আরতির আসরে আমার মন চলে গেল কাটোয়া-পাটুলি-অগ্রদ্বীপ-দাঁইহাট-মাটিয়ারি আরও কত গ্রামে বৈষ্ণবদের, সহজিয়া আর জাতবৈষ্ণবদের আচার আচরণের স্মৃতির সরণি বেয়ে। মনে পড়ে গেল ক্ষিতিমোহন সেনের মন্তব্য কেঁদুলির মেলা সম্পর্কে … বাউল সম্পর্কে—‘আধা বৈষ্ণব আধা বাউল।’ এঁরা কি তাই? এবারে বিদ্যমকের মতো মনে পড়ে গেল শান্তিদেব ঘোষের একটি গভীর মন্তব্য। বহুদিন ধরে বহুজনকেই জিজ্ঞেস করেছি, রবীন্দ্রনাথ কেন বাউলদের সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়েছিলেন? কেন তিনি কখনও যাননি বোলপুরের অত কাছে জয়দেব-কেঁদুলিতে? বীরভূমের বিখ্যাত বাউলদের সম্পর্কে কেন এক পঙ্ক্তিও ব্যয় করেননি? কারুর কাছে সদুত্তর পাইনি। শুধু শান্তিদেব ঘোষ বলেছিলেন, ‘বাউল গান বাউল নাচ সবই খুব ভালোবাসতেন গুরুদেব। কিন্তু বীরভূমের বাউল সম্পর্কে ওঁর উৎসাহ ছিল না কেন জানেন? ওরা বাউল নয় ঠিক, বরং সহজিয়া বৈষ্ণব। বাড়িতে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ আছে। গুরুদেব বিগ্রহপুজোর বিরোধী ছিলেন। তাই যাননি।’
আরতির শেষে বাইরের বারান্দায় আবার এসে বসলাম সকলে। বিজলিবাতি জ্বলে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে আমার মনের সুর কেটে গেছে। লক্ষ্মণদাসের পক্ষে সেটা বোঝা কঠিন। তিনি সহাস্যে বললেন, ‘দেখলেন তো আমাদের সন্ধ্যারতি, কেমন লাগল? আর কিছু জিজ্ঞাসা আছে আপনার?’
বললাম, ‘ভালই তো। না, আর কিছু জানবার নেই বিশেষ। কেবল একটাই প্রশ্ন আছে, আপনাদের গোত্র কী?’
—আমরা অচ্যুতানন্দ গোত্রের।
আমার প্রশ্ন শেষ, উত্তরও একেবারে যথাযথ, মানে যেমন ভেবেছিলাম। অচ্যুতানন্দ গোত্রই তো ভেবেছিলাম। বাংলার সব সহজিয়া আর জাতিবৈষ্ণবের একই গোত্র— অচ্যুতানন্দ। কিন্তু বাউলের তো কোনও জাত নেই, গোত্র নেই, তবে এরা কী? বাউল না বৈষ্ণব? নাকি আধা বাউল আধা বৈষ্ণব? এর উত্তর প্রকৃতপক্ষে পাওয়া খুব সহজ নয়। তবে বাউল আর বৈষ্ণব সম্ভবত দুটি আলাদা পথ। যেমন লিখেছেন দুদ্দু শাহ :
বাউল বৈষ্ণব ধর্ম এক নহে তো ভাই
বাউল ধর্মের সাথে বৈষ্ণবের যোগ নাই।
বিশেষ সম্প্রদায় বৈষ্ণব
পঞ্চতত্ত্বে করে জপতপ
তুলসী মালা অনুষ্ঠান সদাই।
বাউল মানুষ ভজে
যেখানে নিত্য বিরাজে
বস্তুর অমৃতে মজে
নারী সঙ্গী তাই।
লালন-শিষ্য দুদ্দু শাহ-র text অতীব প্রাঞ্জল ও নির্দেশক। বাউলদের সঙ্গে বৈষ্ণবদের কোনও সম্পর্ক নেই এই বিশ্বাস খাঁটি বাউলদের— কেননা তারা নারীপুরুষে যুগল দেহসাধনা করে গুরু বা মুর্শিদের দেখানো পদ্ধতিতে। তাদের লক্ষ্য বীর্যের স্থায়িত্ব সাধন এবং ঊর্ধ্বরেতা হয়ে কাম থেকে প্রেমে উত্তরণের আনন্দে আবিষ্ট থাকা। মানবদেহের অন্তর্গত বীর্য ও রজ নিয়ে তাদের সাধনা, সেটা কোনও অলীক অনুমানের নয়, দেবদেবতানির্ভর নয়, নরনারীর বাস্তব শরীরনির্ভর—তাই তাদের এক অর্থে বলা যায় বস্তুবাদী (‘বস্তু’ মানে পিতৃবস্তু ও মাতৃবস্তু) এবং মানববাদী। তাই ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। তারা এতদূর বলে,
