বিদেশে বাউল সম্পর্কে এই হল আমাদের প্রচারের নমুনা। এমন সব প্রচার পুস্তিকার রচয়িতাদের কে বলে দেবে যে, এখনকার বাউলদের বাস্তব এমন নয়। এ ধরনের বস্তাপচা কথা বলার দিন এবারে শেষ হওয়া দরকার। বাংলার বাউল মানে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাজীবী, মাধুকরীব্রতধারী, কে বলেছে? কে বলেছে নাচ আর গানে তারা দক্ষ? কে বলেছে তারা দিব্যোন্মাদ ব্যাকুল? বাউলদের একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়তো ভিক্ষাজীবী, তেমনই খুব কম বাউলই গান গায় বা নাচে। বেশির ভাগই আচরণবাদী, প্রচ্ছন্ন ও সংগুপ্ত। এমনভাবে সাধারণ জীবনস্রোতে তারা মিশে থাকে যে হঠাৎ শনাক্ত করাও কঠিন। তারা বেশির ভাগই শ্রমজীবী ও মাটিঘেঁষা জীবনের লড়াইয়ে সামিল। অনেকে আবার বিপন্ন, মৌলবাদীদের অত্যাচারে। একজন বা দু’জন গায়ক-বাউল বীরভূম বা বাঁকুড়া থেকে মাঝে মাঝে যেতে পারেন প্রতীচীর মঞ্চে, গাইতে পারেন নেচে ঘুরে ঘুরে, কিন্তু তিনি কোনওভাবে কি বাংলার বাউলের প্রকৃত প্রতিনিধি হতে পারেন?
এ প্রশ্ন যে আমাদের মনে ওঠে না তার কারণ কিছু কৌশলী মানুষ বা চতুর স্পনসর আজকাল দেশে ও বিদেশে খুব দক্ষতার সঙ্গে বাউলদের ব্যবহার করছে নিজেদের অর্থ উপার্জনের জন্য। বাউলদের অনেকে নিজের অজান্তে এদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন। তাঁদের প্রতি গুরুর নির্দেশ ভুলে, স্বাভাবিক মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে, প্রযোজকের রুচি ও ব্যাবসাবুদ্ধি অনুসারে নিজেকে সং সাজাচ্ছেন প্রতিনিয়ত, আত্মপীড়ন করছেন যথেচ্ছ। আড়ম্বরপূর্ণ ভোগের জীবন এবং সব রকমের কৃত্রিমতার আড়ালে আত্মসংযত থাকার কথা বাউলের, কিন্তু প্রচার তাঁদের বিপথগামী করে প্রতিনিয়ত। এখন নানা নাগরিক অনুষ্ঠানে বা পুজো প্যান্ডেলে, গুরু বা ছোটখাটো অবতারকল্পের বাৎসরিক পালনে, বক্তৃতা, প্রতিযোগিতা, অষ্টম প্রহর তারকব্রহ্মনামের সঙ্গে অনুষ্ঠান সূচিতে লেখা থাকে ‘রাতে বাউলগান’। সন্ধ্যার মুখে এসে পড়েন খ্যাপা নামধারীরা এবং বিপুল জন সমাবেশে তারস্বরে চেঁচাতে থাকেন, গানের নামে। তাঁদের আশু লক্ষ্য অর্থোপার্জন, উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য অনুষ্ঠানের সাম্বৎসরিক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি। এঁরা প্রকৃত বাউল নয়— বাউলের অনুকল্প।
এমনতর ক্ষেত্রে কথা উঠেছে বাউলের মূল্যবোধ নিয়ে। নবনীদাস বা নিতাই খ্যাপা, রাধেশ্যাম বা ত্রিভঙ্গ দাসকে কি এভাবে ব্যবহার করা যেত? যেত না, কারণ তাঁদের বাউল সাধনার ভিত ছিল অনেক সুদৃঢ়, বোধ ছিল পরিপক্ক, নিজেকে প্রচ্ছন্ন রাখাই ছিল লক্ষ্য। আজ পটভূমি পালটে গেছে, আর্থ-সামাজিক পরিবেশ হয়ে গেছে অন্যতর, অস্তিত্বের সংকট হয়ে উঠেছে তীব্র। এ প্রসঙ্গে সমাজতাত্ত্বিক বিকাশ চক্রবর্তী মনে করিয়ে দিয়েছেন একটি নিবন্ধে যে,
১. বিদ্যমান সমাজের রীতিনীতি মূল্যবোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া সত্ত্বেও বাউলরা একান্তভাবেই সামাজিক মানুষ, কারণ সপ্তদশ শতাব্দীর সামাজিক প্রতিবেশই বাউল মতবাদের জন্ম ও ক্রমবিকাশকে সাহায্য করেছে এবং তারই ভিত্তিতে নিজস্ব বিকল্প মূল্যবোধ তারা গড়ে তুলেছে। তাই অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো বাউল জীবন ও তার মূল্যবোধ মিথষ্ক্রিয়ার বন্ধনে আবদ্ধ।
