এ ধরনের দীনহীন ও শ্রীহীন বসত বাড়ি যে সবার তা নয়। করিমপুরের কাছে গোরভাঙায় আজহার ফকির ছিলেন সম্পন্ন গৃহস্থ। জোতজমি, পাকাবাড়ি, গ্রামজোড়া মান্যতা। ছেলেরাও ফকিরি মতে রয়েছে। ছোট ছেলে মনসুর ফকির এখন গান গেয়ে বেশ নাম করেছে। তবে আজহার ছিলেন তাত্ত্বিক সংসারজীবী ও গীতিকার, মনসুর শুধুই গায়ক। বাড়ির দাওয়ায় বসেছে গানের আসর। আমাদের চোখ চলে গেল গায়কের ঝাঁকড়া চুলের ওপাশে দাওয়ার কোণে— সেখানে রয়েছে একটা তাগড়াই রাজদূত মোটর সাইকেল।
কিংবা ধরা যাক, বর্ধমানের হাট গোবিন্দপুরে সাধন দাসের কুটির। শ্রীময়, শান্ত ও সচ্ছল। দৈন্যের কোনও ছাপ নেই। দিব্যি মোরাম বিছানো রাস্তা, চমৎকার সব খড়ে ছাওয়া ভজনকুটির। বিন্যস্ত গাছগাছালি, ফলফুলের বাগান। একটা নতুন ঘর গাঁথছে সাধনের শিষ্যরা গতরে খেটে। সাধনদাস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাকের সফিস্টিকেটেড মানুষ। জাপানি সাধনসঙ্গিনী মাকি কাজুমি অঙ্গন আলো করে আছে।
এইখানে স্পর্শকাতর বিদেশিনী প্রসঙ্গটি একটু ভেবে দেখা দরকার। সব বাউলরাই যে বিদেশিনী মেমদের নিয়ে আছেন তা নয়। হয়তো সাকুল্যে জন দশ-পনেরো বাউলের কপালে নেকনজর জুটেছে মেমদের তাতেই বদনাম রটেছে সকলের নামে। এখানে একথাটা তো বুঝতে হবে এই শ্বেতাঙ্গিনী বিদেশিনীরা কেউই মহীয়সী নারী নয়— কেউই আসেনি ভারত উদ্ধারে। তারা কেউ মার্গারেট নোবল বা মীরা রিশার নয়, তারা পশ্চিমি বণিক সভ্যতায় দিগভ্রষ্ট রমণী। অর্ধশিক্ষিত কিংবা নেশাগ্রস্ত, কামুক কিংবা বখে যাওয়া। সামান্য দুয়েকজন জিজ্ঞাসু ও গবেষক। তবে এটা ঠিক যে তাদের কল্যাণেই বাউলদের বিদেশি সংযোগ ও ডলার রোজগার এ প্রসঙ্গে আমি একবার লিখেছিলাম :
একদল গায়ক-বাউলের দেশেবিদেশে সাম্প্রতিক বিপুল জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গও উল্লেখ করা উচিত। এঁরা অনেকেই জীবনাচরণে ও সাধনায় বাউল নন, কিন্তু বাউল গানকে পণ্য করে, বাউলের পোষাক পরে, বিদেশী মঞ্চ দাপিয়ে বিপুল ডলার রোজগার করছেন।… গত দু’দশক ধরে সাজানো বাউলরা বিদেশী শ্রোতাদের জনপ্রিয়তা লাভের আশায় দেশজ গানকে ভাবে ও সুরে যতটা চটকদার বিনোদনধর্মী করে তুলেছেন, তার তরঙ্গ আমাদের পল্লী প্রান্তের গায়ককেও দিনে দিনে আকৃষ্ট করছে ও বিভ্রান্ত করছে।
এ-বক্তব্যের বিপরীতে বাউলরসিক অরুণ নাগ একটি নিবন্ধে মন্তব্য করেছেন :
সত্যি কথা বলতে কি বিদেশীদের মনোরঞ্জনের ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি। বিদেশীদের কতজন চটুল গান উপভোগ করার মতো বাংলা বোঝে? সুর বা লয় ইমপ্রোভাইজেশনের ক্ষমতাই বা গড়পড়তা কজন বাউলের থাকে? ‘গুরু কি মাছ ধরেছ বঁড়শি দিয়া’ বা ‘ও জামাই দরজা খোলো’— জাতীয় গান দেশী শহর-গ্রাম নির্বিশেষে এক ধরনের নিম্নরুচির শ্রোতার মনোরঞ্জন করে এবং যথেষ্ট জনপ্রিয়। ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের দিকপালরা বাউলদের থেকে অনেক বেশী বিদেশ যান, ডলার রোজগার করেনও অনেক বেশী, তাদের বেলায় কিন্তু বিদেশ-ডলার নালিশ শোনা যায় না। তারা বিদেশে আলাপ অংশ সংক্ষিপ্ত করে, তবলার সঙ্গে সওয়াল-জবাব বাড়িয়ে পরিবেশনকে আকর্ষণীয় করেন। অথচ কেউ বলেন না রবিশঙ্কর, আলি আকবর, বিলায়েতের পাল্লায় পড়ে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত গোল্লায় যাচ্ছে, তরুণ শিল্পী প্রভাবিত হচ্ছে পরম্পরার পথ ছাড়তে।