যে বস্তু জীবনে কারণ
তাই বাউল করে সাধন।
অর্থাৎ তাদের সাধনা রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ পূজা নয়, নিজের শরীরের অন্তঃস্থিত পদার্থকে সংরক্ষণ। সেই বিশ্বাস এত প্রবল যে গয়া কাশী বৃন্দাবন নবদ্বীপ সবই তাদের কাছে অসার। তারা মনে করে :
জীবনই তীর্থ ধর্ম পথ
এই কথা বাউলের মত।
তীর্থ বলতে বাউলরা কোনও স্থানবিশেষকে বোঝে না। এই শরীরেই আছে মক্কা মদিনা, এখানেই মথুরা বৃন্দাবন—তবে আর কেন তীর্থে যাওয়া? স্পষ্ট করে বরং এইরকম ভাবা সহজ যে,
শুক্র ধাতু ভবেৎ পিতা
রজ ধাতু ভবেৎ মাতা
শূন্য ধাতু ভবেৎ প্রাণঃ
তার মানে রজবীর্যে গঠিত মানবদেহ, অনুমানের বিষয় নয়—একেবারে বাস্তব। আর প্রাণ? প্রাণ আসে শূন্য থেকে। তা হলে এই মানুষেই আছে সেই মানুষ—পিতার মধ্যেই পুত্র। বাউলতত্ত্বের এটাই মূল বিশ্বাস। সেইজন্যেই পিতৃবস্তু বা বীর্যকে অযথা ক্ষয় করা উচিত নয়—তাকে সংরক্ষণ করে অটল করতে হবে। সেই অটলই হল অধরমানুষ বা আলেক সাঁই। তার আরেক নাম ‘মনের মানুষ’। বাউল আর্তি করে বলছে: ‘আমি কোথায় পাবো তারে?’ তারে অর্থাৎ মনের মানুষ যে, তাকে। সে তো একমাত্র নরনারীর দেহযোগে পাওয়া যায়— সঠিক সাধনপথে, সেই পথ দেখিয়ে দেন গুরু বা মুর্শিদ। সে কারণেই নিতে হবে দীক্ষা, তারপরে শিক্ষা। যে শিক্ষায় কামকে এড়িয়ে নয়, পেরিয়ে, পেতে হবে প্রেমানন্দ। ‘কামে থেকে হও নিষ্কামী’ তাদের প্রতি নির্দেশ। অপক্ক দেহকে কর পক্ক। তার জন্যেই ভজন সাধন। সে সাধন মানে মন্ত্র জপ ধ্যান নয়। শরীরী সাধন। তারা প্রশ্ন তুলেছে—
ব্রজে ভজিল গোপী সাক্ষাৎ ভজনে
আমরা কেন ভজি অনুমানে?
অনুমানে করে ভজন যত সব অজ্ঞানে।
অতএব অনুমানের ভ্রান্ত পথ নয়, ধরো বর্তমানের দিশা। সেই দিশা পেলে বোঝা যাবে কোনও পুরাণপ্রসিদ্ধ দেবতা উপাস্য নয়, তবে তার স্বরূপ কি?
আমি নই অযোধ্যারই রাম
নই বৃন্দাবনের শ্যাম
সহজ থেকে বলছে ডেকে
সহজ আমার নাম।
বাউল মত হচ্ছে সহজকে অর্জন করবার কঠিন পথ। সেখানে বৈষ্ণবদের মতো তুলসী মালা, মালসাভোগের অনুষ্ঠান, তুলসী পাতা, গঙ্গাজল, পঞ্চতত্ত্ব—কিছুই লাগে না। শুধু লাগে সিদ্ধ দেহ ও মুক্ত মন। উপবাস, মন্ত্রজপ বা দেবতার বিগ্রহ লাগে না। শুদ্ধ প্রেমকে পেতে গেলে কামনাকে অঙ্গীকার করতে হয়। লালন যেমন বলেন,