২. একটা বিষয় খুব স্পষ্ট যে বাউল সাধনা কোন ক্ষণিকের সাধনা নয় বরং এক সামগ্রিক জীবনচর্যা, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।
৩. প্রত্যেক সমাজ ব্যবস্থাই যে সম্পর্ককে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে বিচার করে এবং বিধিনিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখে, তা হলো নারী-পুরুষের সম্পর্ক, কারণ এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে সম্পত্তির সংরক্ষণ ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রের মতো নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাউলরা সমাজ-অনুগামী নয়। খুব সহজেই তাই এদের বিরুদ্ধে বহুগামিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে তত্ত্বগতভাবে বাউল সাধনা যৌন স্বেচ্ছাচারকে আদৌ সমর্থন করে না। এই যুগল সাধনার প্রকৃতি-নির্বাচন-গ্রহণ-পরিত্যাগ গুরুর আদেশ ও অনুমতি সাপেক্ষ।
বিকাশ চক্রবর্তীর তিনটি বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ ও অনুধাবনযোগ্য এইজন্য যে তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক। বহু বছর ধরে বহু গুরুপাট ও আখড়ায় তাঁর যাতায়াত আছে এবং মেলা মহোৎসবে অগণ্য মানুষের অংশগ্রহণের আততি ও আনন্দ তিনি জানেন। বাউল সাধক ও তার সাধনসঙ্গিনী, তাদের গুরু ও তাঁর নির্দেশিকা বিকাশ চক্রবর্তীর প্রত্যক্ষভাবে জানা। বাউল আচরণ-বিধি ও বিধান তিনি সরেজমিন দেখে তাঁর সিদ্ধান্ত করেছেন। সেই জন্যেই তিনি বাউলদের যৌন-যোগাচারকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন না— বাউল জীবনের স্বেচ্ছা সাধনার ভিত্তিমূলে কঠোর সংযম ও শৃঙ্খলার কথা তাঁর অভিজ্ঞতায় থাকে। উপরন্তু সমাজতত্ত্ব তাঁর চর্চার বিষয় বলে এমন সিদ্ধান্তে আসতে পারেন যে,
যে-স্বয়ংশাসিত ও কৃষিজীবী সমাজে বাউল মতবাদের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, আধুনিকীকরণের প্রভাবে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে সেই সমাজের। সমকালীন সমাজের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করে বাউলরা চলে গিয়েছিলেন মূল স্রোতের বাইরে। সমাজপতিদের ভ্রূকুটি ও প্রতিরোধ সত্ত্বেও তাঁরা বজায় রাখতে পেরেছিলেন তাঁদের স্বতন্ত্র জীবনধারা, কারণ তৎকালীন সমাজের গড়নই তা সম্ভব করেছিল। আধুনিকীকরণ সঞ্জাত নগরায়ণ প্রক্রিয়া ও গণমাধ্যম দুর্বার গতিতে প্রবেশ করেছে দেশের প্রত্যন্ত প্রদেশে এবং এই অপ্রতিহত আগ্রাসনের কবল থেকে বিশেষ কোন অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের মানুষের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রচেষ্টা নিতান্তই অসম্ভব। সামাজিক রূপান্তরের এই আঘাতে বাউলরাও বিপর্যস্ত। অস্তিত্বরক্ষার প্রয়োজনে পরিবর্তিত হচ্ছে তাদের জীবনবোধ, জীবনধারণের উপায়, এক কথায় সমগ্র জীবনচর্চা।
