বাউল সম্প্রদায়ভুক্ত অনেকেই এখন নানাকারণে জাত-ব্যবসা ত্যাগ করে ভিন্ন পেশা গ্রহণ করেছেন। কেউ ক্ষুদে দোকানদার বা ব্যবসায়ী, কেউ নিম্ন চাকুরে, কেউ গতর খাটিয়ে জন-মুনিষ। কিছু সংখ্যক ভিক্ষাজীবীও আছে।
খোদ লালন ফকিরের আস্তানা ছেঁউড়িয়াতে এখন মাত্র কুড়িঘর বাউল থাকে। তাদের মধ্যে দীক্ষাপ্রাপ্ত বাউল স্রেফ ছ’জন। বাউল দীক্ষার অনুসন্ধান তাই সেদেশে বেশ আয়াসসাধ্য কাজ। তবু আবুল আহসান তেমন এক প্রতিবেদন পেশ করেছেন। কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রধানত লালন-পন্থার বাউলরা থাকে। দীক্ষা-প্রতিবেদন তাই সেই ঘরানার বলে ধরে নিতে হবে। বাংলার অন্য অঞ্চলের মতোই বাংলাদেশেও,
সাধনায় প্রবেশের জন্য বাউলকে গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে হয়। একেক ঘরানার একেক পন্থা আর পদ্ধতি। লালনীয় মতে গুরু তিনবার কলেমা হক পাঠ করিয়ে ঘরে তোলেন দীক্ষার্থীকে। গুরুর হাত থেকে চাল-পানি ‘সেবা’ গ্রহণের পর দীক্ষার করণ পূর্ণ হয়। এরপর চলে সাঁইজীর নাম-গান। সবশেষে সাধুচরণে নিবেদিত হয় সাধ্য-‘সেবা।’ সাধারণত দীক্ষার এই অনুষ্ঠান গুরু বা শিষ্যের বাড়ি কিংবা লালন সাঁইজীর ধামে হয়ে থাকে।
কলেমা থেকে চাল-জল সেবা, শিষ্য বাড়ি বা গুরুগৃহ— কুষ্টিয়ার বাউলের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের বাউলদীক্ষার অনুপুঙ্খ প্রায় এক, এর কারণ কি? কারণ দুই অঞ্চল খুব কাছাকাছি এবং দুই স্থানেই বাউলদের প্রধান অংশ দীক্ষিত হতে আসে মুসলমান সম্প্রদায় থেকে। কুষ্টিয়ার দীক্ষাকর্মে বাড়তি সংযোজন হল লালনগীতি এবং লালনের ধামের ঐশী অনুষঙ্গ। পরবর্তী বৃত্তান্ত,
দীক্ষার পর শুরু হয় শিয্যের পরীক্ষাকাল। গুরুর নির্দেশে চলতে থাকে সাধনভজনের ক্রিয়া-করণ। শিষ্য সাধনার ‘স্থূল’ বা ‘ফাশ্ফির শেখ’ পর্যায় অতিক্রম করলে ভেক খিলাফতের যোগ্য হয়ে ওঠেন। দীক্ষাগুরু কিংবা তাঁর অবর্তমানে গুরু-মা খিলাফত দিয়ে থাকেন। এঁদের উভয়ের অনুপস্থিতিতে তৃতীয় একজন সাধু এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে তাঁকে পাঁচজন সাধুগুরুর সম্মতি নিতে হয়।
লালন পন্থা, দেখা যাচ্ছে, যথেষ্ট উদার। গুরুর বদলে গুরুমা, তাঁদের বদলে তৃতীয় কোনও সাধুজনের দীক্ষাদানের অধিকার ব্যাপারটি অভিনব। এরপরে আবুল আহসান ১৯৯০ সালের ১৯ অক্টোবর লালনের মাজারে (ছেঁউড়িয়ার) অনুষ্ঠিত এক পুরুষ-প্রকৃতির খিলাফত-পর্বের সরেজমিন বিবরণ দিয়েছেন। স্বচক্ষে দেখা বলে লেখকের ভাবাবেগ তার ভাষা-শরীরে প্রত্যক্ষ।
দম্পতির নাম আবুবকর সিদ্দিক ও রাইমা খাতুন ওরফে পারুল, নিবাস জেলা যশোরের ঝিকরগাছির কালিয়া গ্রাম। খিলাফত দেবেন প্রবীণ বাউল সাধক ফকির গোলাম ইয়াসিন শাহ। দীক্ষা হবে লালন শাহের মাজারে।
