বৈষ্ণবদের দীক্ষা, শিক্ষা এবং ভেকের পৃথক তিনজন গুরু এবং এদের শিক্ষাপ্রণালী স্বতন্ত্র। একজন শিষ্যকে নামমন্ত্র দেয়, অন্যজন দেহতত্ত্ব ও সাধনা শেখায়, অপরজন ‘ভেক’ দেয় এবং তৎসংক্রান্ত আচার-আচরণ শেখায়।… কিন্তু জেলার মুসলমান বাউলদের মন্ত্র, তত্ত্ব ও সাধনা একজনই শেখায়— এ মতে গুরু একজন।
বাউল মত নিতে আগ্রহী কোন নর বা নারী নির্দিষ্ট গুরুর সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিয়মমত গুরু তাদের এক বছর ভক্তদের সঙ্গে মেলামেশা করতে বলেন। তার বাড়িতে যাতায়াত করতে বলেন। চেনা জানার পর কাউকে শিষ্য করাই সমীচীন হলেও বাস্তবে অনেকে তৎক্ষণাৎ বা অবিলম্বে বাছ-বিচার না করেই শিষ্য করে ফেলেন।
বাছবিচার না করে অবিলম্বে বা তৎক্ষণাৎ শিষ্য করে ফেলার কারণ কি? কারণ নিশ্চয় এটাই যে, না হলে অন্য কোনও গুরুর এক্তিয়ারে বা বৃত্তে চলে যাবে শিষ্য। তাতে তাঁর গুরুত্ব কমবে, শিষ্যসংখ্যাও কমে যাবে। এর পিছনে কিছুটা সামাজিক সম্মান ও অর্থনীতি থাকতে পারে। এটা অবশ্য সত্যি যে,
শিষ্যের যোগ্যতা বিচারের কোন অনড় নিয়মবিধি বাউল সমাজে নেই। গোপন দীক্ষা ছাড়াও নানা পদ্ধতির প্রকাশ্য দীক্ষার অনুষ্ঠান বাউলদের মধ্যে চলিত আছে। গুরুর বাড়িতে, নিজের বাড়িতে ছোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ মত গ্রহণ করা হয়। কোন সাধুসভায় এ মত গ্রহণ করা হয়। একাধিকজন যৌথভাবে এ মত গ্রহণ করে। মতটি যুগলে নেওয়া হয় অথবা এককভাবে নেওয়া হয়। নারীর একক মত-গ্রহণ সর্বদা অনাড়ম্বরে বা গোপনে অনুষ্ঠিত হয়।
বৃত্তান্ত থেকে অনেক সংবাদ বেরিয়ে আসছে। মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে বাউলফকিরদের (সংলগ্ন নদিয়াতেও) সংখ্যা খুব বেশি বলে আমার প্রত্যক্ষণ সাক্ষ্য দেয়। যদিও ‘বীরভূমের বাউল’ কথাটি প্রবচনের মতো প্রসিদ্ধ। বাউল মতে দীক্ষা-পদ্ধতির সরলীকরণ প্রমাণ করে মুসলমান বাউলদের ঔদার্য ও বিধিলঙ্ঘনের প্রবণতা। নারীর পক্ষে এককভাবে বাউল মত গ্রহণ বিষয়টি চমকপ্রদ। এরপর শক্তিনাথ লিখছেন:
প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে সমবেত সাধুদের একজন দীক্ষা-প্রার্থীকে জিজ্ঞাসা করে যে সে কার কাছে মত নিতে চায়/ বা কাকে গুরু ধরতে চায়? তার পিতামাতার এতে অনুমতি আছে কিনা? স্বামী/ স্ত্রীর অনুমতি বা মত গ্রহণে সম্মতি আছে কিনা? প্রয়োজনীয় উত্তর পাবার পর এক গ্লাস জল এবং সামান্য চাল আনা হয়। গুরু প্রথমে চাল-জল করেন। গ্লাসে তার উচ্ছিষ্ট জল চালসহ শিষ্য এবং শিষ্যা গ্রহণ করে। অতঃপর গুরুকে বিশেষ ভঙ্গীতে প্রণাম করে। থালায় ৫ পোয়া চাল, ৫টি সুপারী, ৫টি পান, গামছা/ কাপড়/ পাঞ্জাবী এবং পাঁচ সিকে বা তদূর্ধ্ব টাকা দিয়ে গুরুকে অর্পণ করে। সবার সামনে তারা প্রতিজ্ঞা করে যে অক্ষরে অক্ষরে গুরুর কথা মেনে চলবে, গোপনীয়তা রক্ষা করবে।
