শুদ্ধ প্রেম সাধলে যদি কাম-রতিকে রাখলে কোথা?
আগে উদয় কামের রতি
রস-আগমন তারি সাথী
সেই রসে হয়ে স্থিতি
খেলছে মানুষ দেখগে তোরা।
দেহকে নিয়ে দেহোত্তীর্ণ হওয়া, যাকে কেউ কেউ বলে ‘জ্যান্তে মরা’, বাউলের পরম অন্বিষ্ট।
তাই বলে এমন ভাবাও ঠিক নয় যে বাউল আর বৈষ্ণবে মুখ দেখাদেখি নেই বা সর্বদা লেগে আছে বিবাদ বিসংবাদ। আসলে লোকধর্মের মধ্যে সবসময়ে চলে পারস্পরিক দেওয়া নেওয়া—সমালোচনা আবার স্বীকরণ। একটু আগে যে ‘বাউল আর বৈষ্ণব এক নহে তো ভাই’ পদটি আমরা দেখলাম সেখানে বৈষ্ণব বলতে নৈষ্ঠিক বৈষ্ণবদের বোঝানো হয়েছে। সেই নৈষ্ঠিক ধর্ম ভেঙে আরও কত রকম লৌকিক বৈষ্ণবমত গড়ে উঠেছে তার হিসেব রাখা কি সহজ? তবে লোকায়ত বৈষ্ণবদের প্রধান দুই ধারা— সহজিয়া বৈষ্ণব আর জাত-বৈষ্ণব। এর বাইরে আছে রাধাশ্যামী, রূপকবিরাজী, চরণদাসী, হরিবোলা, গুরুদাসী, খণ্ডিত বৈষ্ণব, করণ বৈষ্ণব, বৈষ্ণব তপস্বী, কিশোরীভজনী, টহলিয়া বা নমো বৈষ্ণব ও চামার বৈষ্ণব। এরা সব গৌণ ধর্মী এবং নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে সংগঠিত। বাইরে থেকে তফাত বোঝার উপায় নেই— কেবল ক্রিয়াকরণে পৃথক এরা। বাউল দুদ্দু শাহ-র ধারণা—
নদের গোরা চৈতন্য যারে কয়
সে শাক্ত ভারতীর কাছে শক্তি মন্ত্র লয়।
এ হল একটা লোকায়ত বিশ্বাস যে, শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য শাক্ত কেশবভারতীর কাছে কিছুটা শক্তি সাধনায় দিশা নিয়েছিলেন। তার মানে মূল বৈষ্ণব ধর্ম অবিমিশ্র নয়, তাতে অন্য ভাবনা ও ক্রিয়াকরণের মিশেল ঘটেছে। পদে এবারে বলা হয়েছে :
পরে গিয়ে রামানন্দের কাছে
বাউল ধর্মের নিশানা খোঁজে—
তবে তো মানুষ ভজে
পরমতত্ত্ব পায়।
কেশবভারতীর কাছে শাক্ত দীক্ষাতেই শেষ নয়, মহাপ্রভু তারপর রায় রামানন্দের কাছে নিলেন বাউল মতের খোঁজ এবং সেই সুবাদে পেলেন মানুষজনের নতুন পথ—যা হল পরমতত্ত্ব অর্থাৎ নরনারীর যুগল-ভজন। মহাপ্রভুর আগে চণ্ডীদাস (তিনিও নাকি বাউল) বলেছিলেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। সেই ইঙ্গিত দিয়ে দুদ্দু শাহ এবারে বলছেন:
বাউল এক চণ্ডীদাসে
মানুষের কথা প্রকাশে
সেই তত্ত্ব অবশেষে বৈষ্ণবেরা নেয়।
তার মানে বৈষ্ণব ধর্মের অনেক আগে ছিল বাউলতত্ত্ব, সেই চণ্ডীদাসের পদে। সেই আদিবাউল চণ্ডীদাস যে মানুষতত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন সেই তত্ত্ব শেষ পর্যন্ত নেয় একদল বৈষ্ণব। আর যেসব বৈষ্ণব নেয়নি সেই মান্যতত্ত্ব, তারা হল মর্কট বৈরাগী।
মর্কট বৈরাগী যারা
এক অক্ষরও পায় না তারা
গীতা ভাগবত শাস্ত্র পড়া পণ্ডিত সবায়।
এই মর্কট বৈরাগীরা মানুষতত্ত্ব তথা বাউলতত্ত্ব না নিয়ে গীতা ভাগবত আর শাস্ত্র পড়া নীরস পণ্ডিত বনে গেছে। আর একদল আচরণবাদী বৈষ্ণব, তারা কেমন?
