এই অনুষ্ঠানের পর থেকে দেবীকুমার চট্টোপাধ্যায় হয়ে গেলেন দেবীদাস বাউল। গুরুর সম্প্রদায়, পরিবার ও গোত্রের অন্তর্গত হয়ে গেলেন তিনি। তাঁর হল ‘মধ্বাচার্য’ সম্প্রদায়, ‘নিত্যানন্দ’ পরিবার ও ‘অচ্যুতানন্দ’ গোত্র।
আমাদের মনে এবারে খটকা লাগে এই ভেবে যে, দেবীদাস বাউল হলেন না জাত-বৈষ্ণব মতে দীক্ষিত হলেন? বাউলদের তো গোত্র পরিবার বা সম্প্রদায়গত পরিচয় থাকে না। তারা মুক্ত ও অনিকেত। কোনও গোষ্ঠী বা সমাজভুক্ত নয় তারা। কিন্তু দেবীদাস তো বাঁধা পড়লেন এক সম্প্রদায়ী বন্ধনে। তা ছাড়া তুলসীপাতা, গঙ্গাজল, গোময় ও পঞ্চপ্রভুর অর্চনা— এসব বাউল সাধনায় কেন? তার অর্থ, দেবীদাস বাউলপন্থার মানুষ নন, যেমন নন লক্ষ্মণদাস বা পূর্ণদাস বা নবনীদাস। তাঁরা বাউলগান করেন কিন্তু তাঁদের আচরণ ও গোত্র হল জাত-বৈষ্ণবদের। এবার সাহস করে বলে ফেলা যাক, বীরভূমের বেশির ভাগ বাউল আসলে অচ্যুতানন্দ গোত্রের জাত-বৈষ্ণব। ক্ষিতিমোহন কি এঁদের মতো ব্যক্তিদের দেখে ‘আধা বৈষ্ণব আধা বাউল’ কথাটি প্রয়োগ করেছিলেন?
কিন্তু দেবীদাসের বৃত্তান্ত এখনও শেষ হয়নি। মন্ত্রদীক্ষার পর তাঁর লাভ করার কথা ‘শিক্ষাদীক্ষা’। তার জন্য গুরুর নির্দেশে বেশ কিছু ক্রিয়াকর্তব্য পালন করতে হয়। দেবীদাস বলছেন :
আমি গুরুর নির্দেশিকা অন্তরের সঙ্গে পালন করতে লাগলাম। যেমন, আশ্রম পরিষ্কার করা, গুরু-গুরুমা ও আশ্রমবাসীদের জন্য ভিক্ষা করা, গুরু আর গুরুমার পরিধেয় বস্ত্র এবং ব্যবহৃত বাসনকোসন পরিষ্কার করা। এর বাইরে আমি প্রতি বৃহস্পতিবার গুরু ও গুরুমাকে পূজার্চনা করতাম। এছাড়া প্রতিদিন সায়ংসন্ধ্যায় গুরুদেবের সামনে বসে শুনতাম তাঁর বাণী, তাঁর বলা দর্শন আর বাউলতত্ত্ব, বাউলের করণকারণ— যা থেকে হওয়া যায় একজন আদর্শ বাউল। শিখতাম বাউলের দেহতত্ত্ব সাধনার প্রসঙ্গ, গুহ্য ও গোপ্য নানা কথা। ঘুরতাম আশ্রম থেকে আশ্রমে, মেলা থেকে মেলায়— যেখানে দেখা মিলত কত রকম বাউল সাধকের। শুনতাম তাঁদের বাণী ও অভিজ্ঞতার কথা। প্রতিদিন অভ্যাস করতাম গুরুদেবের কাছে শেখা প্রাণায়াম। এভাবেই কেটে গেল একটি মাস। এবারে আমার অপেক্ষা শুরু হল শিক্ষাদীক্ষা লাভের জন্য।
মানস রায় লিখেছেন, মন্ত্রদীক্ষার একমাস পরেই গুরু রামানন্দ দেবীদাসকে দেন শিক্ষা। এ-পর্যায়ে লাগে নারীসঙ্গী, তাই গুরু তাঁর মেয়ে ললিতাকে বেছে নিলেন দেবীদাসের সাধনসঙ্গিনী হবার জন্য। শিক্ষাদীক্ষার আচার-অনুষ্ঠান প্রায় মন্ত্রদীক্ষার মতোই— প্রভুদের মালসাভোগ নিবেদনের পর দেবীদাস ও ললিতা পরস্পর তুলসীমালা বিনিময় করে আনুষ্ঠানিকভাবে হলেন পতি-পত্নী। এ অনুষ্ঠানের নাম ‘কণ্ঠিবদল’। দেবীদাসের কণ্ঠিবদল অনুষ্ঠান হল গুরু রামানন্দের উপস্থিতিতে এবং পাঁচজন বিশিষ্ট সাধকের সান্নিধ্যে। শিক্ষাদীক্ষা অনুষ্ঠানের তিনদিন পরে দেবীদাস আর ললিতাকে ডাকা হল গুরুর কাছে হাতে কলমে যৌন-যৌগিক গুহ্য সাধনা শেখবার জন্য। গুরু তাঁর নিজের সাধনসঙ্গিনীর সহায়তায় নবদম্পতিকে শিখিয়ে দিলেন যৌন সংযমের করণকৌশল, দমের কাজ আর দেহসংযমের কঠিন পথ পরিক্রমার রহস্য।