লক্ষণীয় যে দীক্ষা গ্রহণের পক্ষে প্রয়োজনীয় উপচারগুলি সুলভ ও ক্রয়সীমার মধ্যে। লৌকিক সমাজের খুব সহজ পদ্ধতি অবলম্বিত হচ্ছে এবং অনুষ্ঠানে কোনও পুজোআচ্চা বা শঙ্খ ঘণ্টার নিনাদ নেই। নেই কোনও দেবমূর্তি বা চিত্র। এর মূলে ইসলামি প্রভাব থাকাই সম্ভব, কারণ ইসলাম কোনও প্রতিকৃতি বা দেহগত রূপকল্পনায় বিশ্বাসী নয়। পরবর্তী স্তরে দেখা যায়—
শিষ্য-শিষ্যাকে ঘরের ভেতরে নির্জনে, একেক করে বাঁদিকে বসিয়ে বাম কানে জপের জন্য একটি মন্ত্র দেন গুরু। এই মন্ত্রের তিন বা পাঁচ বা সাত অক্ষর। মন্ত্রগুলি: ‘লাইলাহা ইল্লালা,’ ‘আল্লা হু’, ‘হংস’, ‘হরেকৃষ্ণ’, ‘রাধার স্বামী’। হিন্দু সমাজের শিষ্যশিষ্যাকে হংস, হরেকৃষ্ণ বা পঞ্চনাম— কৃষ্ণ কৃষ্ণ গোবিন্দ রাধে কৃষ্ণ প্রভৃতি দেয়া হয়। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ঐতিহ্যে দেয়া হয়, কামবীজ ও কামগায়ত্রী।
বিবরণ অনুযায়ী মন্ত্রের নানা বিচিত্র চোখে পড়ার মতো। মুসলমান সমাজ থেকে আগত বাউল এবং হিন্দু সমাজ থেকে আগত বাউলের বীজমন্ত্রের পার্থক্য, প্রমাণ করে, অন্তত মুর্শিদাবাদে, যে বাউল সাধনা এক ও ঐক্যবদ্ধ নয়। সেখানে জাতিভেদ আছে। তবে বাউল মতে দীক্ষা নিলে জেগে উঠতে পারে শমতার কোনও বোধ এমন আশা করা স্বাভাবিক। তবে লেখক একটি কথা খোলসা করেননি, দীক্ষাদাতা গুরু মূলত কোন জাতিভুক্ত ছিলেন পূর্বাশ্রমে। যদি ইসলামি পরম্পরায় তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়ে থাকে তবে বৈষ্ণবীয় কামবীজ ও কামগায়ত্রীর প্রতীক-তাৎপর্য তাঁর অধিগত থাকার কথা নয়। মন্ত্রের মধ্যে কিছুটা যে স্ববিরোধ আছে সেটাও স্পষ্ট। ‘লাইলাহা ইল্লালা’ উচ্চারণ ইসলামের কলেমার অন্তর্ভুক্ত, সাম্প্রদায়িক ধর্মবন্ধনমুক্ত ও শাস্ত্রবিরোধী বাউল কেন এমনতর ‘আকিদা’ (বিশ্বাস) নেবে যে আল্লাই একমাত্র উপাস্য?
এসব খুবই বিতর্কিত প্রসঙ্গ এবং বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এখানেও কাজ করছে আমাদের বিমিশ্রণধর্মী মানসপ্রবণতা, বিশেষত লোকায়ত চেতনায়। শাস্ত্রবাক্য সেখানে অমোঘ নয়— হয়তো তাদের কাছে আল্লা শব্দের তাৎপর্য অনেক অন্যরকম। বাউলফকিররা তো শব্দ নিয়ে কত খেলা খেলেন, আমি নিজেই এমন কত শুনেছি। যেমন ‘বিসমিল্লা’-কে তারা হয়তো বলে দিল ‘বিচ মে আল্লা’, তারপরে বলল, বীজ মে আল্লা’, বীজ মানে জন্মবীজ বা বীর্য। তার মানে আল্লা মতান্তরে মূলবস্তু বীর্য। এবারে বলা হল বীর্যই আল্লা এবং তিনি থাকেন দেহে। এমনতর উচ্চারণ মারাত্মক ও অনৈসলামিক বলে নৈষ্ঠিক মুসলমানদের মনে হতে পারে, হয় এবং এমনতর সব বাউল ব্যাখ্যানই তাদের সঙ্গে বিরোধের সূত্র তৈরি করে। বাউলদের শব্দের খেলা যেমন মজার তেমনই সৃজনধর্মী। যেমন ‘হংস’ শব্দকে উল্টে তারা অনেক সময় বলে ‘সহং’ বা ‘সোহং’— আমিই সে। আদম শব্দকে ভেঙে বলে আ + দম, যার মধ্যে ঈশ্বর দম বা শ্বাস রেখেছেন।
