এবারে সার কথায় আসি। ইংরিজিতে যাকে বলে ‘নন-কমিউনিকেটিভ’, বাউলরা বহুদিন পর্যন্ত ছিলেন সেই দলে। আর এখন তাঁরা মাস-কমিউনিকেশনের বৃহত্তর বলয়ে আসতে চাইছেন— সেটা সময়ের দাবি। গ্রামিক সমাজের একটেরে মেটে দাওয়ায় বসে অন্তর্গুপ্ত মগ্ন সাধক সন্ধান করতে গেলে এখন হতাশ হতে হবে। বিশ-পঁচিশ বছর আগেও তাঁদের দেখেছি— এখন নেই। অথচ যাঁরা আছেন তাঁদের পক্ষে গোপনতা রক্ষা বাউল জীবনের কোনও শর্ত নয়। বীরভূমের গৌরবাবা প্রাঞ্জল ভাষায় আমার টেপ রেকর্ডারে স্বেচ্ছায় বলে গেছেন তাঁর সাধনবিবরণ— বিনা দ্বিধায়। এই সব ঘটনা বলে, ভূমিকা রচনা করে, এবারে শক্তিনাথ ঝা-র বই থেকে আরেকটু উদ্ধৃত করব।
শিষ্য-শিষ্যা যদি যথার্থ ভক্ত এবং বাউল তত্ত্ব জেনে থাকে এবং প্রার্থনা করে গুপ্ত দীক্ষা, তাহলে অন্য কতগুলি গোপন পদ্ধতি দীক্ষায় অনুষ্ঠিত হয়। যেমন ভরতপুর থানার তালগ্রামের গুরু লালবাবা শিষ্য-শিষ্যার জিহ্বা চুম্বন ও শোষণ করে দীক্ষা দেন। এতে নাকি কুলকুণ্ডলিনী জেগে ওঠে। দীক্ষার সময় নারী রজঃস্বলা থাকলে সে গুরুকে রজঃ দান করে; অন্যথায় রস বা স্তন দুগ্ধ দান করে।
কলস দীক্ষায় বারো বছরের এক কিশোরীর প্রয়োজন হয়। শিষ্য বস্ত্র এবং নারী দেবে গুরুকে; তিনি রজঃস্বলা নারী দেহে রজঃবীজের মিলন করে, ‘ওঁ পদ্ম শুক্রধারা’ মন্ত্রে এই দেহরস সংগ্রহ করে, তা দিয়ে শিষ্য-শিষ্যাকে দীক্ষা দেবেন। অনেক সময় গুরু নিজবস্তু দিয়ে শিষ্য-শিষ্যাকে দীক্ষা দেন।
এমন আশ্চর্য অন্তঃশীল গোপ্য জগতের সংবাদ যেমন অস্বস্তিকর তেমনই রুচিহীন লাগতে পারে অনেকের সংস্কারে, কিন্তু এ বিবরণে কোনও কল্পনা নেই। কারণ,
বাউলদের মধ্যে যথার্থ গুরুকরণ এক গুপ্ত সাধনা।… চারচন্দ্রভেদ বাউল সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ‘চারচন্দ্র আলেক সাঁই তার উপরে কর্ম নাই’… এই চারচন্দ্রের সাধনা দিয়েই বাউল সনাক্ত করা যায়। দেহ রক্ষায়, বস্তু রক্ষায়, রোগের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় বাউল পন্থায় চারচন্দ্র অনিবার্য এক সাধনা।… যৌনরোগী বা দেহসাধক যারা চারচন্দ্র ভেদ করে না, বাউল তাদের বৈদিক-যৌগিক সাধক বলে।
ক্ষিতিমোহনের দাবি, তিনি এই কায়াবাদের বিরোধী যোগপন্থার সাধক বাউলদের গান সংগ্রহ করেছেন।
বাউল দীক্ষার নানা বৈচিত্র্য, রীতিনীতি, গুপ্ত-ব্যক্ত সাধনার বহুচারী স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে আঞ্চলিকতার প্রসঙ্গ উঠেছে। দেখতে পাচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গের গায়ে-গা-লাগানো দুটি জেলা বীরভুম আর মুর্শিদাবাদে বাউল সম্প্রদায়ের কত কি স্বাতন্ত্র্য। এই স্বাতন্ত্র্যের কারণ নিশ্চয়ই আঞ্চলিকতা এবং পারস্পরিক সংযোগের