কিন্তু কারণ দেখে সংশয় জাগে রামানন্দের দ্বারা দীক্ষিত শিষ্যরা কি বাউল পন্থার না বৈষ্ণব পন্থার লোকায়তিক পর্যায়ের সদস্য? নাকি এরা এক বিমিশ্র পদ্ধতির উপজাত? কেননা পরবর্তী তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে দেবীদাস বাউল চারচন্দ্রের সাধনা শিখছেন ও অভ্যাস করছেন তাঁর গুরুর নির্দেশে। তাতেই অবশ্য প্রমাণ হয় না যে দেবীদাস ‘বাউল’ পর্যায়ের লোক, যেহেতু সহজিয়া বৈষ্ণবরাও অনেকে চারচন্দ্র সাধনা করে থাকে। আসল কথা হল, বঙ্গ সংস্কৃতির একটা সাধারণ স্বরূপ দেখা যায় মিশ্রণধর্মিতা— বহুরকম মত ও পথের। লোকায়ত গৌণধর্মে এমনতর বিমিশ্রণ অনেক বেশি— সদা সর্বদা সেখানে চলেছে গ্রহণবর্জন। ব্যাপারটা আরেকটু তলিয়ে বোঝবার জন্য এবার আমরা আর এক রকম বৈষ্ণবীয় দীক্ষার বিবরণ উপস্থাপন করব। অনুপম দত্তর রচনা, আখ্যানধর্মী, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অনুপম আমাকে জানিয়েছেন একটি চিঠিতে যে, এ-বিবরণ তাঁর আত্মজৈবনিক। অনুপম দত্ত প্রবীণ ব্যক্তি, থাকেন বীরভূমের দুররাজপুরে। ১৪ জুন ২০০০ দিনাঙ্কের চিঠিতে আমাকে তিনি লিখেছেন :
বৈষ্ণবীয় দীক্ষার যে বিবরণ সম্পর্কে আপনি শুধিয়েছেন তা ব্যক্তিগত জীবন ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বলতে গেলে, একটা প্রচণ্ড সময়ে আমাকে বৈষ্ণব ধর্মের কাছেই যেতে হয়েছিল। তারপরে আরো কোথাও। তথাকথিত সমাজ ধর্ম আমার পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিতে চেয়েছিল। সেই সময় আমার গুরুদেব— সিউড়ির কাছে ‘ঝোরা মাঠ’ আশ্রমে, বর্তমানে বাতাসে মিশে যাওয়া গুরুদেব নিরঞ্জন গোঁসাই আমাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন আর আমাদের মালাচন্দন ঘটিয়ে ছিলেন। তিনি আমার বর্তমান সহচরী।… তো বৈষ্ণব ধর্ম নিয়ে পায়ের তলার মাটি খুঁজব কিন্তু গুরু হবার নামে বৈষ্ণব এলেন। তারা বিধানক্রমে মাথান্যাড়া, কৌপিন খেঁচা, ঝুলি কাঁধে নগর ভিক্ষা এবং এর জন্য সময় লাগবে বৎসর খানেক তবে আমার বিচার হবে দীক্ষা যোগ্যতার। হয়তো জানতে পেরেছিলেন গুরুদেব। তিনি কিভাবে যে টেনে নিলেন তাঁর আশ্রমে। বললেন, ‘বাবা নিয়ম, হ্যাঁ, নিয়ম ঠিক আছে। তবে হয়, করলেই হয়। আসিস তোরা অমুখ তারিখে। হয়ে যাবে।’ তাঁর আশ্রম, উঠান ভরে ভক্ত বৈষ্ণবদের সমাধি, আর তাঁর ঘরে… পড়েছেন তো?
