এনায়েতউল্লা ফকিরের বাড়িতে একদিন একরাত বাস করে আমার চোখকান অনেকটা খুলে গিয়েছিল। বাউল ফকিরদের সম্বন্ধে হালকা ভাবাবেগ আর অকারণ মুগ্ধতা রয়েছে যাঁদের, তাঁদের উচিত এক আধরাত তাদের আস্তানায় কাটানো। এই যেমন এনায়েত ফকিরের ঘরে দেখছিলাম, চার-পাঁচটা ছোকরা নিমীলিত চোখে সশ্রদ্ধভাবে এনায়েতের সব কথা গিলছে। এরা হবু ফকির। খুব শিগগির ফকিরি পন্থা নেবে। কেন এই ধরনের কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরের যুবকেরা ফকিরি পন্থায় আসছে— আজও আসছে— জানবার ইচ্ছে জাগল।
এনায়েতউল্লা আমাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘এরা আসে জন্মনিয়ন্ত্রণ শিখতে।’ আমার বাকস্কৃর্তি হচ্ছে না দেখে বোঝালেন, ‘মুসলমানদের ঘরে ঘরে, বিশেষত অশিক্ষিত গ্রাম সমাজে সন্তান সংখ্যা বেশি। তার ফলে চরম দারিদ্র্য আর অস্বাস্থ্য। এই যারা ফকিরি পথে আসতে চাইছে, এরা বিবাহিত, দু’-একটা সন্তানও হয়েছে। আর চায় না, তাই এ পথে আসছে। আমার কাছে দমের কাজ শিখতে পারলে সন্তান হবে না, এটা জানে। তাই পড়ে আছে।’
লক্ষ্মণদাসের বাড়িতে এসে এনায়েত ফকিরের কথা মনে পড়ল দুটো কারণে। প্রথমত, বাড়ির আশেপাশে যেমন বাউলদের দেখছি নানা বয়সের, তেমনি এনায়েতের বাড়ির ইতিউতি দেখেছিলাম ফকিরদের। ফকির পাড়া যেন। দ্বিতীয়ত, ফকিরের বাড়ির সামনে দেখেছিলাম একসার ইসলামি শৈলীর সমাধি, ছোট ছোট। এনায়েতের বাবা পাঁচুরুল্লা বিশ্বাসের কবর— আরও অনেকের। তার মানে মারফতি ফকির বলে গ্রামের ইসলামি কবরখানায় এঁদের স্থান হয়নি বা প্রতিবাদী চেতনা থেকে এঁরা নিজেরাই নিজের ভিটের আওতায় সমাধি দিয়েছে পূর্বজদের।
কেন্দুয়াতেও তাই। লক্ষ্মণদাসের বাড়ির পাশে বাউলদের সমাধিক্ষেত্র। সেখানে চিরনিদ্রাবৃত নবনীদাস বাউল। ভাবতেই বিহ্বল হয়ে পড়লাম। মানুষটার শেষ বয়সের চেহারা আমি দেখেছিলাম বহু পুণ্যফলে— সেকথা মনে পড়ল। ১৯৫৬ সালে কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে গান গাইছিলেন নবনীদাস। দীনভিখারির বেশে কিন্তু উদ্দীপ্ত কণ্ঠে। পূর্ণদাসকেও ওই বছরে দেখি তবে নিজাম প্যালেসে। অসামান্য রূপ, অপূর্ধ চোখ, কপালে রসকলি, পরনে গেরুয়া। ঘুরে ঘুরে বৃত্তাকার নাচের সঙ্গে সেই চমৎকার যৌবনভরা কণ্ঠে গান আর তান। বীরভূমের গ্রামে গ্রামে মাধুকরী থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন পূর্ণ একেবারে কলকাতার আলোকোজ্জ্বল আসরে—আগ্রহী মিডিয়ায়। নবনীদাস ফিরে গিয়েছিলেন স্বস্থানে— পূর্ণদাসকে আর ফিরতে হয়নি। ভাগ্য তাঁকে খ্যাতি বিত্ত প্রাসাদ দিয়েছে—তাঁর কণ্ঠের অক্ষম অনুকারক এখনও সারা বাংলায় ছড়ানো। তিনি এখন সংগত কারণেই ‘বাউল সম্রাট’। একজন লিখিত প্রশ্ন তুলেছেন : ‘সম্রাট শব্দটা তো সামন্ততান্ত্রিক। বাউলের নামের আগে এই শব্দটা বসে কি করে? অন্যরা এই উপাধি তাকে দিতে পারে। তারা অজ্ঞ। কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করেছেন বলেও আমাদের জানা নেই!’ পূর্ণদাসের একটি ভিজিটিং কার্ডে লেখা আছে : Baul Samrat, Baul Kirtan Ratnakar, Baul Sagar (Benaras), Baul Mani of International fame, Lok Ragasree (Allahabad) মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