অনুষ্ঠান বিবরণের ভিতরে প্রবেশ করার আগে, পাঠক, জেনে নিতে পারেন আরও কিছু জরুরি তথ্য। যথা— ভেক খিলাফতের দুটি রকম আছে। একটি বৈষ্ণবীয় আরেকটি দরবেশি। দুটির পদ্ধতি ও পোশাক আলাদা, আনুষ্ঠানিক লালনগীতি আলাদা। ভেকে আঁচলা-ঝোলা, খিলাফতে শুধু আঁচলা। ভেকে ‘ভিক্ষা’ আর খিলাফতে ‘নজরানা’। লালনের লেখা ‘কাঙাল হব মেঙে খাব’ গাওয়া হয় ভেকের সময়। আর দরবেশি মতের খিলাফতে গাওয়া হয় ‘কপাট মারো কামের ঘরে।’ সেদিন আবুবকর-পারুলের হয়েছিল খিলাফত তবে বৈষ্ণবীয় মতে। এবারে খিলাফতের বর্ণনা—
মাজার-আঙিনার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সবাই এসে জড়ো হয়েছেন। চারজন সাধু চাঁদোয়ার চারকোণা ধরে রয়েছেন। সৌম্য-সুঠাম দীর্ঘদেহী আবুবকরকে এনে দাঁড় করানো হলো চাঁদোয়ার তলায়। লম্বা বাবরি ও ঘন কৃষ্ণ শ্মশ্রু গৌরবর্ণের ছটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। আমগাছের পাতার ফাঁক গলে নেমে আসা সূর্যের আভায় ঝলমল করছে সারা শরীর।
আবুবকরের এতদিনের শরীয়তি পোষাক খুলে নিয়ে পরিয়ে দেওয়া হলো ‘খিলকা’ নামের সেলাইবিহীন একখণ্ড শাদা কাপড় আর শাদা তহবন্দ। পরানো হল ‘ডোর কপনি’, লেঙ্গটি বা নেংটি; রুদ্ধ হলো কামের ঘর আর সৃষ্টির দ্বার। কাঁধে উঠলো আঁচলা-ঝোলা। গুরুমা গলায় পরালেন শাদা তস্বিহ বা জপমালা। মাথায় বাঁধা হলো শাদা পাগড়ি বা তাজ। সব কিছুতেই শাদা রঙের ব্যবহার এক বিশেষ প্রতীকী তাৎপর্য তুলে ধরে। হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো জলপাত্র ও একটি ছড়ি।
এবারে আনা হল ধর্মপত্নী পারুলকে। পাড়বিহীন শাদা কাপড়ে জড়ানো হলো তার শরীর, গায়ে চড়লো ‘খিলকা’। একে একে তাঁকেও পরানো হলো ভেকখিলাফতের পোষাক। মৃতের অন্তিম-যাত্রার সাজে সাজলেন তাঁরা, ‘জিন্দা দেহে মরার বসন।’
মনে হচ্ছে যেন একটা নতুন জগতে এসে পড়েছি আমরা। আধা ইসলামি আধা বাউল সংস্কারের মধ্যে দিয়ে চলছে এক নবজীবনের প্রস্তুতি। সেলাইবিহীন লম্বা ঝুলের খিলকা আর কোমরে জড়ানো তহবন্দ যেন একেবারে ফকিরি সাজ, যাতে নেই কোনও জৌলুস বা অলংকার। এসবই মৃতের সাজসজ্জা— লালনের গানে একেই বলা হয়েছে ‘জিন্দা দেহে মরার বসন’, ঠিকই। কিন্তু এ কেমন মৃত্যু? এ হল পার্থিব জগতের ভোগসুখকামী সত্তার মৃত্যু। মানুষটির আর কোনও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকল না— একেবারে পরিবর্তিত সত্তা, ‘জ্যান্তে মরা’। খেয়াল রাখতে হবে, শুধু বহিরঙ্গিক রূপান্তর নয়, বিশেষ মানসিক রূপান্তর ঘটে গেছে তার। ইসলামিয়া ছেড়ে সে সামিল হল লোকায়ত সাধনে। আজন্মের সংস্কার ত্যাগ করে এবারে তার অন্তরের অন্তস্তলে ঘটল নবভাবের অভ্যুদয়। বহুবর্ণরঞ্জিত জীবন থেকে সে শ্বেতশুভ্র রংকে আলাদা করে বেছে নিল— সাদা একরকম প্রতীকী বর্ণ। কীসের প্রতীক? অনন্তদাসের একখানা পদ পেয়েছিলাম জনৈক বাউলের সংগ্রহে। তাতে আছে:
