এদেশে বসে অবশ্য আমরা জানতে পারি না বিদেশে ঠিক কোন পর্যায়ের বাউলরা যান এবং মঞ্চে কী গান করেন। খোঁজ করলে দেখা যাবে পূর্ণদাস, প্রহ্লাদদাস বা পবনদাসরা যেমন ঘন ঘন যান, ততটা হয়তো লক্ষ্মণদাস বা সমীর রায়রা যান না— সবই আসলে যোগাযোগ বা স্পনসরের ব্যাপার, যার কপালে যেমন জোটে। ঘটনাচক্রে সনাতনদাসের মতো গুণী বাউলেরও ডাক আসে। যেমন একবার এসেছিল ফ্রান্স থেকে। সনাতনদাসের খয়েরবুনি গাঁয়ের আশ্রম থেকে ফরাসি ভাষায় লেখা ফ্রান্সের একটা অনুষ্ঠানপত্র সংগ্রহ করেছিলাম। সেটার অংশ বিশেষ অনুবাদ করলে আমরা যে-সংবাদ পাই তা অনুধাবনযোগ্য। সনাতনদাস সম্পর্কে সে দেশের পক্ষে পরিচিতি হল :
Sanatan Das Baul, born in 1923, not attracted by the commercial circuit, has preserved an authenticity linked with his rural mood of life. Coming from Bangladesh, he lives in the village of Khayerbuni (district Bankura). He interpretes Bhatiali, (song of the rivers) by playing on the ektara (stringed lute) on the dotara (lute with 4 strings). He is accompanied by his two sons Viswanath and Basudev, who also play on the gubgubi. He celebrates the awakening of the soul.
বাংলার প্রখ্যাত বাউল ফ্রান্সে গিয়ে একতারা বা দোতারা বাজিয়ে ভাটিয়ালি গাইছেন, এমত সংবাদ কৌতুককর না প্রহসনাত্মক? তাঁর গানের বিষয় ‘Cruel Ganga’ এবং পুরো গানটি অনুষ্ঠানপত্ৰীতে ছাপা রয়েছে এবং তার ‘text’-এ কুত্রাপি বাউলতত্ত্ব নেই। সেটি এক নিছক ভাটিয়ালি। কৌতুকের এখানেই শেষ নয়, সনাতনের সহশিল্পী কার্তিকদাস বাউলের পরিচিতিও চমৎকার। বলা হয়েছে :
Kartikdas Baul belongs to the ‘topsil’ caste, linked with agriculture. An old member of ‘jatra’. a popular musical theatre of Bengal, seduced by the ways of the Baul at the age of 15, he became a disciple of Sanatandas Baul. Today at the age of 35, he lives with his family in the village of Dhandanga (Birbhum district). He specially invokes the Ganga and its cruelty, to the accompaniment of his gub-gubi.
অদৃষ্টের এমনই পরিহাস যে বাংলার বাউল গাবগুবি বাজিয়ে বিদেশে গেয়েছেন ভাটিয়ালি।
সে যাই হোক, বিদেশে বাউল গান কথাটা শুনলেই উর্বাহু হয়ে ভাবমগ্ন স্বার কিছু নেই— অনুপুঙ্খ অনেক বিচিত্র বার্তা উঠতে পারে। তার আর এক রকমফের এবারে পরিবেশন করা যেতে পারে।
রান্ডি নিকলসন নামের এক বিদেশিনীর হঠাৎ ভাল লেগে যায় সমীর রায় নামের গায়ক যুবাকে। কেঁদুলির মেলায় সে আতিপাতি করে খুঁজতে থাকে সমীরকে। লিয়াকত তাকে যোগাযোগ করে দেয় সমীরের সঙ্গে। সমীর প্রসঙ্গে লিয়াকতের মুদ্রিত মন্তব্য :
সমীর ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব পরিচিত। গানবাজনার জগতে বেশীদিন আসেনি। গানটা গায় মোটামুটি ভাল। কিন্তু নাচটা ওর একেবারে বাউল নাচ নয়।… পরের বছরই সমীর বিদেশ চলে গেল। অভাবিত এই ঘটনা ওর জীবনে দারুণ প্রভাব ফেলে। প্রচণ্ড শ্রমে আগের থেকে গলাটিকে তো ভাল করেই, নাচটিকেও মোটামুটি ঠিক করে নেয়। ওকে পছন্দের কারণ হিসাবে রাণ্ডি নিকলসন যা বলে তা আরো অদ্ভুত। ছেলেমেয়ে বাবা ভাই কেউ বাউল নয়, পরিবারটাও সাবেকি মধ্যবিত্ত, আর পাঁচটা পরিবারের মতো। শুধু সমীর বাউল। বাউল পরিবারের ট্রাডিশনাল বাউলের চেয়ে নাকি এ রকম বাউলই তার কাছে কৌতুহলজনক। তাই সমীরকে তার পছন্দ।
