প্রবর্ত অবস্থাতেই অনেকের সাধনজীবন কেটে যায়, তার বেশি এগোতে পারে না। এই অগ্রগতি আড়াআড়ি নয়, খাড়াখাড়ি অর্থাৎ ঊর্ধ্বগ। মনকে অচঞ্চল, সংহত ও ঊর্ধ্বগামী করতে পারে যদি শিষ্য, তখন গুরু তাকে উপযুক্ত মনে করলে সাধনপথে শিক্ষা দেন। মন্ত্রদীক্ষার পরে হয় রূপের দীক্ষা, যাতে সাধিকা দরকার। কারণ বাউল সাধনা দেহনির্ভর, কাম থেকে প্রেমে উত্তরণের লক্ষ্যভেদী, শ্বসনিয়ন্ত্রণের যৌন-যৌগিক ক্রিয়ার সফলতার উপর বিন্যস্ত। দেহসাধনা ও শ্বসনিয়ন্ত্রণের দ্বারা সাধকের অপব্ধ দেহ পকতা পায়। এর জন্য পদে পদে লাগে গুরুনির্দেশ, তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এবং অভিভাবকত্ব। সাধক সাধারণত তার সাধনসঙ্গিনীর সঙ্গে দেহচর্যা করে। কখনও কখনও গুরুই বেছে দেন শিষ্যের সঙ্গিনী। সাধনা ধৈর্য ও সংযমসাপেক্ষ। অনেকে পারে না, তাদের ঘটে ‘যোনিতে পতন’। কিন্তু যারা পারে তাদের আনুষ্ঠানিক দীক্ষা দেন গুরু এবং বলে দেন :
আপন সাধন কথা না কহিও যথাতথা
আপনার আপনিরে তুমি হইও সাবধান।
একেই বাউলরা বলেন ‘আপ্ত সাবধান’— নিজের বাকসংযম। অথচ লোকমধ্যে লোকাচারের নির্দেশ থাকে অর্থাৎ সাধারণ মেলামেশায়, সামাজিক ওঠাবসায়, বাউল থাকে প্রচ্ছন্ন হয়ে কিন্তু ওপর ওপর সকলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। বিনয় বচনে ও সদাচারে তার জুড়ি মেলে না। গুরুকে ও গুরুপত্নীকে সে পিতৃমাতৃজ্ঞানে মান্য করে। গুরুভাইদের আপন বলে মানে। গুরুর ভুক্ত অন্ন শ্রদ্ধাসহকারে খায়। নিজের জীবনকে সে সমর্পণ করে গুরুর পাদপদ্মে। তার হয় নবজীবন। পূর্বাশ্রমের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না আর। নামটাও যায় পালটে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সম্পদ বলে তার কিছু থাকে না। ভিক্ষাবৃত্তি করে, ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে, কৌপীন সম্বল জীবন এবারে অনিকেত হয়ে যায়। গুরুর দেওয়া ইষ্ট মন্ত্র হয় তার অবলম্বন।
এত সব তত্ত্বকথা না আউড়ে একটি বাউল দীক্ষার প্রতিবেদন পেশ করা অনেক বাস্তবসম্মত হবে। এ প্রতিবেদন পাওয়া গেছে সমাজ-নৃতত্ত্ববিদ মানস রায়ের লেখা ‘The Bauls of Birbhum’ (১৯৯৪) বই থেকে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত কালপর্বে মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন বীরভূমের নানা গ্রামে এবং সন্ধান করেছেন বাউলদের। এঁর বই থেকে পাওয়া প্রত্যক্ষ বিবরণ (দেবীদাস বাউলকথিত) এখানে তুলে ধরছি বাংলা অনুবাদে।
দেবীদাস বাউল পূর্বাশ্রমে ছিলেন ব্রাহ্মণ সন্তান। বীরভূম জেলার অন্তর্গত সাঁইথিয়ায় থাকতেন তিনি পিতামাতার সঙ্গে। তাঁর পিতামহ ছিলেন বৃত্তিতে পুরোহিত— পিতা ছিলেন জ্যোতিষী ও হোমিওপ্যাথ। আট ভাইবোনের মধ্যে দেবীদাস সর্বকনিষ্ঠ। দিদিদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, বড়দি মারা গেছেন। চার দাদার মধ্যে একজন সাঁইথিয়ায় স্কুলশিক্ষক, মেজদা রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদে আর সেজদা রাজ্য পুলিশে কাজ করেন। কনিষ্ঠ দেবীকুমার চট্টোপাধ্যায় (এখন দেবীদাস বাউল) কাজ করতেন এক কারখানায়। ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে তিনি ছাঁটাই হন। অন্য কাজ চেষ্টা করেও জোটেনি— এসে যায় গভীর হতাশা। তবে তিনি গান গাইতে ও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন ভাল। বাউলদের গান আর জীবনযাপনের বৈচিত্র্য তাকে টানত। তাই বাউলদের সঙ্গে বিভিন্ন মেলা আর আশ্রমে আখড়ায় ঘুরতে ভাল লাগত। এইভাবে তার দেখা হল রামানন্দ গোঁসাইয়ের সঙ্গে, তাঁর দাসকলগ্রামের আশ্রমে। তাঁর কাছে মন্ত্রদীক্ষা নেবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন দেবীকুমার, তক্ষুনি ইচ্ছাপূরণ হল না। রামানন্দের আশ্রমে অন্যান্য বাউলদের সঙ্গে মাসখানেক থেকে গেলেন। তারপরে গুরু তাঁকে দীক্ষা দিলেন— মন্ত্রদীক্ষা।
এবারে মন্ত্রদীক্ষার অনুষ্ঠান কেমন হল তা শশানা যাক শিষ্যের জবানিতে :
মন্ত্রদীক্ষা অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ গুরু রামানন্দ গোসাই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য তাঁর মন্ত্রশিষ্যদের ও গুরুভাইদের এক তালিকা করেছিলেন। আমাকেও পূর্বাহ্নে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন অনুষ্ঠানের উপকরণ জোগাড় করে রাখতে। সেগুলি হল : চিঁড়া, গুড়, দুধ, দই, ঘি, ছানা, লুচি, মিষ্টি, পাঁচরকম ফল (লালরং বাদে), পাঁচরকম ফুল (লালরং বাদে), তুলসীপাতা, একটি গামছা, একঘড়া গঙ্গাজল ও সাতখানি মেটে মালসা।
তিনদিনেই আমি এসব জোগাড় করে ফেললাম। তারপরে দীক্ষার দিন ভোরে স্নান করে আমি সাদা নতুন কাপড় পরলাম। যে ঘরে দীক্ষানুষ্ঠান হবে তার মেঝে নিকিয়ে নিলাম গোবর দিয়ে। এসব কাজ দীক্ষার্থীরই করার কথা। মূল অনুষ্ঠানে যে মচ্ছবভোগ বিতরণ হবে তার প্রস্তুতিতে অবশ্য আখড়ার কেউ কেউ সাহায্য করলেন আমাকে। আমি মালসাভোগ বানালাম চিড়ে, গুড়, দুধ, দই আর ঘি দিয়ে। তা রাখা হল পাঁচটা মাটির পাত্রে মানে মালসায়, সোজা সরলরেখায়। এগুলি উৎসর্গ করা হল গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, গদাধর ও শ্রীবাস এই পাঁচ মহাপ্রভুর নামে। পবিত্র তুলসীপাতা, সুগন্ধি, পবিত্র গঙ্গাজল, পাঁচরকম ফুল আর ফল রাখা হল সাজিয়ে। ঐ ঘরে কেউই ঢুকতে পারবেন না। কিন্তু বাইরের দাওয়ায় নিমন্ত্রিতরা অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কীর্তন গাইতে লাগলেন। অনুষ্ঠানের সূচনায় গুরুদেব সাতটি মালসায় একটা করে তুলসী পাতা দিয়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিলেন তাতে, তারপর আমার মাথায় আর নিজের মাথায়। তারপরে তুলসী পাতায় চন্দন নিয়ে লাগিয়ে দিলেন আমার মাথায় কপালে, কষ্ঠে, বুকে, উদরে। এবারে প্রথমে গুরুদেব তাঁর নিজের গুরুর উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করলেন পাঁচ মহাপ্রভুকে আলাদা আলাদা করে, স্বতন্ত্র মন্ত্র উচ্চারণে। তারপরে তিনি মালসাভোগ নিবেদন করলেন প্রথমে আত্মগুরু এবং পরে পঞ্চ প্রভুকে। অবশেষে তিনি আমাকে বীজমন্ত্র দিলেন এবং নামকরণ করলেন ‘দেবীদাস’। অনুষ্ঠান শেষ হল আমন্ত্রিত ব্যক্তি ও আশ্রমিকদের মহাপ্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে। এবারে মচ্ছব শুরু হয়ে গেল।
