কথাগুলি বিবেচনাযোগ্য ও যুক্তিপূর্ণ। একসময়ে সমাজস্রোতের বিরুদ্ধতা করেও বাউলরা নিজেদের অস্তিত্ব আর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পেরেছিল সেই বিশিষ্ট সমাজ কাঠামোর জন্যই। আজ সেই সমাজ কাঠামো নিজেই বিধ্বস্ত তাই তার ঔদার্যের অভাবে বাউলরা অনিকেত। মূল সমাজ চরিত্র আজ পরিবর্তনের ঝড়ে দিশাহীন, তাই বাউলরা তাদের non conformist ভূমিকা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়ে নানা ধান্দা ও চাতুর্য এমনকী বৈদ্যুতিন যন্ত্ৰব্যবহারের কৃৎকৌশলে ক্রিয়াপর। একতারা আর এখন তাদের প্রতীক নয়, সহযোগী যন্ত্রও নয়—শো-পিস।
সহজধারার বাউল গায়ক আর তার মরমি শ্রোতাদের মধ্যে এখন রয়েছে বিভ্রম ও চমকের পরদা। চমকপ্রদ হওয়া এবং পেশাদারিত্ব অর্জন এখন বাউলের আচরিত কৃত্য। শ্রোতাদের মন এখন গভীরতা বা রহস্য অতলতার প্রত্যাশীও নয়। তারা তত্ত্ব চায় না, চায় তীব্র ঝোঁক আর দ্রুতচালের হালকা গায়নরীতি। রবীন্দ্রনাথ, ক্ষিতিমোহন, উপেন্দ্রনাথ, মনসুরউদ্দিন—কেউই বাউল গানের এত অবনমন দেখে যাননি। দেখে যাননি বাউল জীবন চর্যার অধঃপতন। হালফিল চারদিকে একটা নৈরাশ্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি সংলাপ এখানে উদ্ধৃত হচ্ছে প্রসঙ্গত।
মহিলা বাউল গায়িকা ননীবালাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘বাউল মেলা মহোৎসবে যান? ননীবালার জবাব, ‘আগে যেতাম। এখন আর যাই না। গানের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে।’
কেঁদুলির মেলায় আদিত্য মুখোপাধ্যায় কয়েকজন সাধক বাউলের কাছে খাঁটি বাউলদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল। তার উত্তর পাওয়া গেছে নানারকম। যেমন—
‘বাউল কুথাগো ইখানে? ইখন তো ড্রেসের চমক আর খমকের কেরামতি’—
বলেছেন প্রবীণ রামেশ্বর দাস বাউল।
মনোহর দাসের উক্তি: ‘বাউল সুরের সেদিনই মৃত্যু হয়েছে, যেদিন বাউল একতারা ছেড়েছে।’
গায়ক পূর্ণদাসের গানের বিষয়ে জনৈক বাউলের টিপ্পনী : ‘পুন্ন আর বাউল কি গাইছে গো, বাউল গাইত নবনী দাস, পুন্নর বাবা।’
স্বয়ং পূর্ণদাসের স্বীকারোক্তি : ‘বিদেশীরা স্বীকৃতি দেবার আগে এবং সেখানে ব্যাপক প্রচার ও বিপুল সমাদরের পূর্বে আমাদের দেশে বাউল-সংস্কৃতি নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামাননি।’
এবারে উঠবে এক গুরুতর প্রশ্ন—নবনীদাস বা তাঁর পুত্র ‘বাউল সম্রাট’ পূর্ণদাসকে কি আদপে বাউল বলা যাবে?
হঠাৎ কি এমনতর প্রশ্ন উঠল বলে মনে হচ্ছে? আসলে এটা একটা জারিত জিজ্ঞাসা, যা বহুদিন ধরে বহুবর্গের বাউলদের সঙ্গে মেলামেশা করতে করতে আমার মনের কোণে জেগেছে কিন্তু সমাধান করতে পারিনি। সমাধান করলাম বহুদিন পরে, মাত্র বছর কয়েক আগে। ঘটনাটা এইরকম।
সে সময় সিউড়ি শহরকে কেন্দ্র করে ঘুরছিলাম আশপাশের কয়েকজন বাউলদের সন্ধানে। জানা গেল সিউড়ির উপকণ্ঠে কেন্দুয়া পল্লিতে থাকেন সপরিবারে লক্ষ্মণদাস বাউল। লক্ষ্মণদাস, নামী মানুষ, কারণ নানা জায়গায় তাঁর গানের ডাক আসে, সরকারি অনুষ্ঠানেও, তার একটা কারণ তাঁর ঘরানা খুব অভিজাত। লক্ষ্মণদাস নবনীদাসের পুত্র, পূর্ণদাসের ভাই। বিদেশে গেছেন বেশ ক’বার, বিদেশিনী সংসর্গ করেছেন ব্যাপক— গায়ক-বাউলরা অনেকে তাঁর সৌভাগ্যে ঈর্ষাকাতর—কথাবার্তায় লক্ষ করেছি। তো এক গ্রীষ্মের বিকেলবিকেল গেলাম লক্ষ্মণদাসের বাড়ি—কেন্দুয়া পল্লিতে। বাড়তি একটা টান ছিল। শুনেছিলাম, জীবনের একেবারে শেষদিকে অসুস্থ ও বৃদ্ধ নবনীদাস বাউল আশ্রয় নিয়েছিলেন লক্ষ্মণদাসের ওই বাড়িতে—ওখানেই দেহ রাখেন। বাড়ির পাশে আছে তাঁর সমাধি।
লক্ষ্মণদাসের পল্লিকে একটা মোটামুটি বাউল পাড়া বলা চলে। নানা বয়সের বাউল ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোটখাটো তাদের কুটির। সকলেরই কেশ চুড়া করে বাঁধা, পরনে গেরুয়া অঙ্গবাস, গলায় নানারকম পাথুরে মালা। বেশ চমৎকার পরিবেশটি। আমার মনে পড়ল নদিয়া জেলার পরানপুরে এনায়েতউল্লা ফকিরের বাড়ির কথা। সেখানে অবশ্য গিয়েছিলাম এক যুবকের মোটর সাইকেলের পেছনে বসে। যুবকটি নানা কথা বলতে বলতে গাড়ি চালাচ্ছিল। বোঝাচ্ছিল দেশ কালের পরিস্থিতি, তার গ্রামের হালচাল। হঠাৎ একজন সাইকেল আরোহী ব্যক্তির আমরা মুখোমুখি। সে জিজ্ঞেস করল ভারিক্কি চালে, ‘আসছ কোথা থেকে? যাবে কোথায়?’
যুবকটি মোটর সাইকেল থামিয়ে বিনয় বচনে বলল, ‘ভাল আছেন কাকা? আসছি এখন নাজিরপুর থেকে, এঁকে পরান ফকিরের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘বেশ বেশ’ বলে লোকটি চলে যেতেই ছোকরা বলল, ‘যাকে দেখলেন স্যার, ও হল এ দিগরের সবচেয়ে বড় ডাকাত। কী দিনকাল এসেছে ভাবুন।’
—কেন?
—ডাকাতের সঙ্গেও হেসে কথা বলতে হয়। কাকা বলেও ডাকতে হয়। খুব ঘেন্না ধরে যায় নিজের ওপর।
বাউল ফকিরের খোঁজে এসে ডাকাত দর্শন? পরে জেনেছি, বাউল ফকিরদের মধ্যে কেউ কেউ পূর্ব আশ্রমে ডাকাত ছিল। পরে অনুতপ্ত হয়ে সব ছেড়ে ছুড়ে ভক্ত বনে গেছে। সে কি পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে ভোল পালটে একেবারে দেশান্তরী হওয়া? তা জানি না। তবে গতবছর মুর্শিদাবাদে এক ফকিরি গানের আসরে একজন দশাসই চেহারার গায়কের গান শুনছিলাম। বিশাল লম্বা চওড়া চেহারা, শক্ত গড়ন। কালো রঙের এক ঢাউস আলখাল্লা পরে ভাবাবিষ্ট হয়ে গান গাইছিল একতারা নিয়ে। যে বাড়িতে আসর বসেছে সেই গৃহস্বামী আমাকে কানে কানে বলেছিলেন— ‘কার রক্তে যে কে জন্মায়! এই যে গান করছে ইসমৎ ফকির, এর বাপ ছিল দুর্ধর্ষ ডাকাত—অন্তত পঞ্চাশ জনকে মেরেছে। এ ছোঁড়া কিন্তু ছোট থেকেই অন্যরকম—ঠান্ডা ভক্তিমান স্বভাবের। গান গাইতে গাইতে কাঁদে। বাড়ি ঘরদোর বউ ছেলে ছেড়ে ফকিরি নিয়েছে।’
