তামার কোষায় ভিজছে একটি খেজুর পাতা। তিনি সেটি তুলে, আসনে বসে থেকেই পরেশের ঘাড় টেনে মাথা কাত করে প্রথমে ডান কানের লতিতে পরে বাঁ কানের সেই জায়গায় পাতার ছুঁচলো শক্ত আগাটা সামান্য জোরে ফুটিয়ে তুলে নিলেন।
‘বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণের জন্য তোমার দেহগত সংস্কার হল বাবা। এবার’—
রাধাকান্ত গোঁসাই বাটা চন্দনের সাথে খানিকটা গঙ্গামাটি মিশিয়ে অতি যত্নে পরেশের কপালে, নাকে, কানের লতিতে, দুই বাহুর উপর, বুকে এঁকে দিলেন তিলকচিহ্ন। পুজোর সামগ্রীর পাত্র থেকে তুলে নিলেন দু’গাছি তুলসী কাঠের মালা। পরেশের গলায় পরিয়ে দুই প্রান্তের খোলা সুতোয় গিট বেঁধে দিলেন।
‘এখন গুরুর কাছে বৈষ্ণব-মন্ত্র নেবার যোগ্য তুমি হলে বাবা। এখন থেকে তোমার নাম হল পরেশদাস বৈষ্ণব। আর সাধনপথে যখন যাবে তখন তোমার নামটি পরমানন্দ দাস বৈষ্ণব। এবার তুমি আমাকে যাষ্টাঙ্গে প্রণাম কর।’
‘কল্যাণ হোক কল্যাণ হোক’ শিষ্যের দু’হাত ধরে তুলে তাকে বুকে জড়ালেন। চুমু খেলেন কপালে। তারপর তাকে ছেড়ে দু’হাতের বিচিত্র সব মুদ্রা অনেকক্ষণ পরেশের সামনে করার শেষে বললেন, ‘এ হল ব্রহ্মচর্য মুদ্রা বাবা পরমানন্দ।’
… ‘তুই পরমানন্দ, কাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত অনেক পল অনুপল ব্রহ্মচর্য পালন করে ব্রহ্মচারী হলি।… এখন তোকে মন্ত্র দেব। আসনে বোস।’ সামনা সামনি বসে পরেশের মাথাটি নিজের খোলা বুকে লাগিয়ে তার ডান কানে খুব ফিসফিসিয়ে কৃষ্ণ নামের একটা উচ্চারণ করলেন। মুখ সরিয়ে বললেন, ‘এ মন্ত্র তোর একার। খুব গোপনের। সব সময় একে জপ করবি। একে বলে বীজমন্ত্র।’
তারপর তিনি পরেশের দুই গালে দাড়ি ঘষে আবার সেই মন্ত্রটি একই গোপনতায় উচ্চারণ করে তার কানের লতিতে ভাঙা দাঁতের দুই মাড়ির চাপ দিয়ে কামড়ালেন, ‘মনে রাখিস! কখনও ভুলিস না।’ এবারে পরম স্নেহে পরম প্রেমে পরেশের দুই গালে দুটি নিবিড় চুমু খেলেন। পরেশ গড়িয়ে পড়ল গুরুর চরণে কাঁচা মাটির মূর্তির মত, অথবা নতুন প্রবাহের কোনো স্রোতের মত।
অনুপম দত্তর অনুভূতিময় বর্ণনে ও জাদুভাষায় যেন প্রত্যক্ষ শরীরী হয়ে উঠেছে সমগ্র পরিবেশ ও ব্যক্তি। বৈষ্ণবীয় দীক্ষাগ্রহণের এমন বিস্তারিত বিবরণ বড় একটা পাওয়া যায় না পুথিপত্রে। এ বর্ণনার অভিনবত্ব ও গভীর আবেদন মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, লেখক আখ্যানের কাঠামোয় ভরে দিয়েছেন নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও সংবেদন। স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত একজন জীবিকাধারী মানুষ যখন বৈষ্ণবীয় স্রোতোধারায় নিজেকে