তিলক মালা কৌপীন আঁটার দল
জানে শুধু মালসাভোগের ছল
দিনরাত কিছু না বুঝে
মালা জপে যায়।
বৈষ্ণবদের সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিকোণ অর্জন করতে গেলে আমাদের একটু ইতিহাস ঘাঁটতে হবে। বেশির ভাগ লোকের ধারণা, শ্রীচৈতন্যদেব গৌড়বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করেন। কথাটা অর্ধসত্য, কারণ নবদ্বীপ তথা গৌড়বঙ্গে তিনি তো বৈষ্ণব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পারেননি, চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন নীলাচলে। নবদ্বীপে মাত্র তেরো মাস মতো সময় তিনি আন্দোলন সংগঠন করেছিলেন, তারপরই সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগ করেন। শিষ্য পরিকরগণ তখনও দায়িত্ব নেবার যোগ্যতা অর্জন করেননি। অদ্বৈতাচার্য বদ্ধ বলে নেতৃত্ব দেবার পক্ষে অযোগ্য ছিলেন। তাঁর শিষ্য ঈশান আর দুই শিষ্য কৃষ্ণদাস ও শ্যামাদাস, অদ্বৈত-র পত্নী সীতাদেবী আর তার সন্তান অচ্যুতানন্দ বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করতে লাগলেন নিজের মতো করে। কোনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা নির্দেশ ছিল না। এই সময় থেকেই বাংলার বৈষ্ণবধর্মে নানা খণ্ডিত মত ও উপদলের সৃষ্টি হতে থাকে প্রধানত আচরণবিধির পার্থক্য থেকে। নানা জায়গায় বৈষ্ণবকেন্দ্র গড়ে উঠল। তার একটা শান্তিপুরে, একটা বাঘনাপাড়ায়, একটা খড়দহে, একটা নবদ্বীপে। এঁদের কেউ ব্রাহ্মণ্যবিরোধী, কেউ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আপোষকামী, কেউ শূদ্রদের বৈষ্ণবভুক্তির ব্যাপারে তৎপর। এঁদের এক একটা আলাদা তত্ত্ব ও বিশ্বাস ছিল। কেউ সরাসরি চৈতন্যপূজক, কেউ গৌরনগরবাদের প্রচারক, কেউ গদাইগৌরাঙ্গ তত্ত্বে বিশ্বাসী, কেউ গৌর-বিষ্ণুপ্রিয়ার উপাসক, কেউ রসরাজ সম্প্রদায় বলে নিজেদের পরিচয় দিত। অত অনুপুঙ্খে আমাদের যাবার দরকার নেই। আমরা কেবল বাউল উৎসে বা বিবর্তনে বৈষ্ণবদের সংযোগ খোঁজার চেষ্টা করব।
স্পষ্টত বৈষ্ণবদের নানা দল উপদল থাকলেও নিত্যানন্দ আর তাঁর পুত্র বীরভদ্র প্রধানত কাজ করেছিলেন অন্ত্যজ ও ব্রাত্যদের বৈষ্ণব সমাজে অন্তর্ভুক্ত করতে। তাঁদের ডাকে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। গৌড়বঙ্গে যে বিপুল পরিমাণ আত্মগোপনকারী নিম্নবর্গের বৌদ্ধ ছিল, যাদের বলা হত নেড়ানেড়ি, তাঁদের নিত্যানন্দ বা মতান্তরে বীরভদ্র ধর্মান্তরিত করেন। বৈষ্ণব মতে দীক্ষা নেবার সময় তাঁরা কেশমুণ্ডন করেছিলেন বলে তাঁদের নেড়ানেড়ি বলত সবাই। কথাটা পরে হীনার্থবাচক হয়ে পড়ে এবং নেড়ানেড়িদের বৈষ্ণবরা ততটা সম্মান করেনি বলে তাদের অনেকে বাউল পথে চলে যায়, অনেকে হয় ফকির। এই ফকিরদের ‘নাড়ার ফকির’ বলা হত বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।
