আউল বাউল কর্তাভজা নেড়া দরবেশ সাঁই।
সহজিয়া সখীভাবুকী স্মার্ট জাত গোঁসাই ॥
অতিবড়ী চূড়াধারী গৌরাঙ্গনাগরী।
তোতা কহে এই তেরোর সঙ্গ না করি ॥
তেরোটি গৌণসম্প্রদায়ের মধ্যে আউল-বাউল-দরবেশ-সাঁই এমন কায়াবাদী সাধনার পাশে সহজিয়া আর জাত-বৈষ্ণবদের (যা বৈষ্ণবতার উপজাত) প্রতি অনাস্থা লক্ষণীয়। পরে এই সব উপসম্প্রদায় ক্রমে সংখ্যায় ও আচরণবাদের বৈচিত্র্যে বেড়ে গেছে। নৈষ্ঠিক বৈষ্ণবদের ধিক্কার তাদের প্রতিহত করতে পারেননি। তোতারাম আবারও খেদোক্তি করেছেন:
পূর্বকালে তেরো ছিল অপসম্প্রদায়।
তিন তেরো বাড়ল এবে ধর্ম রাখা দায় ॥
তিন তেরো উনচল্লিশটি অপসম্প্রদায়ের চাপে মূল গৌড়ীয় বৈষ্ণব শাখা বিপন্ন হয়েছিল এতে সন্দেহ নেই। ‘বৈষ্ণব ব্রতদিন নির্ণয়’ বইতে আরও অনেক গৌণধর্মীদের তালিকা আছে।
আমরা সেই বিস্তারে না গিয়েও মূল সত্যে পৌঁছতে পারি। সেটা এই যে, ব্রাহ্মণ্যলক্ষ্য মৌল বৈষ্ণবদের ধিক্কার ও সক্রিয় বাধা সত্ত্বেও বাংলার সমাজবিন্যাসে গৌণধর্মবিশ্বাসের ও করণকারণের রবরবা দেখা দিল। গুরু-শিষ্য, পির-মুর্শিদ, বাবাজি, আখড়াধারী, গৃহী— নানাস্তরে নানাভাবে চুইয়ে পড়তে লাগল চৈতন্যের সাম্যমন্ত্র। সমান্তরাল কাঠামোয় গড়ে উঠল গুরুবাদ ও ধনসম্পদ। সেই শক্তি থেকে স্বতন্ত্র শাস্ত্র, বিশ্বাস ও মন্ত্রতন্ত্র গড়ে উঠল। জেগে উঠল গান— দেহতত্ত্বের ও মনঃশিক্ষার, গুরুবন্দনা ও দৈন্যবোধের। পতিতা, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তাদের আশ্রয় জুটে গেল আখড়ায়— তাঁরা মান পেলেন। কায়াসাধনের সূত্রে বিকৃতি ও যৌন-স্বাধীনতার পথও কিছুটা অবারিত হল।
এইখানে একটা ভুল ধারণার অবসান ঘটানো দরকার। জাত-বৈষ্ণব বা সহজিয়া বৈষ্ণবদের সকলেই যে নিম্নবর্ণজাত বা অন্ত্যজ তা নয়। হয়তো তারা একটা গরিষ্ঠ অংশ কিন্তু ব্রাহ্মণ কায়স্থ নবশাখ বেনে আর মাহিষ্য সম্প্রদায় এদের মধ্যে অনেক ছিল। সহজিয়াদের ছিল নানা ধরনের সাধন-পদ্ধতি (কাটোয়া-স্রোত, পাটুলি-স্রোত, রূপ কবিরাজী ইত্যাদি) ও গুহ্যাচার— কেউ কেউ দুইচাঁদ বা চারচাঁদের করণ করতেন। তাই তাদের সঙ্গে বাউলদের কিছু কিছু ব্যাপারে মিল ছিল। জাত-বৈষ্ণবদের একটা অংশ ছিল ভক্তিমান গৃহস্থ আরেক অংশ আখড়াকেন্দ্রিক বাবাজি-সেবাদাসী সম্প্রদায়।
অজিত দাস তাঁর বইতে জাতবৈষ্ণব সমাজের সংখ্যাবৃদ্ধির ব্যাপকতার একটি হিসাব দিয়েছেন। ১৮৭৯ সালে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে জাত-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সদস্য মেদিনীপুরে ছিল ৯৬,১৭৪ জন, বর্ধমানে ২৬,০০০ এবং হুগলিতে ১২,১০৭ জন। ১৮৮১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট বলছে, সারা বাংলায় জাত-বৈষ্ণব ছিল, ৫,৬৮,০৫২। এই সংখ্যা নিষ্ঠাবান বৈষ্ণবদের পক্ষে চিন্তা ও উদ্বেগজনক। তাঁদের গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গিতে জাত-বৈষ্ণবরা বিকৃত হলেন। বিপিনচন্দ্র পাল বলেছেন, জাত-বৈষ্ণবরা সমাজবহির্ভূত। নৈষ্ঠিকরা মনে করতেন ১) ওরা ব্রাহ্মণদের কাছে অস্পৃশ্য। ২) ব্রাহ্মণ্যবাদ নির্দেশিত আচার মানে না। ৩) বিয়ে হয় মালাচন্দনে। ৪) বিবাহের অনুষ্ঠান এত সরল যে বৈধ মনে হয় না। ৫) ওদের মধ্যে বিবাহ ছাড়া সঙ্গম স্বাভাবিক ও বৈধ। ৬) ফলত ওরা জারজ এবং ৭) পরিণামে জাতবৈষ্ণবরা এক ভিক্ষুক সম্প্রদায়। সমাজে অধঃপতিত ও নিন্দাযোগ্য।
