দেখা যাচ্ছে, বাউলদের জীবনযাপনের ধরন এবং বাউল গান অনেককেই টেনেছে, কিন্তু অন্তরঙ্গতা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু অন্য স্বরও ফুটে উঠেছে। বাউলদের সম্পর্কে এমন কিছু ভাল ও মন্দ মন্তব্য কয়েকজনের রচনা থেকে উদ্ধৃত করব, তার থেকে তাদের হাল চাল কিছু জানা যাবে। প্রথমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্য:
একসময় বাউলগান সম্পর্কে আমার খুব আগ্রহ জেগেছিল। কোথাও কোনো বাউলের গান শুনলেই টুকে রাখতাম।… বারবার ছুটে গেছি কেঁদুলির মেলায়, শীতের মধ্যে সারা রাত জেগে বসে থেকেছি অজয় নদীর ধারে ছোট ছোট আখড়ায়। খুবই দুঃখের কথা, কয়েক বছরের মধ্যেই আমি বাউল গান সম্পর্কে গোপনে গোপনে হতাশ হয়ে পড়ি।… মন দিয়ে বারবার শুনলে, বাউল গানেও একঘেয়েমি এসে যায়। তিন চার রকমের বেশী সুর বৈচিত্র্য নেই। গানের মাঝে মাঝে ‘ও ভোলামন’ বলে একটি দমফাটানো তান আসলে শ্রোতাদের চমকে দেবার একটা কায়দা মাত্র। শুধু গান শোনার আনন্দের জন্যই একসঙ্গে তিন চারটের বেশী বাউল গান শোনা যায় না, তখন হাই ওঠে, কিংবা ফ্যাসানের বশবর্তী হয়ে কৃত্রিম বাহবা দিতে হয়। সাহেবরা প্রকাশ্যে গাঁজা খেতে শুরু করার পর এদেশের ভদ্রসমাজের অনেক ছেলেমেয়েদের মধ্যেও গাঁজা টানার চলন হয়েছে। সাহেবদের পরবর্তী শিকার ঐ বাউলরা। দলে দলে বাউলদের আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংলণ্ড সফর শুরু হয়ে গেল। সাহেবদের দেশ ঘুরে আসার আগে ও পরে একই বাউল গান শুনে দেখেছি, অনেক তফাৎ। তার গায়ে যেন আঠেরো ঘা।
আসলে বাউল গানের কাছে আমাদের খুব বেশী প্রত্যাশা করাটাই ভুল। বাউল গান বাউল গানেরই মতন। আমরা তার থেকে আংশিক আনন্দ পেতে পারি মাত্র। তার বেশী কিছু নয়। সমস্ত পৃথিবীর সভ্যতাই নগরকেন্দ্রিক। আমরা আর ইচ্ছে করলেই গ্রামীণ হয়ে যেতে পারিনা। স্বতঃস্ফূর্ত গানের প্রতি আমাদের অন্তরীণ বাসনা আছে বলেই আমরা বাউল গান বা লোকসঙ্গীতের কাছে গেছি বারবার। কিন্তু মন্দিরের সিঁড়িতে বসা একান্ত বাউলের গান বা ভেসে যাওয়া নৌকোয় মাঝির গান শোনবার সৌভাগ্য আমাদের দু’ একবারই হয়। বারবার পেতে গেলে সব কিছুর মধ্যেই একটা সাজানো ব্যাপার এসে পড়ে। মঞ্চে ওঠবার আগে বাউল প্যান্ট শার্ট ছেড়ে পরে নেয় গেরুয়া পোশাক, শ্রোতাদের দাবিতে মজার গান হিসেবে পরিবেশন করে এইরকম গান: ‘এঁড়ে গরু বেড়া ভেঙে খেজুর গাছে চড়েছে।’
অতি উৎসাহে বাউল বা লোকসঙ্গীত শিল্পীকে আমরা সরিয়ে আনি তার জীবনচর্যা থেকে। তার ফলে স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়ে যায়। ক্রমশ সেও আমাদের কৃত্রিমদ্রব্য সরবরাহ করতে থাকে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই বাস্তব বিশ্লেষণের মধ্যে যেমন সমাজ সত্য আছে তেমনই আর্টের সত্য আছে। বাউলকে যদি তার নিজস্ব সাধন ভজনের জগতে না থাকতে দিই, বারেবারে তাদের টেনে আনি আলোকোজ্জ্বল শহুরে মঞ্চে, আমাদের বিনোদনের কারণে, তবে তারা সাজগোজ কৃত্রিম গায়ন আর চটকদার ভাবভঙ্গিতে গ্রস্ত হবে তাতে সন্দেহ কি? বাউলরা তো কোনওদিন