অভাব। আধা বৈষ্ণব আধা বাউলদের সঙ্গে আধা মুসলমান আধা বাউলদের পার্থক্য দুস্তর। এরা যেন আলাদা গোষ্ঠীর মতো। দু’দলের অবস্থান ও প্রতিষ্ঠাও ভিন্ন। বীরভূমের গ্রামিক সমাজ-ছকে বাউলরা শ্রদ্ধা না পেলেও বিরুদ্ধতা পায়নি কখনও। তারা যেন আবহমান পল্লিজীবনের শরিক। তাদের মাধুকরী চলে হিন্দু গৃহস্থের বদান্যতায়। তাদের গানের শ্রোতা ও সমজদারও গ্রাম্য সমাজ। কিন্তু মুর্শিদাবাদে আলেমদের সঙ্গে বাউলদের সংঘর্ষ ও সংঘাত চলছেই। তার কারণ সেখানকার বেশির ভাগ বাউল শরিয়তি সমাজ ও নির্দেশ অগ্রাহ্য করে চলে এসেছে বাউল পন্থায়। এই আত্মবিচ্ছেদ মুসলিম মানসের পক্ষে অসহনীয়। তাদের ক্ষোভ ও আক্রোশ বাউলদের ওপর আরও বেশি এইজন্য যে বাহ্যত তারা মুসলিম সমাজের অংশরূপে থাকে এবং সেই সমাজকেই ভেতরে ভেতরে প্রতিবাদে প্ররোচিত করে। ইসলাম ধর্মে গান গাওয়া নিষিদ্ধ অথচ বাউলদের গানই একমাত্র আত্মপ্রকাশের বাণী। অন্যদিকে তারা স্বভাবত সৎ ও শান্তিপ্রিয়, অনাড়ম্বর এমনকী দরিদ্র জীবনযাপনে কৃতার্থবোধ করে। মৌলবাদী শক্তির প্রতাপে তারা অসহায় ও সংকুচিত। তাই মার খেলেও পালটা মার দিতে পারে না। মুর্শিদাবাদের একটি গ্রামে একজন বাউল আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের হল চোরের মতো জীবন। আমরা সমাজে আত্মগোপন করে থাকি।’ হিন্দু সমাজ থেকে প্রতিবাদী মন নিয়ে যারা বেরিয়ে এসে বাউল হয় তাদের এমন দুর্গতি বা খেদ নেই। হিন্দু সমাজ কাঠামো অত্যন্ত সহনশীল ও উদার।
খোঁজ করলে সারা বাংলায় বাউল সাধনা ও দীক্ষা করণের নতুন নতুন খবর পাওয়া যাবে। কিন্তু এতক্ষণকার আলোচনায় আমরা মনে রাখিনি প্রতিবেশী বাংলাদেশের কথা। বাউল মত স্ফুরিত হয়েছিল অখণ্ড বাংলায়। রাজনৈতিক বিভাজনে দুটি দেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কিন্তু বিশেষ করে গ্রামসমাজ ও লোকায়ত জীবনের কাঠামো, খাদ্যাভ্যাস ও ভাবনা বিশ্বাসে খুব একটা বিচ্ছেদ ঘটেনি— দুটি দেশকে অলক্ষে ধরে রেখেছে বাংলা ভাষা ও বাঙালিয়ানা, তার লয়ক্ষয় নেই। সেইজন্যই জানতে ইচ্ছা করে বাংলাদেশে বাউলদের বর্তমান অবস্থা কেমন এবং তাদের আচরণবাদ ও দীক্ষাশিক্ষার রীতিপদ্ধতি কতটা স্বতন্ত্র। অবশ্য সেই তথ্য উপস্থাপনের আগে মনে রাখা উচিত যে দেশ বিভাগের ফলে নানা প্রতিকূলতায় বাংলাদেশে বাউলরা প্রায় ক্ষয়িষ্ণু। তা ছাড়া সেখানে ইসলামের জঙ্গি ভূমিকা বিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকেই বাউলধ্বংসে উদ্বুদ্ধ। তার ফলে লালন ফকির, পাঞ্জু শাহ, হাসন রজা, দীন শরৎ, শীতলাং শাহ, রশীদ, জালাল ও বিজয় সরকারের মতো উন্নত বাউল গীতিকারের দেশ এখন বন্ধ্যা। কুষ্টিয়ার আবুল আহসান চৌধুরীর পরিবেশিত তথ্য থেকে জানা যায়:
