এদিকে চৈতন্যদেবের বাংলা ত্যাগের পর এবং পরে তাঁর অপ্রকটকালে বৃন্দাবনে গড়ে উঠছিল একটি বৈষ্ণবকেন্দ্র— তার সংগঠনে ছিলেন ছ’জন নৈষ্ঠিক বৈষ্ণব, তাঁদের বলা হয় ষড়গোস্বামী। এঁদের নাম রূপ ও সনাতন, তাদের ভাইপো জীব গোস্বামী, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ ভট্ট ও রঘুনাথ দাস। এঁদের মধ্যে রঘুনাথ দাস বাদে বাকি পাঁচজন ব্রাহ্মণ ও সংস্কৃত পণ্ডিত এবং পাঁচজনেই মূলে দক্ষিণ ভারতীয়। পাঁচজনের মধ্যে রূপ ও সনাতন ছিলেন গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের মন্ত্রী—উচ্চবর্গের আমলা। এঁরা দুজন এবং ভাইপো জীব গোস্বামী গৌড় থেকে বৃন্দাবন চলে গিয়ে কোনওদিন আর ফেরেননি৷ গোপাল ও রঘুনাথ ভট্ট কোনওদিন গৌড়বঙ্গের মুখই দেখেননি। অথচ চৈতন্য-তিরোধানের পর এঁদের ওপর বৃন্দাবনকেন্দ্রিক বৈষ্ণব আন্দোলনের নেতৃত্ব এসে পড়ে। বাংলার জনমানস ও সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল বৃন্দাবনী তথা উচ্চ ব্রাহ্মণ্য ভাবাদর্শ। গোপাল ভট্ট ব্রাহ্মণ্য ভাবাদর্শে লিখলেন বৈষ্ণবদের আচরণীয় স্মৃতিশাস্ত্র— যার নাম ‘হরিভক্তিবিলাস’।
বৃন্দাবনের বৈষ্ণবীয় অনুশাসন গৌড় বাংলার মূল বৈষ্ণব আদর্শের মুখকে একেবারে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল। আচণ্ডালকে উদার ধর্মপরিবেশে ও মানবস্বীকৃতিতে আহ্বান করতে চেয়েছিলেন চৈতন্যদেব, ভাঙতে চেয়েছিলেন শাস্ত্র ও ব্রাহ্মণদের একাধিপত্য, করেছিলেন জাতিবর্ণ নির্বিশেষে পতিতদের উদ্ধার। ‘হরিভক্তিবিলাস’ সেই বৈষ্ণবীয়তাকে করে দিল শুদ্ধতাবাদী, ব্রাহ্মণ্যমুখী ও বর্ণাশ্রমী। তাঁদের নির্দেশ ছিল : ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব সবাইকে দীক্ষা দেবে, অব্রাহ্মণের থাকবে না দীক্ষাদানের অধিকার। অনুলোম প্রথা চলবে অর্থাৎ সামাজিক স্থিতাবস্থা— যে যেখানে ছিল সে সেখানেই থাকবে।
অদ্বৈত-নিত্যানন্দ-শ্রীবাস-গদাধর জাতীয় প্রত্যক্ষ চৈতন্য সঙ্গকারীরা কেউই বৃন্দাবনের সঙ্গে সংস্রব রাখতেন না। কিন্তু তাঁদের পরের প্রজন্মের অনেকে বৃন্দাবনের গোস্বামীদের কাছে নীতি-নির্দেশ নিতে থাকলেন এবং বৃন্দাবন হয়ে উঠল প্রধান বৈষ্ণবীয় কেন্দ্র। বৃন্দাবনে যেতেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন— নিত্যানন্দের পত্নী জাহ্নবাদেবী, শ্রীনিবাস আচার্য, শ্যামানন্দ, নরোত্তম দত্ত, উদ্ধারণ দত্ত, রামচন্দ্র, গৌরীদাস পণ্ডিত, পরমেশ্বর দাস, গোবিন্দদাস কবিরাজ, রামচন্দ্র কবিরাজ। তবু এটা বুঝতে খুব অসুবিধে নেই যে, কেন্দ্রীয় নির্দেশ সকলের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে না। সপ্তদশ শতকে বাংলার বৈষ্ণবরা নানাভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। সেই ভাগ হবার কারণ দুটি। এক, উপাসনা এখানে কেউ করতেন সখাভাবে, কেউ দাস্যভাবে, কেউ রাধাভাবে— ‘হরিভক্তিবিলাস’ নির্দেশ দিল একমাত্র সখীর সখী মঞ্জরিভাবে উপাসনার— সেটি সকলের মনঃপূত হয়নি। দুই, যে-কোনও জাতিবর্ণের বৈষ্ণব ছিলেন দীক্ষাদানের অধিকারী, সে অধিকার খর্ব হল— তাও মনঃপূত হবার কথা নয়। এইখানে অর্থনৈতিক প্রশ্ন ছিল— যার সঙ্গে জড়িত গুরুবাদ। কথাটি বুঝিয়ে বলেছেন, ‘জাতবৈষ্ণব কথা’ বইয়ে অজিত দাস, এইভাবে :
অর্থনৈতিক কারণে দল-উপদল তৈরির প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল বিশেষভাবে। বৈষ্ণব-আন্দোলন হোম-যজ্ঞ-পুজো-পুরোহিত প্রথা বাতিল করেছিল। কিন্তু তার স্থলে প্রবর্তিত হল গুরুবাদ। গুরু ছাড়া দীক্ষা নেই, মুক্তি নেই। ঘরে বসে হাতে তালি দিয়ে নামগান করলেই মুক্তি মিলবে না আর। পথপ্রদর্শক গুরু চাই। গুরু ঈশ্বরতুল্য। পুরোহিতের দক্ষিণা দেওয়ার মতো গুরুকে প্রণামী দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। নইলে গুরুই বা জীবনধারণ করবেন কীভাবে? শিষ্যের বাড়িতে জন্ম-মৃত্যু-বিবাহের অনুষ্ঠানের সময় গুরুবরণ গুরুপ্রণামী বাঁধা। শিষ্যের সামর্থ্যানুযায়ী গুরুপ্রণামী। সেটা পাঁচ সিকা থেকে একটি জমিদারি অবধি হতে পারে প্রাপ্তি।
তাহলে যিনি যত শিষ্য করতে পারবেন, তাঁর তত আর্থিক নিশ্চয়তা বাড়বে, সাংসারিক দুর্ভাবনা কমবে। প্রধান গুরুর অধীনে সহকারী গুরুর হিসাবে কাজ করলে মূল গুরুকে প্রণামীর সিংহভাগ দিতে হয়। স্বাধীন স্বতন্ত্রভাবে গুরুগিরি করতে পারলে আর কাউকে ভাগ দিতে হয় না। তাই দল ভেঙে উপদল। এক থেকে বহু।
বোঝা গেল গুরুবাদ ও অর্থনীতি বৈষ্ণবদের বিভাজনে একটা বড় সূত্র তবে নিশ্চয়ই প্রধান নয়। অশ্য সপ্তদশ শতকে নানা মতে বিভক্ত, নানা গৌণ সম্প্রদায়ী আচরণে বিশ্বাসী বহুতর বৈষ্ণব রাজশাহীর খেতুরিতে সমবেত হয়ে যে-মহোৎসব করে সেখানে ব্রাহ্মণেতরদের দ্বারা দীক্ষাদানের তথা গুরুগিরির প্রশ্ন ওঠে এবং খানিকটা মীমাংসাও হয়। পরে কেউ কেউ স্বাধীনভাবে সম্প্রদায় ও তার আচরণবিধি গড়ে তোলে। সে সময়ে বৃহৎ ছিল গৌড়বঙ্গ, সারাদেশে ভৌগোলিক যোগাযোগ ছিল দুর্বল। আখড়াধারী বাবাজি সম্প্রদায় আর গৃহী বৈষ্ণবদের মধ্যে ধর্মাচারের নানা ধরন গড়ে উঠতে থাকল। কত যে উপসম্প্রদায় (নৈষ্ঠিক বৈষ্ণবদের ভাষায় ‘অপসম্প্রদায়’, ‘পাষণ্ড’) ও সহজিয়া স্রোত বইতে লাগল সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের নানা সময়ে তার হদিশ এখন পাওয়া কঠিন। দক্ষিণী ব্রাহ্মণ তোতারাম ছিলেন বিষ্ণু উপাসক, অষ্টাদশ শতকে থাকতেন নবদ্বীপে। বৈষ্ণবদের শাখাপ্রশাখার শ্রীবৃদ্ধি দেখে ব্যথিত হয়ে তোলারাম বলেছিলেন :
