যাই হোক, শক্তিনাথ ঝা খুব বিস্তারে তাঁর বইতে দীক্ষাগ্রহণের পর শ্বাস নিয়ন্ত্রণের প্রণালী বুঝিয়েছেন। সেই পদ্ধতি বেশ জটিল ও অনুশীলন সাপেক্ষ। যেমন:
নাভি থেকে দক্ষিণ দিকে বাঁকিয়ে দম বায়ু বাঁদিকের হৃৎপিণ্ড ডান হৃৎপিণ্ড হয়ে কণ্ঠনালী দিয়ে ঊর্ধ্বে তোলার সশব্দ জপের পদ্ধতি গুরু দেখিয়ে দেন। সচরাচর মুসলমান সমাজভুক্ত শিষ্যকে ‘লাইলাহা ইল্লালা’ এবং হিন্দু সমাজগত শিষ্যশিষ্যাকে ‘ওঁ হুঁ চন্দ্রে বিন্দু গুরুবে নমঃ’ প্রভৃতি জপের মন্ত্র দেওয়া হয়। বায়ুকে ঊর্ধ্বগামী করার অন্যান্য মন্ত্র হল,
হু বিন্দু কর্তা হু নাম তোমার বিন্দু বিধাতা
ঐ বিন্দু নাম গণি
হু বিন্দু নামে উদ্ধার কর তুমি
উজানে যাও দয়ার সিন্ধু লাল বিন্দু মণি।
বা
রতির ঘরে বসল কালা
রতি যেন না যায় মারা
দোহাই কালা দোহাই কালা।
তথ্য থেকে আরও জানা যাচ্ছে, যোগ বা জপধ্যান এবং জিকিরের সাহায্যে পিরপন্থার সাধকরা দেহমার্জনা ও মূলবস্তু রক্ষা করে। কেউ কেউ ষটচক্রভেদ করা শেখান। বাউলরা বায়ু সাধনা করে কারণ তারা মনে করে শুধু জপ করে কায়াচর্যা বা বস্তুরক্ষা সম্ভব নয়। তার জন্য চাই রজবীজের সন্ধান ও সাধনা। সেই সাধনার নিয়ন্তা হলেন গুরু বা মুর্শিদ। প্রতীকী অর্থে যাকে বলে ‘বর্জোক’— বর্জোক মানে মধ্যবিন্দু, উপাস্য আর উপাসকের মাঝখানে। তিনিই মাধ্যম, তিনিই সেতু।
বীরভূমের বাউলদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের বাউলদের অনেকটাই মিল লক্ষ করা যায় গুরুর ভূমিকা থেকে। আমরা যেমন বলি গুরু-শিষ্য, কথান্তরে সেটা দাঁড়ায় পির-মুরিদ। জানা যাচ্ছে গুরুশিষ্য সংবাদের আরও রহস্য। যথা—
শিষ্য বা মুরিদের আরবি প্রতিশব্দ বায়য়াৎ। কোরাণে মোবায়াৎ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ ক্রয়-বিক্রয়। শিষ্য বিক্রয়কারী, সে আপনার ধনপ্রাণ, যথাসর্বস্ব গুরুকে অর্পণ করবে। এর বিনিময়ে গুরু আজাত বা ত্রিতাপ জ্বালা থেকে মুক্ত করে স্বর্গসুখের রাজ্যে নিয়ে যাবে এবং দুঃখময় পুনর্জন্ম থেকে তাকে রক্ষা করবে। হিন্দু সমাজের অনেকে দেবতাকে প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করে তা চিরতরে পরিত্যাগ করে। ইসলামের যথার্থ কোরবানীতে নফ্স্ বা কামনার ধনকে অর্থাৎ স্ত্রীকে কোরবানীর ব্যাখ্যা করে বাউল। নিজের স্ত্রীকে এবং নিজের মূল বস্তুকে গুরুকে দিয়ে দিতে হয় শিষ্যের। সে এগুলির মালিক নয় আর। স্বাধীনভাবে দেহমিলন বা সন্তান সৃষ্টির অধিকার তার থাকে না। দেহ দান এবং নিজের স্ত্রীকেও দান করে দেয়া অহং বিলোপের সাধনায় গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য বাউল গবেষকদের তুলনায় শক্তিনাথ ঝা অনেক সাহসী ও খোলামেলা। সেইজন্য তাঁর বইয়ে বাউলদের কিছু ক্রিয়াকরণ বা গোপন এবং অন্যকে বলা নিষেধ, তা অত্যন্ত স্পষ্টাক্ষরে লেখা হয়েছে। তবে কি এসব তথ্য তত গোপন নয়? নিশ্চয়ই বাউল সম্প্রদায়ের সদস্যভুক্ত মানুষ এসব গুহ্য বার্তা তাঁকে বলেছেন, নইলে তিনি জানলেন কী করে? এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। সত্তর দশক পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাউল ফকিরদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কথাবার্তায় একটা সীমা বাঁধতে হত— অর্থাৎ এই পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, তার বাইরে আর নয়। কালু ফকির নামে এক তাত্ত্বিক আমাকে স্পষ্টই বলে দিয়েছিলেন, ‘বাইরে থেকে যতদূর জানা সম্ভব তা তোমার জানা হয়ে গেছে। বাকি যা আছে তা তোমাকে নিজে করে জেনে নিতে হবে। তোমাকে তার জন্য আমাদের কাছে বাউলদীক্ষা নিতে হবে। আমরা তোমাকে সব শিখিয়ে দেব। সাধনসঙ্গিনী হিসেবে নিজের স্ত্রীকে নিতে পারো। তাকে দীক্ষিত করে নিতে পারো, না নিলেও চলবে। তবে আমাদের ক্রিয়াকরণে তাঁর যদি আপত্তি থাকে তবে আমরা তোমাকে কায়াসঙ্গিনী দিতে পারি। তাঁর সাহায্যে ক্রিয়াকরণ জেনে নিলে তোমাকে আর পাঁচজনের কাছে ঘুরে বেড়াতে হবে না। বাবা, এ জিনিস মুখে বলে বোঝানো যায় না— আচরণ করে বুঝতে হয়, তার জন্যে গুরু-মুর্শেদ লাগে, সময় লাগে, ধৈর্য লাগে, লেগে থাকতে হয়।’