স্বেচ্ছায় মিলিয়ে দিয়েছেন তখন তাঁর রূপান্তরিত নবজন্ম বিস্ময়কর নয় কি? এক বিশ্বাস থেকে আরেক বিশ্বাসে, এক ধরনের যাপন থেকে সম্পূর্ণ অন্য এক যাপনের মধ্যে তিনি যাচ্ছেন। কিন্তু অনুষ্ঠান এখনও শেষ হয়নি। রোমাঞ্চিত বিহল হতচকিত মৃঘূর্তির মতো অবলুষ্ঠিত শিষ্যকে এবারে গুরু রাধাকান্ত গোঁসাই তুলে ধরে তার হাতে দিলেন বৈষ্ণবের ভিক্ষার ঝুলি। বললেন,
‘এতে আছে দুটি পথের কড়ি।’ তিনি বের করলেন, ‘আর এই দেখ,’ কড়ি রেখে উদ্দিষ্টটি বের করে তুলে ধরে বললেন, ‘চিরঞ্জীবী শিয়াল শিঙ্গি।’ তিনি ওটিকে ধূপশিখার কাছে আনলেন তারপর সিঁদুর চন্দন মাখিয়ে বললেন, ‘বাবা, এটি জ্যান্ত। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা এর ধূপসেবা চন্দনসেবা চাই। তাহলে এর থেকে উঠবে মৃগনাভির গন্ধ।’ রেখে দিলেন ঝুলিতে, ‘আর এখানে আছে দেবী কামিখ্যের রজঃসিক্ত বস্ত্র। বাবা, তোমার এ জীবনে আজ থেকে এগুলিই হল শেষ সম্বল। নাও, ঝুলি ধর। নগর ভিক্ষায় যাও।’
সে জানে না কোন্ নগর? কতদূর তার পথ?
‘যাও পরমানন্দ’ গোঁসাইজি বললেন, ‘প্রথম ভিক্ষা রাধারানির কাছ থেকে আনবে।’
দীক্ষা ঘরে ফিরে পরেশ দেখল তার আসনের পাশে আরেকটি কম্বলের আসন।
গুরু বললেন, ‘এস বাবা, নগর ভিক্ষা হল?’
‘গুরুদেব, আমি শুধু অনুরাধার কাছে ভিক্ষা চেয়েছি।’
‘নারীই নগর বাবা! নগরের সব ঐশ্বর্য ধনে যে ধনী। তুমি নারীর কাছে ভিক্ষা চেয়েছ। মাতৃজাতির কাছে ভিক্ষা চেয়েছ। এতে বাবা, নারীকে মাতৃজ্ঞানে সাধনার কাজটি তুমি করলে। এবার ভিক্ষের ধন আমার হাতে দিয়ে বস তোমার আসনে।’
এই বিবরণের মধ্যে ভাষাবিন্যাস ও সংলাপের আন্তরিকতা লক্ষণীয়, সেই সঙ্গে বৈষ্ণবীয় মাধুকরীর বৃত্তান্ত খুব মধুর। বৈষ্ণব সাধনায় এই মাধুর্যরসই প্রধান। ভিক্ষাগ্রহণ ব্যাপারটিও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় চমকপ্রদ। নারী সম্পর্কে দৃষ্টিকোণ অতীব গভীরতাস্পর্শী। বোঝা যায় লোকায়ত জীবনের মরমি রহস্যময়তা ও বাচনসৌন্দর্য। ওদিকে কিন্তু অনুষ্ঠান এগোচ্ছে। এরপরে রাঙা চেলি পরিয়ে অনুরাধাকে আনা হবে। পরেশ ও অনুরাধা পাশাপাশি দুই আসনে। সামনে গুরু রাধাকান্ত। তাঁর কণ্ঠে সংস্কৃতি মন্ত্র, নারীরা বাজাচ্ছেন শঙ্খ, সঙ্গে হুলুধ্বনি। গুরু বললেন,
‘এই ঘরে বেদীটি, আমার গুরু ভগবান মনোমোহন দাস বৈষ্ণবের সমাধি। আর যত ঠাকুর দেবতার ছবি, তাঁদের পাশে যারা মানুষ ছিলেন, ঠাকুর হয়েছেন তাদের সকলের সামনে আমি শ্রীরাধাকান্ত গোস্বামী, বনমালীপুরের আশ্রমের সেবাইত তোমাদের একটি নর আর নারীর প্রেম মিলনের জন্যে মালা-চন্দনের অনুষ্ঠান করছি। সবাই একবার গৌর গৌর বলুন, বাবারা।’