রমাকান্ত চক্রবর্তী তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই শুধু নৈষ্ঠিকরা জাত-বৈষ্ণবদের বিরোধিতা করেননি। তাঁর মতে,
গোঁড়ামির কারণেই জাত বৈষ্ণবদের ওপর খাপ্পা হয়নি ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব সমাজ। নিজেদের গোঁড়ামির জন্য তারা সকলকে শিষ্য করতে না পারায় আর্থিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। জনসংখ্যা বাড়ছিল শহরে এবং সাধারণ ব্যবসায়ী আর সাধারণ মানুষের হাতে পয়সা আসছে, তাদের শিষ্য করতে না পারায় গুরু প্রণামীর আয় হচ্ছে না। সেটা বাবাজীরা গেয়ে যাচ্ছে। তাই উচ্চবর্ণের গুরুরা তাঁদের ধনী শিষ্যদের বাবাজীদের হাত থেকে রক্ষা করতে অপপ্রচার করতে বাধ্য হতেন যে বাবাজী আর নিম্নবর্ণের বৈষ্ণবরা অস্পৃশ্য।
সেই কুৎসা ও অনুশাসনে যখন কাজ হল না, তখন বিধান জারি করলেন,
ব্রাহ্মণগুরু দিয়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে দীক্ষা নিতে হবে। অথবা উচ্চবর্ণের (অব্রাহ্মণ) ভেকধারী গৌড়ীয় বৈষ্ণব দিয়ে দীক্ষা নিতে হবে। অথবা উচ্চবর্ণের গৌড়ীয় বৈষ্ণব গৃহীগুরু হলেও হবে। জাতবৈষ্ণবরা নিম্নবর্ণ বা অস্পৃশ্য সমাজ থেকে আগত। ওরা গৌড়ীয় বৈষ্ণব নয়।
জাত-বৈষ্ণব গুরু আর সহজিয়া স্রোতের গুরুরা এ নির্দেশ মানবেন কেন? কাজেই অচিরে বাংলাব্যাপী গ্রাম্য জনসমাজ দলে দলে দীক্ষিত হতে থাকল গৌণধর্মে। তার মধ্যে একটা হল বাউলপন্থা, যাদের মধ্যে সহজ বৈষ্ণবপস্থা অলক্ষ নয়।
একটা চালু কথা গৌণ সম্প্রদায়ীদের সঙ্গে মিশলে জানা যায়, সেটা হল, এ-জাতীয় গুহ্য সাধনার চারটি স্তর : প্রবর্ত-সাধক-সিদ্ধ-সিদ্ধের সিদ্ধ। শিষ্য যখন গুরুর কাছে লোকায়ত সাধনার মানসে দীক্ষা নিতে আসে তখন বেশ কিছুকাল, ধরা যাক বছর খানিক, গুরু তাকে বলেন আখড়ায় আসাযাওয়া করতে, বাহ্য ক্রিয়াকরণের ব্যাপার-স্যাপার দেখতে, অন্যান্য গুরুভাইদের বাড়ি যেতে এবং সম্প্রদায়ের মেলা মহোৎসব, গুরুর জন্মদিন বা দিবসী উৎসবে যোগ দিতে। এ প্রসঙ্গে শিষ্যর নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও আগ্রহ গুরু লক্ষ করেন। শিষ্যর স্বভাবনম্রতা, সেবাপরায়ণতা বা অনুরাগ নানা ঘটনায় প্রমাণিত হলে গুরু পরিতুষ্ট হন এবং তখন তিনি শিষ্যকে মন্ত্রদীক্ষা দেন আনুষ্ঠানিকভাবে। সেই সঙ্গে একটি নির্দেশ থাকে, এ-সাধনায় লজ্জা ঘৃণা ভয় তিনটিই ত্যাগ করতে হবে। কথাটার তাৎপর্য অনেকটাই গভীর, অর্থাৎ এতদিনকার যাপিত জীবন ও সমাজবোধের বিপরীত মার্গে এবার যেতে হবে শিষ্যকে। তার জন্য মানস-প্রস্তুতি চাই। বিদ্যমান সমাজের মূল্যবোধ থেকে বাউল জীবনের মূল্যবোধ, আচরণ, খাদ্যাভ্যাস ও সমাজ হবে স্বভাবত স্বতন্ত্র। তার ভবিষ্যৎ জীবন যতটা নিন্দিত হবে ততটা নন্দিত হবে না। সে হয়তো নিঃসঙ্গ হবে না কিন্তু তার এক বিচিত্র সমাজের অভিজ্ঞতা হবে, যে-সমাজ সংগুপ্ত ও আবদ্ধ, গুরুকেন্দ্রিক এবং অন্তর্মুখী।
