পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলা ঘুরে বাউল-ফকিরদের হালহকিকত জানতে গিয়ে আমি দু’রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। বেশির ভাগ বাউলই অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত, মোটামুটি চলে যায় গান গেয়ে, মাধুকরী করে, অবরে সবরে কারুর কারুর ডাক আসে সরকারপোষিত অনুষ্ঠানে, কিছু অর্থলাভ ঘটে। আর আছে কিছু সুযোগসন্ধানী বাউল, তৎপর ও চৌকস, ভাল গায়, ভাল কথা বলে। আলাপ হলেই একটা নাম ঠিকানা লেখা (অবশ্যই ইংরিজি অক্ষরে) কার্ড ধরিয়ে দেয়, তাতে গেরুয়া রঙের প্রিন্টে একতারা ছাপা আছে লোগো হিসেবে। এই একতারা একটা শো পিস, এর নানা সাইজ। আমি বর্ধমানের তথ্য দপ্তরে এক বাউলের ছবি তুলেছি, যার পরনে র-সিল্কের আলখাল্লা এবং হাতে দশ-বারো ইঞ্চির একটা ঝকঝকে পালিশ করা মিনি একতারা— ওটার কাজ অলংকারের। হয়তো পিন পিন করে একটু বাজে কিন্তু আসরের নানা বাজনার জগঝম্পে সেই ক্ষীণ ধ্বনির কীইবা মূল্য! তবে হ্যাঁ, ভারী দেখনদারি আর বাউলের নানা অঙ্গভঙ্গির সহায়ক যন্ত্র।
প্রশ্ন উঠেছে এখানেই— পরিবর্তমান দেশকালে, প্রতিযোগিতামূলক বাউল গানের বিশ্বে বাউল কি নবনীদাস বা রাধেশ্যামদের মতো সরলসিধে ভাবনিষ্ঠ সাধক থাকবে, না দেখনদারি ঝলমলে পোশাক পরে নেমে পড়বে অন্যকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে? এই তো সেবার কেঁদুলির মেলায় গিজগিজ করা মানুষের ভিড়ে সবাইকে সচকিত করে একটা লাল মোপেডে চড়ে আবির্ভূত হলেন বিশ্বনাথ দাস। ঝাঁকড়া চুল, আজানুলুণ্ঠিত লাল সিল্কের আলখাল্লা, পিঠে বাঁধা বন্দুকের মতো গেরুয়ামোড়া ছুঁচালো একতারা, যেন বাদ্যযন্ত্র নয় শস্ত্র। তার এহেন পোশাক পরিচ্ছদ বা ঔজ্জ্বল্য বিষয়ে প্রশ্ন করতে সে কোনও দ্বিধা না রেখেই বলল, ‘চিরকালই কি খালিপায়ে খালিপেটে বাউল কষ্ট করবে? এখন অবস্থা ফিরেছে। গান গেয়ে টাকা আসছে, বিদেশ যাচ্ছি আমরা, মান মর্যাদা পাচ্ছি। এ সব মেলা মচ্ছবে তাই একটু দেখাচ্ছি। এর ফলে অনেক বায়না হবে, অনেক আসরে গান করার ডাক আসবে। রোজগার হবে। তা না করে আখড়ায় ধুনি জ্বেলে বসে, গাঁজায় দম দিয়ে ভোম মেরে বসে থেকে কী লাভ?’
