঁরা আজ মৃত।
এবার শেষ দৃশ্য। হাত-চোখ বাঁধা পারুল-আবুবকরকে গুরুমা আর খাদেমের সেবাদাসী ধীরপায়ে নিয়ে গেলেন সাঁইজীর সমাধি-ঘরের পাশে, সাতবার তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ) করতে হবে। তাঁদের পেছনে সাধু গুরুর দল, একতারা-খঞ্জরি-জুড়ি হাতে নিয়ে ভক্ত-শিয্যেরা গাইছেন দেলদরিয়ার তুফান-তোলা ভেক-খিলাফতের সেই গানটি:
কে তোমারে এ বেশ-ভূষণে
সাজাইল বলো শুনি।
জিন্দা দেহে মরার বসন
খির্কা-তাজ আর ডোর-কোপিনী।
জিন্দা মরার পোশাক পরা
আপন ছুরাত আপনি সারা
ভবলোককে ধ্বংস করা
দেখি অসম্ভব করণি।
যে মরণের আগে মরে
শমনে ছোঁবে না তারে
শুনেছি সাধুর দ্বারে
তাই বুঝি করেছ ধনি।
তাওয়াফ শেষ হল, গান থামল। এবার শুরু হল গ্রাম-পরিক্রমা ও ভিক্ষা সংগ্রহ।
পাঠকদের তরফে প্রশ্ন উঠতে পারে বাউলদের দীক্ষাশিক্ষা নিয়ে এতরকম ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার সাহায্যে এত বিস্তারে কী প্রতিপন্ন করা হল? এ ব্যাপারে জানানো দরকার যে, বাংলা ভাষায় বাউলদের নিয়ে সুদীর্ঘকাল যাঁরা লেখালেখি করেছেন, তাঁরা সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ খুব কমই ব্যবহার করেছেন। আমাদের নিম্নবর্গের সমাজ কাঠামোর বিশেষত্বের সঙ্গে বাউল-ফকিরদের সংলগ্ন করে তাঁরা দেখেননি। একদল তাঁদের আচরণবাদকে ঘৃণা ও নিন্দা করে কার্যসমাধা করেছেন, আরেকদল উচ্ছ্বসিত হয়েছেন বাউল গানের বাণীর তাৎপর্যে, ভাবের মরমি রহস্যে। তাদের সাংকেতিক শব্দগুলির রহস্যভেদ না করে শিষ্টসমাজের শিক্ষিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাববাদী ব্যাখ্যা করে বসেছেন। এমনকী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো বস্তুবাদে বিশ্বাসী কমিউনিস্ট, বাউলদের সঠিক বোঝেননি। তিনি কোনও অজানা কারণে লিখেছেন,