রান্ডির পছন্দসই সমীর তো বিদেশ পৌছল এবং আসরে আসরে পরিবেশন করল বাংলার নিজস্ব লোকায়ত বাউল গান। এবারে শোনা যাক তার কনফেশন :
অনেকে বিদ্রূপ করে আমাকে বলে, আমি বাউলের ছেলে নই, উটকো এসে জুটেছি।… কথাটা ঠিকই। কখনো বলি না আমি বাউল। কিন্তু যারা বাউল তাদের মধ্যে এমনও আছে, তারা কি তুচ্ছ ও উদ্ভট জীব স্বপ্নেও তা ভাবতে পারবেন না। ইউরোপে গেছি, আছি এক জায়গায়, আমাদের দেশের একটা কালচারকে তুলে ধরছি। ভাবতে পারেন এমনই বাউল আমরা, একজনের গান চলাকালীন আমরা তার অন্য সহযোগীরা বাজনা গোলমাল করে দিচ্ছি।… আমি এতে ভীষণ হতাশ হয়ে যাই এবং এত মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করি যে ফ্রান্সে কোপেনহেগেনে নির্ধারিত প্রোগ্রাম বাতিল করে দেশে ফিরে চলে আসি। তাহলে বুঝুন, এরাই বাউল।
সমীরের আত্মবিবৃতিতে অনেক ভাজ আছে, যার দ্যোতনা বহুমাত্রিক। যেমন তাঁর একটা বৈদেশিক অভিজ্ঞতা এইরকম :
একবার গান করছি। প্রোগ্রাম শেষ। হঠাৎ দেখি সঙ্গীরা কেউ নেই। আমি একা পাশেই লেক। ওদের খুঁজতে সেদিকে গিয়ে দেখি, গুচ্ছের মেয়ে, সব টিনএজার। ওদের দেখতে পেয়ে আমার সঙ্গী একজন বলল, ‘ওরে সমীর আয় আয়, শালা দেশে আর ফিরে যাব না।’ ওরা এমন হতেই পারে, ওদের ওটাই জীবন, কিন্তু আমরা বাউলরা, আমরা আমাদের মতো কই? একী হলাম, একী তুলে ধরছি— এখন বল, ইউরোপ ভাসবে না আমরাই ভেসে যাব?
সমীরের কনফেশনে এক ধরনের মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ কাজ করছে। এখনকার সুযোগসন্ধানী অশিক্ষিত যৌনকাতর বাউলযুবাদের সঙ্গে বিদেশে সে নিজেকে, নিজের বিবেক ও কাণ্ডজ্ঞানকে মেলাতে পারেনি তার কারণ তার একটা সংস্কৃতিগত বোধ আছে, খানিকটা শিক্ষা আছে। এইখানটায় একটা বড় তফাত গড়ে উঠেছে। গানের কণ্ঠটি ভাল, পরিবেশনভঙ্গি সপ্রতিভ এবং বোলচাল কায়দা কানুনে অভ্যস্ত হতে পারলে এখন খুব সহজে একজন বিশ-পঁচিশ বছরের নিম্নবর্গসম্ভত যুবক বাউল গানের মঞ্চে উঠে পড়ছে। ধীরে ধীরে পরিচিতি ঘটছে আসরে আসরে, ডাক আসছে এখানে ওখানে। মন্দমতি কম বয়সি হুল্লোরবাজ শ্রোতারা তাকে হুকুম করছে যৌনইঙ্গিতপূর্ণ হালকা গান গাইতে। শিক্ষা নেই, বোধ নেই, রুচি নেই, পরম্পরা নেই— লক্ষ্য কেবল অন্যকে দাবিয়ে এগিয়ে যাওয়া, গানের আসরে আগে-ওঠার তদ্বির। এদের চাপে আর দাপটে সব আসরে দেখেছি কুঁকড়ে থাকে একদল নিরীহ গায়ক, বসে থাকে একটেরে। যখন গাইবার ডাক আসে তখন কেমন যেন ঘাবড়ে যায়। দীক্ষিত বাউল তো হঠাৎ মঞ্চে উঠে জনমনোরঞ্জনী গান গাইতে পারে না, তার একটা শিক্ষাক্রম আছে, গুরুর বাচনিক নির্দেশিকা। তাই গুরুবন্দনা দিয়ে তার গান সূচনার রীতি মানতে হয়, পরে একটা তত্ত্বের পথে এগোতে হয়। বেশির ভাগ গানের মঞ্চ তো আসলে বিনোদনমূলক ও তাৎক্ষণিক উত্তেজনার আকর, তাই আসর মাত করে কণ্ঠকেরামতি ও বাজনাসর্বস্ব গায়কের দল। তারাই জনপ্রিয়।