অনুপমের লেখা আখ্যানের মধ্যে থেকে এখানে শুধু দীক্ষা গ্রহণের অনুষ্ঠানটুকু আমরা ছেঁকে নেব। স্থান বীরভূমের এক গ্রামের বৈষ্ণবীয় আখড়া। গুরু রাধাকান্ত গোঁসাই, দীক্ষার্থী শিয্যের নাম পরেশ, তার সঙ্গিনীর নাম অনুরাধা।
গুরুর নির্দেশে পরেশ একটা ফর্দ লিখল অনুষ্ঠানের উপকরণ নিয়ে। প্রথমেই লেখা হল সিদ্ধি দশ গ্রাম, গাঁজা একভরি। তারপরে আট রকমের ফুল আর ফল। দুশো গ্রাম ধূপধুনো, দু’প্যাকেট ধূপকাঠি। এক টাকার আসলি চন্দনগুঁড়ো ও একটি রক্তচন্দনের বাঁট, একশিশি গঙ্গাজল, একশিশি অগুরু, একশিশি মধু, এক টাকার কপূর, দেড়শো গ্রাম খাঁটি গব্য ঘৃত, তুলসী কাঠের মালা দু’গাছা। একজোড়া কোরা ধুতি। একটা উত্তরীয়। ল্যাঙ্গট একজোড়া। পাঁচ হাত বহরের গামছা একজোড়া। একটি লালপাড় সাদা শাড়ি আর একটি জাম রঙের রেশমি শাড়ি, যার পাড় আর আঁচলায় সোনালি নকশা। তার সঙ্গে মানানো ব্লাউজ, সায়া ও অন্তর্বাস। দশকর্মা আর কাপড়ের দোকান থেকে এসব সংগৃহীত হল।
এ ছাড়া কেনা হল বাজার থেকে তরিতরকারি। একজন ভক্ত টাকা বার করে বললেন, ‘এই হরেন, ছুটে যা তো মাছ নিয়ে আয় দু’কেজি।’ কথায় বলে বৈরাগী হতে গেলে মাছ লাগে। একটা মহোৎসবের আয়োজনে বেরিয়ে পড়েছে আশ্রমের অনেকদিন অব্যবহারে থাকা হাতা হাঁড়ি গামলা কড়াই। কাজের শব্দে আর ব্যস্ততায় আশ্রমের এলাকা সজীব হয়ে উঠেছে।
পাঠক, অনুপম দত্ত-র বর্ণনার অনুপুঙ্খ আর মানস রায়ের প্রতিবেদনে ফারাকটা ধরতে পারছেন নিশ্চয়। এবারে দীক্ষা পর্বের বৃত্তান্ত :
একটা কম্বলের আসনে পরেশ বসে রয়েছে অন্য এক বেশে। গায়ে জড়ানো রয়েছে হালকা সাদা সুতির চাদর। কোরা ধুতিটির তলায় যে ল্যাঙ্গট সেটা বেঁধে দিতে সাহায্য করেছে গোঁসাইজি।
ঘরটি, যদিও দিনের বেলাতেও আবছা আলো স্পষ্টই চোখে পড়ে দেয়ালের একদিক ঘেঁষে সিমেন্ট বাঁধানো বড় বেদী। তার উপর ফ্রেমে বাঁধানো নানা দেবদেবীর স্বর্গীয় মূর্তি। উপরের দেয়ালে পুরনো একটা ছবি— নীল মেঘের ভিতরে নৃত্যপর শ্রীগৌরাঙ্গদেব। অন্য দেয়ালগুলোতে যেখানে সেখানে লালকালির বড় বড় হরফে ‘হরে কৃষ্ণ’ মন্ত্র লেখা। একগুচ্ছ ধূপকাঠির পুড়তে থাকা গন্ধ আর ধোঁয়ারেখা। প্রাচীন পিলসুজের উপর ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলতে থাকা শিখা স্থির।
শিশি থেকে জল নিয়ে পরেশের মাথায় ও দরজার বাইরে বসে থাকা একজন দর্শকের উপর ছুঁড়ে দিলেন রাধাকান্ত গোঁসাই।… উৎসুক মানুষেরা বিড়ি টানছে, গাঁজার কক্কেতে দম দিচ্ছে। সামনের রাখা পুজোর টুকিটাকি জিনিসের মধ্যে থেকে একটি ছোট কঁচি তুলে নিলেন গোঁসাইজি। বললেন, ‘শাস্ত্র মতে মস্তক মুণ্ডন। কই দেখি মাথাটা একটু ঝুকিয়ে আনেনা তো।’ তার ব্রহ্মতালুর উপরের একগাছা চুল কেটে সেটাতে রাখলেন ডানপাশের বেদীর নিচে। বললেন, ‘বাবা, তোমার টিকির চুল কেটে এখানে রাখলাম। এটি আমার গুরু গোঁসাইয়ের সমাধি। তিনি এর ভিতরে শুয়ে আছেন। তোমার মন তোমার চেতনা এখানে বাঁধা থাকল। শাস্ত্রবিধি মতে এটাই। তোমার মস্তক মুণ্ডন হল বাবা। এরপর কর্ণছেদন।’