এ একেবারে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি, পাকা প্রফেশনাল। আদিত্য মুখোপাধ্যায় এদের সম্পর্কে হতাশ হয়ে কিছুটা ভগ্নহৃদয়ে লিখেছেন:
‘বাউল’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই মনের ক্যানভাসে একটি উদাসী মানুষের ছবি ভেসে ওঠে— গেরুয়া পোষাক, ধম্মিল্ল করে বাঁধা চুল, বগলে গাবগুবি বা আনন্দ-লহরীর চোরা সুর। কিন্তু যতদিন যায়, বাউলের পোষাকও বদল হয়। কেঁদুলীর মেলায় গেলে এ সত্যটি সুন্দর ধরা পড়ে। পবন দাস এখন জিন্স্ ব্যবহার করে বেশি, নিতাই দাস প্যান্ট-সার্ট পরে, নক্ষত্র দাস, বিপদতারণ দাস, কার্তিক দাস সবাই সাধারণ মানুষজনের মতোই থাকেন। গৌর আর সে গৌর নেই, বিশ্বনাথ দাস মারুতি কেনার নেশায় মগ্ন, আনন্দ দাস ভারতে গান গাইতে পছন্দ করে না।… আবার একজন বিদেশিনীর সঙ্গ না করলে এই সময়ের বাউলের মনও ভরে না, পকেটও ভরে না, সঠিক অর্থে বাউল জীবন বৃথা হয়ে যায়।
এই পর্যন্ত পড়ে আমাদের দু’-একটি মন্তব্য করতেই হয়। প্রথমত, বীরভূমের বাউলরাই তো একমাত্র বাউল নয়, সারাদেশে নানাভাবে নানা সাধন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে বাউল— তাদের সবাই এমন প্রদর্শনকামী বা লোভাতুর নয়। নদিয়া-মুর্শিদাবাদ-বর্ধমান-মেদিনীপুর বা বাঁকুড়ায় প্রচুর বাউল দেখা যায়, যারা সৎজীবনযাপনে আত্মসুখী, দরিদ্র ও ভক্তপ্রাণ। মোপেড বা মারুতি তো দূরের কথা, তাদের অনেকের একটা সাইকেলও নেই, গান গেয়ে উদয়াস্ত টহলদারি করছে, তবু পেট ভরে কই? সেই কবেকার কুবির গোঁসাই মনের দুঃখে লিখেছিলেন:
মুষ্টিভিক্ষে করে আমি খেতে পাইনে
উদর পুরে।
ঘরে ঘরে ঘুরব কত
ভূত খাটুনি খাটব কত?
এখনও গড়পড়তা বাউল-ফকিরদের এটাই ভবিতব্য, তবে তারা বেশির ভাগই অভিযোগহীন, স্বভাবে শান্ত। কেমন তাদের আস্তানা? অনুপম দত্ত বর্ণনা দিয়েছেন এইরকম:
আশ্রমটি অজয় বাঁধের ধার ঘেঁষে ছোট একটি দোচালা ঘর। একফালি বারান্দা। সামনের খানিকটা জায়গা ঘিরে ঢোল কলমীর বেড়া। এখানে তার বৈষ্ণবী গাঁয়ে গাঁয়ে মাধুকরী করে বাউলের সংসার চালায়।… বাউলের সংসারে সামান্য সচ্ছলতাটুকু নেই। তার ঘর-জোড়া সস্তা কাঠের তক্তায় ছেঁড়া কাঁথা, তুলো-ফেটে বেরুনো বালিশ। ঘরের কোণে হাঁড়ি কলসীর আবর্জনার ভেতরে মশাদের গুহাবাস, ছারপোকা আর আরশোলার জন্মঘর।
বাউলদের তুলনায় ফকিরদের অবস্থা আরও করুণ, শোচনীয়— অবশ্য খাঁটি ফকিরিয়ানার সেটাই তো শর্ত। বীরভূমের শাসপুরে আমিন শা ফকিরের খোঁজে গিয়েছিল লিয়াকত আলি। ফকির তখনও ফেরেননি। তাই অপেক্ষাতুর লিয়াকত দেখছেন:
আমিনের বউ মাঝবয়সী, রঙ বেশ ফরসা। তবে পরণের মোটা রঙিন ফুলছাপ সস্তা শাড়িটি খুব ময়লা। উঠোনে, খোলা আকাশের নীচে, রোদ্দুরের মধ্যে, মাটির উনুনে কালো তোবড়ানো হাঁড়িতে ভাত রান্না হচ্ছে। পাতার জ্বালে আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই বেশি। উঠোনের ওদিকে মাটির বাড়ি, অবশ্য ওটিকে যদি আদৌ বাড়ি বলা যায়। বাড়িটি জরাজীর্ণ ও বিধ্বস্ত— কোনরকমে খাড়া হয়ে আছে। খড়ের চাল পচে ধ্বসে গেছে। ঠাঁই ঠাঁই খড়ও নেই। উঠোনে ও বাড়ির দাওয়ায় নানান জিনিস বিশৃঙ্খলভাবে পড়ে আছে। বাড়ির মধ্যে মুরগী চরছে, ন্যাংটো শিশু ঘুরছে। আধন্যাংটো একটি বালক কোমরের পেছনে কাস্তে গোঁজা, মাথায় করে একবোঝা ঘাস নিয়ে এসে দাওয়ার ওপর ধপ্ করে ফেলল। উঠোনে এপাশে অন্য কারোর বাড়ির পেছন দিক। তারই ছাচের নীচে ছায়ায় খেজুরপাতার তালাই বিছিয়ে আমাকে বসতে দিয়েছেন। বউটি। পরক্ষণেই এনে দিয়েছেন খাবার জল।