… অনিকেত বৈরাগী ধূলিধূসরিত পায়ে একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে হেঁটে যাচ্ছে গ্রামের পথে, এমন একটি ধারণা, ভাবমূর্তি মনে প্রোথিত থাকলে তার সঙ্গে সত্যিই মেলানো শক্ত জেট-মার্গী, ডলারপ্রেমী আধুনিক বাউলকে, যিনি নাইকি পায়ে, মারুতি চড়ে, গান গাইতে আসেন। রবিশঙ্করদের এমন ইমেজ কোনোকালে ছিল না বলেই কোনো আপত্তিও ওঠে না। গণ্ডগোল এখানেই।
প্রতিযুক্তি খাড়া করতে গিয়ে অরুণ নাগ নিজেও খানিকটা বিপাকে পড়েছেন। তাঁর বিবেচনায় আসা উচিত ছিল যে, (১) মার্গ সংগীত ও বাউল গান এক পঙ্ক্তিতে উদাহরণযোগ্য নয়, (২) রবিশঙ্করবর্গীয় উচ্চাঙ্গ শিল্পী ও গ্রামের অশিক্ষিত বাউল গায়ক শ্রেণিগতভাবেও একেবারে আলাদা, (৩) বাউল এক ধরনের জীবনাচরণ ও লৌকিক সাধনামার্গ, তাকে শহুরে মঞ্চে তোলার কথা নয়, (৪) বাউল গান ও মার্গসংগীতের দেশি শ্রোতারা একেবারে ভিন্ন বর্গের। সবচেয়ে বড় কথা, বাউল গানে পরিবেশনগত বিকৃতি এলে আমাদের লোকসমাজে তার প্রভাব অনিবার্য এবং সেটা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর। রবিশঙ্কর আলি আকবর বিলায়েতরা বিদেশে পরিবেশনে যে চটক দেখান (সওয়াল-জবাব) এদেশে তো তা দেখান না, কাজেই তরুণ শিল্পীর পরম্পরাভ্রষ্ট হবার কথা আসছে কোথা থেকে? অরুণ নাগ আর একটা ব্যাপার গুলিয়ে ফেলেছেন! কণ্ঠসংগীত শিল্পী বাউলের সঙ্গে যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের তুলনা এনে ফেলেছেন। জেট-মার্গী ডলার প্রেমী আধুনিক বাউল গায়ক নাইকি জুতো পরছেন, মারুতি চড়ছেন, এ-ইমেজ কোনওদিন ছিল না যেমন, আজও নেই। তাই যে দু’-একজন প্রদর্শনকামী ভ্রষ্ট বাউল বিদেশে বাহবা পেয়ে এদেশের মঞ্চেও সেই কৌশলে গান প্রদর্শন করেন, প্রকৃত বাউল গানের রসিকরা তাদের এড়িয়ে চলেন কিন্তু তাতে ধ্বংস বা বিকৃতি ঠেকানো যায় না। কারণ তরুণ গায়ক সম্প্রদায় সত্যিই তাতে প্রভাবিত হন এবং তাদের যন্ত্র-গানের দাপট, লম্বা ঝুলের বিচিত্রিত পাঞ্জাবি, চাপা প্যান্ট এবং কর্ডলেস মাইক নিয়ে চিল চিৎকার এখন বাউল গান বলে চালানো হচ্ছে। ক্রমশ তাদের আসব পানের অতিরেক ও নারী আসঙ্গ যুবসমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ এদের দেখলে বাউল সমাজের প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যাবে না। তারা চিরদরিদ্র ও উপেক্ষিত। আমাদের দেশের গড়পড়তা বাউলদের সম্পর্কে শিক্ষিত নগরবাসীদের ধারণা খুবই ধোঁয়াটে বা প্রান্তীয়। বিশেষত তাদের যাপনরীতি ও জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে আমরা মূলত অজ্ঞ ও নির্লিপ্ত। তাদের সামাজিক অবস্থানগত বিপন্নতা, দৈনন্দিন অপমান ও সংকটের খবর শহুরে বাঙালির ভাবনা-বলয়ের মধ্যে নেই। তারা আমাদের বিনোদন মঞ্চের উপকরণ কিন্তু তাদের দারিদ্র ও ক্লেশ নিয়ে আমরা উদাসীন। তাই মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে বছরের পর বছর ধরে নিরন্তর বাউল ফকির নিগ্রহ আমাদের দূরদর্শনের খাসখবরেও আসে না।