গুরুর নির্দেশিত পথে কঠিন সাধনায় শিষ্য অর্জন করে ‘সাধক’ স্তর। কিন্তু তার জন্য তাকে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। একজন গুরু যত বেশি সাধক তৈরি করতে পারেন তত তাঁর মান্যতা বাড়ে। রামানন্দ গোঁসাই বলেছেন :
শিষ্য যখন সাধক-স্তরে পৌঁছতে চায় তখন তাকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য। গুরু ও সাধকের সামনে শিষ্যকে প্রমাণ দিতে হয় তার দেহগত সংযম ও আত্মশক্তির। শিষ্যর যেদিন পরীক্ষা হয় সেদিন গুরু ডেকে আনেন তাঁর গুরুভাইদের এবং আঞ্চলিক কয়েকজন বিখ্যাত সাধক ও তাঁদের সাধনসঙ্গিনীদের— এ যেন ‘প্র্যাকটিকাল’ পরীক্ষা নিতে আসা ‘এক্সপার্ট’-দের মতো। গুরুর ঠিক করা দিনক্ষণ অনুযায়ী পরীক্ষা শুরু হয়।
প্রথমে গুরুর আদেশে শিষ্য আর তার সাধনসঙ্গিনী রাত্রিবেলা ঢোকে এক বদ্ধ ঘরে। সাধক ও সাধনসঙ্গিনীরা ঘরের বাইরে বারান্দায় বসে একটানা ভক্তি সংগীত ও কীর্তন গেয়ে চলেন যতক্ষণ চলে সাধনা। আকাশে তারার চলন দেখে তাঁরা সময় নির্ণয় করেন। এইভাবে যখন আঠারো দণ্ড নিশা কেটে যায় (তার মানে ৭ ঘণ্টা ১২ মিনিট) তখন একজন অভিজ্ঞা বর্ষিয়সী সাধনসঙ্গিনী ঘরে প্রবেশ করেন এবং শিষ্যের সাধনসঙ্গিনীর যোনি পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হলে তিনি ঘোষণা করেন যে শিষ্যের বীর্যচিহ্ন নেই স্ত্রীঅঙ্গে, অর্থাৎ এই দীর্ঘ সংগমে শিষ্য ঊর্দ্ধরেতা অবস্থায় থাকতে পেরেছে। তাকে এবারে সাধক শিরোপা দেওয়া যেতে পারে।
এমন পদ্ধতিতে সাধক পদমর্যাদা লাভ সহজ নয় তা বলা বাহুল্য। উদাহরণত দেখা যাচ্ছে দাসকলগ্রামের এই রামানন্দ গোঁসাইয়ের মোট শিষ্য সংখ্যা পনেরোজন— তার মধ্যে মাত্র একজন শিষ্য, চিন্ময় দাস, এই সুদুর্লভ সাধকের সম্মান লাভ করেছেন। উল্লেখ্য যে, গ্রামদেশে সকলেই সাধক হবার বাসনার গুরুর কাছে আসেনা। মদীক্ষা নিয়ে শিষ্য হওয়াই তাদের প্রাথমিক ও একমাত্র লক্ষ্য। যেমন দেখা যাচ্ছে, মানস রায়ের সমীক্ষা অনুযায়ী ময়ূরেশ্বরের রাধাশ্যাম দাস, গড়গড়িয়ার বাসুদেব দাস, মল্লারপুরের শান্তিরাম দাস ও বল্লভপুরের বাঁকাশ্যাম দাস দীক্ষা নিতে এসেছিলেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার আশ্রয় পেতে। এদের মধ্যে মল্লারপুরের শান্তিরাম দাস পূর্বাশ্রমে ছিল একজন আসামি। ১৯৭৮ সালে ডাকাতির অপরাধে তার জেল হয়। সেখান থেকে জামিন পেয়ে বাউল মতে দীক্ষা নেয় সামাজিক নিরাপত্তার আশায়। মানস রায় তাঁর সরেজমিন অনুসন্ধানে অন্যতর তথ্যও পেয়েছেন। লক্ষ করা গেছে এ পথে অনেকে আসে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার লোভে, টাকাপয়সার জন্য নয়। অনেকে বিত্তশালী। যেমন কালনার কৃষ্ণদাস বা বাউতিজোরের দীনবন্ধু দাস— এদের প্রচুর জমিজমা আছে, তবু দীক্ষা নিয়েছেন কারণ গান বাজনা ভালবাসেন, ইচ্ছা ওই ব্যাপারে কিছু নামযশ হোক। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণসন্তান থেকে শুরু করে কায়স্থ, সদগোপ বা গন্ধবণিকের মতো মধ্যবর্ণের মানুষ এবং অস্পৃশ্য জাতের বাগদি, হাড়ি, মুচি ও ডোমেদের ঘরের ছেলে দীক্ষিত হচ্ছে বাউলমতে।
