বাউল দীক্ষা ও গুরু নির্দেশিত কায়াবাদী সাধনার প্রত্যক্ষ জবানি এতক্ষণে আমাদের কাছে স্পষ্ট ও সত্য হয়ে উঠেছে। যদিও এর অনুভববেদ্য অংশটুকু, যা প্রধান অংশ, তা উপলব্ধি করা অসম্ভব। তবে এটা বোঝা যায় যে, প্রকৃত বাউল সাধনায় সফলতা আনতে হলে, কায় সংযম পেতে হলে, গুরু নির্দেশের সঙ্গে চারচন্দ্র সাধনও জরুরি। এ-পন্থা ইহবাদী ও বস্তুময়— লোভ, মোহ ও প্রলোভনে পদে পদে স্খলনের আশংকা। একা সাধক বাউল নয়, তার সাধনসঙ্গিনীর নিষ্কাম সহযোগিতা অনেক বেশি আবশ্যিক।
কিন্তু প্রসঙ্গত এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, জীবন গোঁসাই যেমন পদ্ধতিতে কার্তিকদাস আর লতাকে ব্রহ্মচর্য থেকে দেহসংগম পর্যন্ত নিয়ে গেছেন সেটাই কি সব বাউল আখড়ায় গুরুরা অনুসরণ করেন? নাকি এটি নিতান্ত জীবন গোঁসাইয়ের আচরিত একক পদ্ধতি, যা সুনিশ্চিতভাবে তিনি অর্জন করেছেন তাঁর নিজস্ব গুরুর ঘরানা থেকে?
এ ধরনের পর্যালোচনা আর সরেজমিন সমীক্ষা থেকে বিচিত্র সব তথ্য উঠে আসে। প্রথমত, মনে হয়, অঞ্চলভেদে ও সম্প্রদায়ভেদে দীক্ষা ও শিক্ষার নিয়ম কানুন আলাদা। দ্বিতীয়ত, একেক,গুরুর একেক মত। কেউ মনে করেন দীক্ষার আগে একমাস পর্যবেক্ষণ ও গুরুগৃহে থাকা আবশ্যিক, কেউ মনে করেন অবস্থা অনুযায়ী সেটা কম সময়েই হতে পারে। যেমন জীবন গোঁসাই তো তিনদিনের ব্রহ্মচর্যের পরই কার্তিককে দীক্ষা শিক্ষা দিয়ে দিয়েছেন। তার কারণ তাদের দেহগত অভিজ্ঞতা আগে হয়ে গিয়েছিল এবং কার্তিক আগে আরেকটি আখড়ায় বেশ কিছুদিন ছিল— সেখান থেকেই সে লতাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিল। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল জটিল এবং তাদের জরুরিভিত্তিতে সাধনজীবনে আশ্রয় দেওয়া ছিল প্রয়োজন। আসল কথা হল, মানুষের স্থূল দেহমনের আত্মিক সংস্কার না ঘটলে, সে লজ্জা-ঘৃণা-ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে, তাকে দীক্ষিত করা যাবে কী করে? কার্তিকদাস যে অত অনায়াসে মূত্র ও বিষ্ঠা গ্রহণে অভ্যস্ত হল, এত দ্রুত, তার কারণ ব্যাপারটি তার অজানা ছিল না। সে নির্দ্বিধায় গুরুপদাশ্রিত হয়েছিল— কায়মনোবাক্যে। বাউলদীক্ষায় এই নিঃসংশয় শরণ ও আত্মসমর্পণ নিতান্ত স্বাভাবিক ঘটনা এবং গুরুর গুরুত্ব এ-সাধনায় একমাত্র লক্ষণীয়।
শিষ্যের প্রস্তুতি ও মানসিক আকাঙ্ক্ষা এক্ষেত্রে বড় কথা, কারণ দেহকে আশ্রয় করে, আত্মসংযম আর শ্বসনিয়ন্ত্রণের সাহায্যে সে ব্রতী হবে এক বিপজ্জনক চর্যায়। বাউলগানে একে বলে ‘বাঁকা নদীর পিছল ঘাটে স্নান।’ এ-পন্থায় সংযুক্ত হবার আগে তাই জরুরি হল মনঃশিক্ষা। শিষ্যের মনের পাত্রটি উদার ও গ্রহিষ্ণু না হলে গুরু একা কী করবেন? বাউলরা বিশ্বাস করেন ‘সিংহের দুগ্ধ রয়না জেনো স্বর্ণপাত্র বিহনে’ সিংহের দুধ মানে গুরুবাক্য, স্বর্ণপাত্র মানে শিষ্যের মন। শিষ্যের সেই মন প্রথমে থাকে মৃৎপাত্রের মতো ভঙ্গুর বা অপক্ব, গুরু তাকে ক্রমে ক্রমে স্থায়ী ও পক্ব আকার দেন। তখন তা ধারণক্ষম হয়ে ওঠে, একদিনে নয়— দিনে দিনে। এবারে দেহ সাধনার কঠিন সরণিতে শিষ্যকে পদাতিক করে দেন গুরু, তাকে সাহস দেন আবার সাবধানও করেন। কামে থেকে নিষ্কামী হতে প্ররোচিত করেন অথচ বুঝিয়ে দেন সাধনার আনন্দ ও মুক্তির বার্তা। এই মুক্তি বৈরাগ্য সাধনের কঠোর তপশ্চর্যা কিংবা উপবাস ও ভোগহীনতার বিনিময়ে অর্জনীয় নয়। সেইজন্যই পদে পদে সাবধানতা, সতর্কতা ও গোপনতা লাগে।