পূর্ণদাস আর লক্ষ্মণদাস সহোদর ভাই কিন্তু চেহারায় একেবারে মিল নেই, স্বাস্থ্যও আলাদা রকমের। গানের গলা আর জীবনযাপনও বেশ অন্যরকম বোঝা যায়। বিদেশিনীকে বাহুলগ্ন করে বেসামাল লক্ষ্মণদাসের গল্প অনেকে করে থাকেন। যাই হোক সেদিন কেন্দুয়ায় শেষ বিকালে লক্ষ্মণদাসকে পাওয়া গিয়েছিল আত্মস্থ অবস্থায়। নিতান্ত ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ। তবে চেহারায় এক ধরনের ম্লানতা আর ক্লান্তির ছাপ। এ জাতীয় নানাদেশ ঘোরা পোড়খাওয়া প্রফেশনাল বাউলের সঙ্গে গভীর আলোচনা চলে না। এদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা আর কীইবা থাকতে পারে? সাধনভজনের জীবন তো নয়। পূর্ণ বা লক্ষ্মণ নিজেরাই কবুল করেন : ‘আমার বাবার মধ্যে যেটা ছিল সেটা আমরা পাই নাই। তিনি ছিলেন বড় সাধক, ভাবুক মানুষ।’
সেটা জানেন বলে লক্ষ্মণদাসের মধ্যে চালাকি কম। ধীরে সুস্থে কথা চলছিল— নির্দিষ্ট কোনও লাইন ধরে বা তত্ত্বকথা নিয়ে নয়। গানের কথা, নবনীদাসের কথা…এখনকার বাউলদের পেশাদারি মনোভাবের কথা। আস্তে আস্তে কথা ঝিমিয়ে পড়ছিল। চা-বিস্কুট দিলেন ওঁর স্ত্রী, সাধারণ গ্রাম্য নারী। সন্তানরাও কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবারে সন্ধ্যা নেমে এল। বাড়ির অন্দর থেকে বেজে উঠল সাঁঝবেলার শাঁখ। একটু চমকে গেলাম। বাউলের বাড়িতে শাঁখ? শঙ্খ ঘণ্টা প্রদীপ আরতি দেবারাধনা কখনও দেখিনি বাউলের বাড়ি। তাঁদের বিশ্বাসে ও আচরণে তো ওই বস্তুগুলি নেই। তবে?
লক্ষ্মণদাস কিছুটা কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বিনয় করে বললেন, ‘আপনারা বসুন—আমি একটু ভেতরে যাব, আধঘণ্টার মতো। সায়ংসন্ধ্যায় আমাদের ক্রিয়াকরণ থাকে তো!’
—আমরাও যেতে পারি তো?
—বিলক্ষণ। ভেতরে আসুন। ক্রিয়াকরণ দেখবেন?
সত্যি সত্যি কৌতুহল ছিল— বাউলের সান্ধ্য ক্রিয়াকরণ দেখার এমন সুযোগ হঠাৎ জুটে গেল। গেলাম বাউলের পিছু পিছু। ভেতরের ঘরের মধ্যে একটা উঁচু বেদিতে রাধাকৃষ্ণ মূর্তি। আমাকে সম্পূর্ণ বিস্মিত করে গমগম করে বেজে উঠল শঙ্খ ঘণ্টা কাঁসর এবং এমনকী একজন বাজাতে লাগল শ্রীখোল। ধূপ ধুনো জ্বলছে। একেবারে সাত্ত্বিক পরিবেশ। বাড়ির স্ত্রী-পুরুষ সকলেই কৃতাঞ্জলি করে আছেন। হরিধ্বনি হরিকীর্তনে সকলে সমস্বর। এ তো একেবারে বহুবার দেখা বৈষ্ণবীয় সন্ধ্যারতি। নবনীদাসের বংশ তবে কি বাউল নয়? জাতিবৈষ্ণব?
