ব্রহ্মচর্য সময়ে আমাকে তিনটি রস পান করতে হয়েছিল। প্রথমটি হচ্ছে প্রস্রাব। যতবার সেটি ত্যাগ করেছি ততবার পরপর তিনদিন সেটিকে আবার নিজের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়েছি। যতবার প্রস্রাব করেছি ততবার একটা নারকেল মালুইয়ের পাত্রে ধরে সেটা খেয়েছি। সকালের বিষ্ঠার প্রথম অংশ খানিকটা তুলে যেতে হবে। বাকিটা থেকে খানিকটা তুলে নিয়ে দু’হাতের তালুতে সেটাকে ফেঁটে যেতে হবে। ফাঁটতে ফাঁটতে এক সময় সে-জিনিস মাখনের মত তেলতেলে হয়ে যাবে। তখন আর কোনো বদ্গন্ধ থাকবে না। এরপর সেটা মুখে বুকে পেটে ভাল করে মালিশ করে ভোর বেলাকার রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আধঘণ্টা পর ভাল করে স্নান করে ধুয়ে ফেলতে হবে। ওই জঙ্গলের ধারে, বালির খালে অনেকটা জল। আমি লাগাতার একমাস গুরুবাক্য পালন করে সেই জলে নেমে স্নান করেছি। সে খালও আর নাই। জলও নাই।
স্নানের পর দমের কাজ। এটাই আসল। এই দমের কাজই দেবে বিদ্যা-বুদ্ধি-বল। দমের কাজ হল গিয়ে শ্বাসের কাজ।… ভিতরকে দিতে হবে বাতাস। রেচক কুম্ভক করে সেই বাতাস বুকে ধরা আর ছাড়া হল দমের কাজ।
কার্তিকের আত্মবিবৃতি থেকে বোঝা সহজ যে, বাউলসাধনার সূচনাপর্বই বেশ কঠিন। বৈষ্ণবদের দীক্ষাপূর্ব স্তর অনেকটা ভাবময়, যা দেখা গেছে দেবীদাস আর পরেশের অভিজ্ঞতার বয়ান থেকে। বাউল সাধনা প্রথম থেকে লজ্জা-ঘৃণা-ভয়কে অতিক্রম করিয় নেয়। ব্যাপারটি ক্রমশ হৃদয়ঙ্গম হয় কার্তিকের পরবর্তী অভিজ্ঞতার বিচিত্র বিবৃতি থেকে—
তো এই দমের কাজের মধ্যে আমাকে এক মহারস আস্বাদন করতে হয়েছিল। সে এক সেঁকো বিষ। কুমারীর প্রথম রজ-রস… গুরু কোথা থেকে জোগাড় করে আমাকে দিয়ে বললেন, ‘খা বেটা’।… হাঁ করে মুখে ঢেলে দিলাম। খাওয়া হল। কোনো স্বাদ নাই, বিস্বাদও নাই। তারপর একসময় ঘুম এলো।… ঘুম নয় যেন যমে ধরল আমাকে। দিনরাত ঘুমে ঢলে আছি আর মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছি একটি অষ্টদল পদ্ম যার মৃণাল চলে গেছে আমার জন্ম ঘরে সেখানে আমি একটি বিন্দু। আমাকে ঘিরে রক্তের ফুল থরে থরে সাজানো।
অদীক্ষিত একজন পল্লিবাসী অর্ধশিক্ষিত সাধকের পক্ষে এমনতর ভাবনিবিড় অবলোক একটু অস্বাভাবিক না লেগে পারে না— অন্তত আমাদের স্বাভাবিক যুক্তিবোধে। তবে গুহ্য চেতনার জগৎ আর যাপন তো আমাদের অভিজ্ঞতায় নেই, তাই তর্ক তোলা সাজে না। অতঃপর—
গুরু একদিন সকালেবেলায় বলে দিলেন, আজ তোর বিন্দু-ধারণ শিক্ষা হবে। সন্ধ্যের পর চলে যাবি অজয়ের বালির চরে। যেদিকে খুশি হটতে থাকবি। একসময় নিশানা পাবি। তখন সেই লক্ষ্য রেখে চলবি। যা এখন ঘরে বসে ধ্যানে থাক।