নিজ সম্প্রদায় ও তার বিশ্বাসের জগতের বাইরে কেউ আকাঙ্ক্ষিত নন বাউলদের গুহ্য গোপ্য জগতে। ডাকা হয় শুধু সাধক ও মরমিদের, যাঁদের তাঁরা বলেন ‘মর্মিকজন’। তাঁদের সাহচর্য ও উপস্থিতি শিষ্যকে উদ্দীপ্ত করে, প্রেরিত করে। সে বোঝে, যে নিঃসঙ্গ গভীর কায়াবিশ্বে সে ভ্রমণশীল হয়ে উপার্জন করবে ‘রত্নধন’, সেই বিশ্বে তার আগে যাঁরা প্রবেশ করেছেন সেই সব মানুষরতনরা তার সামনেই আছেন। তাঁদের জন্য কোথাও হাতড়াতে হয় না। তাঁদের সজীব উপস্থিতি, সাধনসঙ্গিনীসহ, যেন জাগিয়ে তোলে পরম্পরার বোধ।
লোকায়ত সমাজের তো এটাই সবচেয়ে বড় শক্তি ও সংগঠন। সেখানে তৈরি হয় ‘কমিউনিটি’ বা সংহত স্বনির্ভর সমাজবিন্যাস। একক বিচ্ছিন্ন আত্মসর্বস্ব মানুষ, যাদের নির্মাণ করে ‘মেট্রোপলিটন’ মন, এই পরিবেশে তারা অবাঞ্ছিত। ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জন বাউল সমাজের লক্ষ্য নয়, সে অনিকেত ও ভ্রমণশীল। তার সত্য একমাত্র তার পক্ষেই আহরণীয় কিন্তু সে একা নয়— রয়েছে সংবৃত এক গোপ্য সমাজের সমর্থন— দীক্ষার দিনে সেই অলক্ষ সমাজকে সে প্রত্যক্ষ করে। গুরু তার কাছে সেই সমাজসত্যের প্রতীকরূপে দেখা দেন। গুরূপদেশ হয়ে ওঠে বিকল্প এক জীবনসত্যের ফলিত ভাষ্য।
অভিজ্ঞতা থেকে এমন অনুমান হয় যে, অঞ্চলভেদে বাউলদের সাধনদীক্ষার রকমসকম আলাদা। আগে দেখা গেছে, যে বীরভূমের অন্তর্গত পল্লিসমাজে বৈষ্ণবতার এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ আছে, যা বাউল সমাজের কিছুটা অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। দেবীদাসের দীক্ষানুষ্ঠান তো বৈষ্ণবীয় দীক্ষার ঘন সংলগ্ন বলে ভ্রম হয়। এবারে তাই অন্যতর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বা প্রতিতুলনার টানে দেখতে পারি মুর্শিদাবাদের বাউল সমাজকে, যাদের মধ্যে রয়ে গেছে ইসলামি পরম্পরা, বহুদিনের। গবেষক শক্তিনাথ ঝা দীর্ঘকাল মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার মুসলমান অধ্যুষিত গ্রাম সমাজের বাউলদের জানেন চেনেন এবং তাদের দুঃখবেদনা ও সংকটের দিনে ছুটে যান। মৌলবাদীদের সঙ্গে বাউলদের সংঘাত ও বিপন্নতার সংবাদ তিনি পৌঁছে দেন উচ্চবর্গের জাগ্রত বিবেকের কাছে, প্রশাসন ও সংবাদ মাধ্যমের কাছে। অবিরত লেখনীতে উন্মোচন করতে চান নানা সামাজিক অন্তর্ঘাতের স্বরূপ৷ সেইজন্য তাঁর সুদীর্ঘ ও প্রত্যক্ষ গবেষণালব্ধ বই ‘বস্তুবাদী বাউল’, যা প্রধানত মুর্শিদাবাদের আঞ্চলিক বাউল বৃত্তান্ত, আমাদের পক্ষে আকরিক ও নির্ভরযোগ্য মনে হয়। কৌতুহলবশত এবং প্রতিতুলনার কাজে তাঁর বই থেকে বাউল দীক্ষার অন্য এক চেহারা দেখতে পারি। তাঁর বক্তব্য:
