‘আজ আমি প্রজাপতি ঋষির নামে তোমাদের দুজনের মালাচন্দন করে দিচ্ছি। সাক্ষ্য রইলেন ছত্রিশকোটি দেবতা, জলস্থল আকাশ বাতাস আর আসরের মানুষেরা।’
এখানে যেটা বিস্ময়কর তা হল সামঞ্জস্যবোধ। বৈষ্ণব বিবাহ অনুষ্ঠানে সংস্কৃত মন্ত্র, প্রজাপতি ঋষির প্রসঙ্গ আর ছত্রিশকোটি দেবতাকে স্মরণ একরকম উদার সমন্বয়বাদের বোধ জাগিয়ে তুলছে না কি?
বাটির থেকে বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে চন্দন তুলে তিনি অনুরাধার কপালে টিপ পরালেন, ‘এখন রাধারানির কপালে আমি চন্দনের টিপ দিলাম। সে হল আমার বৈষ্ণবী। আমার সেবাদাসী।’ একটু থেমে তিনি অনুরাধাকে বললেন, ‘কই, হ্যাঁ বল।’… ‘তুমি কি জানো না রাধারানি, শিষ্য যা কিছু পাবে তার সমস্তই গুরুর প্রসাদী। গুরু আগে ভোগ করবেন। তা দেখে শিষ্য মত হয়ে থাকবে। তারপর প্রসাদ পাবে। কি, বৈষ্ণবী হয়ে এসব কথা জানো তো?’
অনুরাধা চুপ করে থাকল।
‘না জানলে, বাবা পরমানন্দ তুমিও জেনে নাও গুরু হচ্ছেন ব্রহ্মা। গুরু কৃষ্ণ। তাই প্রথমে এই বৈষ্ণবীটি হবেন কৃষ্ণসঙ্গিনী।… এবার তুমি মেয়ে, বল।’
অনুরাধা রহস্য হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল, ‘আমি আপনার বৈষ্ণবী হলাম গুরুদেব।’
গুরুপ্রসাদী কথাটার নানা কদর্থ আমরা আগে শুনেছি বা বইয়ে পড়েছি। কিন্তু বনমালীপুরের এই মালাচন্দনের অনুষ্ঠান রীতিমতো সুন্দর ও মহিমময়— নিগূঢ় তাৎপর্যপূর্ণ। এবারে বিবাহ কৃত্যের শেষপর্বের শুরু।
রাধাকান্ত গোঁসাই ডান হাতের তর্জনীর আগাটি ছুঁইয়ে অনুরাধার কপাল থেকে ভিজে চন্দন নিয়ে পরেশের কপালে টিপ এঁকে দিতে দিতে বললেন, ‘রাধারানির কপাল থেকে নিয়ে তোমার কপালে দিলাম বাবা পরমানন্দ। এখন থেকে ও বৈষ্ণবী তোমার হল।’ দু’ছড়া আকন্দ মালা দু’জনের গলায় পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘উঠে দাঁড়াও। নিজের নিজের মালা বদল কর।’
এরপরে সমবেত নারীকুলের শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি, পাঠক, এসব কল্পনা করতে পারবেন। গুরুর সক্রিয় ব্যবস্থাপনায় চাদরের আবরণের আড়ালে হল যুগলের শুভদৃষ্টি। গুরুদেব ঘোষণা করলেন,
‘এবার রাধাকৃষ্ণের মিলনলীলা।’ পরেশকে একটু ঠেলে সরিয়ে যেটা কিনা অনুষ্ঠানগত একটা কৃত্যমাত্র এমন ভঙ্গিতে তিনি অনুরাধার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে দুহাতে জাপটে ধরে বুকে টানলেন। গভীর আলিঙ্গনে অনুরাধার মুখের উপর নামালেন চুল-দাড়ির অতি প্রবীণ বয়স্ক মুখখানি। দাঁতশূন্য দুই মাড়ির ঠোঁট নামালেন অনুরাধার দুই ঠোঁটের নিচে চিবুকে। একটা শান্ত দীর্ঘ চুম্বনের পর অনুরাধাকে ছেড়ে দিলেন গুরুগোঁসাই।
নিজের আসনে সরে এসে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘এই আসরে উপস্থিত মানুষ-রতনদের সামনে তোমরা দুজনে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে পরস্পরের মুখচুম্বন কর।’ তিনি হেসে তাকালেন পরেশের দিকে, ‘বাবা পরমানন্দ, এ বৈষ্ণবী তোমার। এ তোমার নারীরত্ন। মনে রেখো, গুরুপ্রসাদে একে তুমি পেয়েছ। আমার এই রাধারানি আজ থেকে তোমার সাধনসঙ্গিনী হল বাবা। সে তোমার সাধনপথের গুরু। তাকে সেইভাবে দেখবে। সেইভাবে ভালবাসবে। তখন বুঝবে বাবা, সর্বজীবে প্রেম কী করে হয়, কাকে বলে।’
তারপরে গুরুর আদেশে পরেশ আর অনুরাধা একটি যেন মিথুনমূর্তি। সকলের উকিঝুঁকির মধ্যে পরেশ অনুরাধাকে গভীর চুম্বন করল। কিন্তু গুরুগোঁসাই জানেন সময় পরিমাণ। তাঁর ছোট ছোট হাততালির শব্দে তিনি ওদের মগ্নতা ভেঙে দিলেন। ওরা বিচ্ছিন্ন হল।
মানস রায় বর্ণিত দেবীদাসের বাউলদীক্ষার চেয়ে অনুপমের বর্ণনায় বৈষ্ণবীয় সহজিয়া মতের দীক্ষা অনেক প্রাঞ্জল ও স্পষ্টরেখ। গুরু-শিষ্যের ভূমিকা, গুরুর সঙ্গে শিষ্যের সাধনসঙ্গিনীর সম্পর্ক— এ সবই কৌতুহলোদ্দীপক আর মরমি বিন্যাসে গাঁথা। দুটি বর্ণনা থেকে এমনও মনে হতে পারে বুঝিবা দুই সম্প্রদায়ে কৃত্যগত বেশকিছু মিলও আছে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার যে দেবীদাসের দীক্ষা পুরোপুরি বাউল-ঘরানার নয়। কেন নয়, সেকথা স্পষ্ট করতে এবারে কার্তিকদাস বাউল-কথিত বিবরণ উপস্থিত করব। বীরভূমের এক গ্রামের কার্তিকদাস আর লতা দুজন দুজনকে ভালবেসেছিল। নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তারা আশ্রয় পেল জীবন গোঁসাইয়ের কাছে। এবারে কার্তিকের জবানিতে—
তিনি আমাদের দুজনকে আশ্রয় দিলেন। আমি তাঁর কাছে শিক্ষা পেয়েছি। লতা হয়েছিল আমার সাধনসঙ্গিনী।
সে শিক্ষার কথা কি বলব… প্রথমে ক’দিন আমাদের ব্রহ্মচর্য পালন। এমনকি দেখাসাক্ষাৎ বারণ দুজনের। আমি থাকি আশ্রমের একদিকের ঘরে আর লতা থাকে ভেতরে আরো ক’জন বৈষ্ণবীর সাথে। এ বড় কঠিন সাধনা… একে বলে পেয়ে-হারানো। কাছে আছে কিন্তু দেখা হবার নয়। বিন্দুধারণ শিক্ষা বাউল-সাধনার মূল শিক্ষা।
আমি বাউল ঘরে জন্মি নাই তাই বাউল বংশের আসল ভাবটি, রূপটি আমার পাওয়া হয় নাই। যাকে বলে সহজ পাওয়া, বংশধারায় পাওয়া। বাউলের ছেলে কি রকম বাউল হয় আমি তো তা জানি না। পূর্ণদাসের কথা ভাবো, তার বাবা নবনীদাস কত বড় বাউল। তাই সাধক বাউলের যদি ছেলে না হবে তবে দেশে আসল বাউল জন্মাবে কি করে?
কার্তিক দাস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। বিন্দুধারণ আর ঊর্ধ্বরেতা হয়ে, বাউল সাধনা যদি জন্মনিরোধ করে অটল মানুষকে শুধু চায়, তবে খাঁটি বাউল জন্মাবে কী করে? দীন হীন ভজনসাধনবিমুক্ত সাধারণ ব্যক্তি যখন বাউল হয় তখন তো তার উচ্চ পরম্পরা, তার ভাব ও রূপ থাকতে পারে না। সাধক বাউলের সন্তান সাধনজীবনে কিংবা গানের জীবনে অনেকটাই এগিয়ে থাকে স্বভাবজ কারণে। কার্তিকদাসের সে-পরম্পরা ছিল না, তার ছিল শ্রমজীবী জীবনের অভিজ্ঞতা। বাউল জীবন তার কাছে অপূর্বকল্পিত, একেবারে তরতাজা এক অন্য জগৎ। তার বাচনে—