তবুও লক্ষ করেছি বিশ-পঁচিশ বছর আগে বাউল সাধকরা একটা আড়াল রাখতেন। ‘ওসব খুব নিগূঢ় তত্ত্ব’ বলে এড়িয়ে যেতেন। এখন আর তেমন নেই, বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন তাঁরাই সব কথা খুলে বলতে আর আপত্তি করেন না। অনেকে গড়গড় করে বলে দেন। হঠাৎ এতটা হাওয়া বদল হয়ে গেল কেন? যাঁরা নিজেদের রাখতে চাইতেন আড়ালে, বাক্য ব্যবহারে থাকতেন কৃপণ হয়ে, শহুরে ভদ্রলোকদের তত বিশ্বাস করতেন না, ভয় পেতেন— এই বোধহয় সব রহস্য সবাই জেনে যাবে— তাঁরাই এখন অনর্গলভাষী কেন? একটা কারণ এই যে, বাউলদের সংবৃত বদ্ধ সমাজ এখন ভেঙে পড়েছে, প্রধানত অর্থনৈতিক কারণে। আর একটা কারণ, ভদ্রসমাজের সঙ্গে না হোক গ্রাম সমাজের সাধারণ স্তরে বাউল জীবন এখন তেমন আর ধিক্কৃত বা নিন্দিত নেই, চলছে অবাধ চলাচল। এ ছাড়া গায়ক বাউল সম্প্রদায় এখন রুজিরোজগার কিংবা যশ খ্যাতি প্রতিষ্ঠার তাড়নায় গ্রামসীমা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়েছেন নাগরিক সমাজে। নাগরিক সমাজও ব্যাপক হারে অংশ নিচ্ছে গ্রাম্য মেলা ও পার্বণে, যেখানে বাউল গান তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই গান যাঁরা শুনছেন তাঁরা জানতে চাইছেন তার গূঢ়ার্থ। সভা-সেমিনারে এখন বাউলদের অংশগ্রহণ খুব স্বাভাবিক। সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান, লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর এবং পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র এখন বাউল-পোষণে সক্রিয় উদ্যোগ নিচ্ছে। তা ছাড়া হচ্ছে সাংস্কৃতিক বিনিময়। যেমন কলকাতায় অনুষ্ঠিত লালন-উৎসবে কুষ্টিয়া থেকে আনা হল সেখানকার একদল বাউল। এখান থেকেও তেমনই নিয়ত যাচ্ছেন বাউলরা— অনবরত ভাব ও তত্ত্বের লেনদেন হচ্ছে। জিজ্ঞাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে তাই বাউলদের নিয়ে ডকুমেনটারি ফিল্ম তৈরি করা হচ্ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একবার তাদের ক্যাম্পাসে গাইতে নিয়ে এল কাঙালিনী সুফিয়া বা কালাচাঁদ দরবেশকে। এসবই নানা ধরনের লেনদেন এবং তার ফলে খুলে যাচ্ছে রহস্যের গুণ্ঠন, ভেঙে যাচ্ছে এতদিনকার চেষ্টিত আড়াল। ক্যাসেট সাম্রাজ্যের প্রসার রহস্যনিমীল গানকে করে দিচ্ছে সর্বত্রগামী। বেরোচ্ছে পত্রপত্রিকার বাউল সংখ্যা। বাউল তত্ত্বে বিশেষজ্ঞ গবেষকরা গত দশকে বহুতর লেখা প্রকাশ করছেন দুই বাংলায়। বাউল গানের এমন কয়েকটি সংকলন বেরিয়েছে যাতে শব্দের ভাবার্থ বা সংকেত সংযোজিত হচ্ছে— তার মান বা সত্যতা যতই বিতর্কিত হোক। মোট কথা ক্ষিতিমোহন বা মনসুরউদ্দিনদের কাল আর নেই। বাউল গান এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্চার আওতায় এসে গেছে— হচ্ছে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার বিষয়ভুক্ত। বাউল গানের সুর নিয়ে সংগীতকাররা নতুন নিরীক্ষা করছেন। অবস্থা এমনই বিচিত্র যে, সেদিন এক সাংবাদিক কলকাতা থেকে টেলিফোনে জানতে চাইলেন, ‘হ্যাঁ মশাই, চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে গানটার মানে কি?’ বাধ্য হয়ে জানাতে হল, মানে নিশ্চয়ই একটা আছে কিন্তু সেটা এত সহজে জেনে যাবেন? এমনকী টেলিফোনে? একী কোনও তথ্য না সংবাদ না মন্তব্য? আর তা ছাড়া বললেই যে বুঝবেন তা কী করে জানলেন? টেলিফোনকারী নিশ্চয়ই প্রসন্ন হলেন না কিন্তু বোঝা গেল বাউল গান এখন সর্বজনীন কৌতুহলের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এ-তরঙ্গ রুখবে কে?