আত্মবিজ্ঞাপনে অভ্যস্ত ছিল না— থাকত আপন আপন ভজন কুটিরে, ঘুরত পথে প্রান্তরে, মেলা মচ্ছবের সম্মিলনে। গানকে জানত তত্ত্ব বলে। তার ছিল তিনটে পর্যায়— আত্মতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব আর দেহতত্ত্ব। এ ছাড়া ছিল দৈন্য ও মনঃশিক্ষার গান। কোথায় গেল সেইসব আত্মগুপ্ত ঠাঁইনাড়া স্বভাবের বাউল সাধক? নবনীদাসের কথা মনে পড়ে। জন্মেছিলেন একশো বছরেরও আগে বীরভূম জেলার গুনুর ভুমরি গাঁয়ে। পিতামহ অনন্ত গোঁসাই। পিতা অক্রূর গোঁসাই। সামান্য লেখাপড়া শিখে দশ বছরে মন্ত্র দীক্ষা চাঁদপুরের খেপি মায়ের কাছে। তারপরে বৈরাগ্য দীক্ষা নারায়ণ গোঁসাইয়ের কাছে। এবারে শুরু হল একসঙ্গে সংসার আর গানের জীবন, ভ্রাম্যমাণ সত্তার পরিক্রমণ। স্ত্রী ব্রজবালা আর বোন ফুরুবালা। একে একে সন্তান হল অন্নপূর্ণা-রাধারানী-পূৰ্ণদাস লক্ষ্মণদাস-চক্রধর।
কিন্তু মানুষটা সংসারী ছিলেন না। গান গেয়ে বেড়াতেন গাঁয়ে গাঁয়ে আর মাঠে মাঠে বাউল তত্ত্ব নিয়ে গানের পাল্লাদারি হত বোন ফুরুবালার সঙ্গে। নবনীদাসের দীক্ষিত শিষ্য ছিল মাত্র দুজন— হরিদাস মহান্ত আর ক্ষুদিরাম দাস। সুদর্শন হরিদাস পরে বিয়ে করেন ফুরুবালাকে, নবনীর সেটা পছন্দ হয়নি। সে যাই হোক, সারাজীবনই নবনী খ্যাপা ঠাঁই বদলেছেন। বিয়ের আগে ছিলেন জয়পুর গ্রামে, সেখানে থেকে উঠে আসেন বসোয়া-বিষ্ণুপুরে। বেশ কিছুকাল ছিলেন নানুরে। পরে ক্রমান্বয়ে বাস্তু গড়েছেন ও ভেঙেছেন— উবরুন্দি চিৎগাঁ, রায়ান-বেলুটি, সিন্দূর, ফতেপুর, কুলেড়া হয়ে পারুলডাঙা, সবশেষে সিউড়ির কেন্দুয়া পল্লিতে এসে দেহ রাখেন। ভবঘুরে স্বভাবের উদাসীন এই সাধকের গান ও জীবনচর্যায় মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ কিন্তু শান্তিনিকেতনে তাঁকে ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর গলায় অসামান্য বাউল গান শহরবাসী কোনওদিন শোনবার সুযোগই হয়তো পেত না; যদি না ঘটনাচক্রে সিউড়ির ডাক্তার কালীগতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হতেন নবনীদাস। গুণগ্রাহী চিকিৎসক কেবল যে তাঁর শরীরের দেখভাল করেছিলেন তাই নয়, তাঁর উদ্যমে নবনী ও পূর্ণ রেডিয়োতে গান করেন, অংশ নেন কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে। বলতে গেলে পঞ্চাশের দশকে সেই প্রথম কলকাতার রসিকদের খাঁটি বাউল গান শোনা। মনে আছে আজও নবনীদাসের সেই মগ্ন গায়ন ও দীন বেশভূষা। তখন গেরুয়ার এত বিলাসিতা আসেনি বাউল সমাজে, ছিল সাদা ধুতির লুঙ্গি আর সাদা মার্কিনের ফতুয়া। এই বর্গের সব সাধক বাউলই এখন দেহ রেখেছেন। তাঁদের নাম ও রূপ অবশ্য অনেকের স্মৃতিতে এখনও ধরা আছে, যেমন ধরা যাক— ত্রিভঙ্গ খ্যাপা, রাধেশ্যাম দাস, চিন্তামণি দাসী, রূপদাসী, হরিদাস গোঁসাই, মনোহর গোঁসাই। গাঁয়ের পর গাঁ পায়ে হেঁটে পার হতেন, কাঁধে কাঁথার ঝোলা নিয়ে। নগ্ন পা, নগ্ন গা। অঙ্গে শুধু ডোর কৌপীন আর তহবন্দ। মাথায় চুড়ো করে বাঁধা চুল, সর্বকেশধারী বৈরাগী। মাধুকরী ছিল একমাত্র ব্রত। প্রসন্ন আনন, শান্ত স্বভাব, স্বল্পভাষী কিন্তু উৎফুল্ল।