বৈপরীত্যটুকু বেশ চোখে পড়ে— এর আগে আমরা দুটি দীক্ষা উৎসবের বিবৃতি দেখেছি। তাতে নানা উপকরণ, পূজা, মন্ত্র, গুরুগিরি, গুরুপ্রণামী, মহাজনদের ছবি, ভোজন, কীর্তন, ফুল ফল সুগন্ধি কতকিছুর সমারোহ। নববস্ত্র, নগরভিক্ষা, কণ্ঠিবদল, চন্দনলেপন— আয়োজন ও সমারোহের যেন শেষ নেই। সে তুলনায় কার্তিকলাস আর তার বাউল গুরু জীবন গোঁসাই একেবারে অনাড়ম্বর ও অন্তর্মুখী। সরাসরি কায়াসাধনার কঠিন পন্থায় শিষ্যকে বৃত করতে গুরু তৎপর। বাউল সাধনা সব রকম কৃত্রিম ভজনপূজনকে এড়াতে চায়, দেবদেবীবিগ্রহকে অস্বীকার করে এবং সাধককে ঠেলে দেয় সাধনার গভীরে নির্জন পথে অনিকেত করে। কার্তিকের অভিজ্ঞতা শোনা যাক। গুরুর নির্দেশে সন্ধ্যার পর অজয়ের বালি চড়ায় নিঃসঙ্গ পরিক্রমায় তার কানে এল যেন দোতারার ঝংকার। সেই সুরের নিশানা ধরে এগোতে এগোতে অসাড় চৈতন্যে হঠাৎ একসময়ে আবিষ্কার করল গুরুকে। আর—
তাঁর কাছে লতা বসে। গুরু বললেন, ‘বোস’।
সে গুরুর কাছে বসতে গেল। তিনি বাধা দিয়ে বললেন, ‘আমার কাছে না, তোর সাধন-সঙ্গিনীর কাছে গিয়ে বোস।’
‘এবারে মন পেতে শোন্, যে কর্মে লিপ্ত হতে যাচ্ছিস তার পরিণাম ভয়ঙ্কর। তবু সাধক সেই ভয়ঙ্কর থেকেই পরমানন্দ প্রেম সংগ্রহ করে। মালকোঠায় ধন আগলে রাখে। আর এভাবেই রমণীর মন রক্ষা করে। বিন্দুধারণই সেই প্রেমসাধনা। আজ তা দুজনকে শেখাব।… নারী হচ্ছে আনন্দ সহচরী। সে এক মহামায়া। তিনিই সৃষ্টি ও স্থিতির জননী। আবার লয় বিলয়ের মহাশক্তিরূপিনী। সেই নারীর সঙ্গে লীলা সহজ কথা নয় বাবা। না বুঝে তার সঙ্গ করলে সমূলে নাশ হয়ে যাবি। তাই সাবধানে, ধীরে ধীরে, সুস্থিরে। যখনই বুঝবি উত্তেজনা তোকে গ্রাস করছে। কুম্ভক করবি। দম ধরে পিতৃধন রক্ষা করবি।’
এরপরে একটা দেহতত্ত্বের গান দোতারা বাজিয়ে শোনালেন গুরু জীবন গোঁসাই। গানটা কতবার শুনেছে সে কিন্তু অন্তর্গত তত্ত্বকথা বোঝেনি। গুরু গান শেষে বোঝাতে লাগলেন,
‘বোঝ্, ভালো করে বোঝ্, গানে রয়েছে গভীর জলে অষ্টদল পদ্মের কথা। সেই পদ্মের আটটি পাঁপড়ি প্রথমে জিভ দিয়ে অনুভব করবি। বুঝবি, সেই পদ্মের মৃণাল পেরিয়ে ফুল ঘিরে ফল জমাট বাঁধে। সেখানেই মানুষ বিরাজ করে। নারীসঙ্গ কালে এই ধ্যানটি সবসময় মাথার ভিতর ঢুকিয়ে রাখবি।’
কার্তিক দাস এই বলে শেষ করে তার বিবৃতি যে,
গুরু কৃপায় আমরা সেই বালিচরের উপর খুলে ফেললাম আমাদের গায়ের যত পোষাকের ছাল। লতা, যার সঙ্গে আমার দেহ সম্পর্ক আগে হয়েছে, এ যেন সে নয়। সে এক মোহ, প্রেম। আমি তার চুল, কপাল, ঠোঁট… তার মনোহর শরীরের সব জায়গা চুমাতে ভরিয়ে চললাম। তারপর গুরুনির্দেশিত প্রক্রিয়ায় আরম্ভ হল আমাদের কাজ। আমরা দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। সেই যেমন গানে আছে— ‘দেখে এলাম মর্তে/ একটি গর্তে/ দুই সাপের জড়াজড়ি’ সেই রকম। সে জিনিস বোঝানো যাবে না। করে দেখতে হবে। জীবনে তাকে পেতে হবে। সে জিনিসকে অনুভব করতে হবে। ভাবের জগতে বুঝতে হবে। ধ্যানে থাকতে হবে…
