এই সব স্থানের খবর পাইয়া বহু ‘গবেষণা’ করনেওয়ালা ডক্টরেটপ্রার্থী বিদ্বজ্জনের সেখানে ভীষণ সমাগম ঘটে।… কেঁদুলির নিত্যানন্দ দাস তো একদিন আমাকে বলেন বাবা, বৎসরান্তে এখানে আসিতাম। কিন্তু তোমাদের পিস্তলের মতো পেন্সিল ওঁচানো দেখিয়া স্থানটা ছাড়িতে হইল।
এখন দৃশ্যটা আরও ঘোরতর। কেবল পেন্সিল-ওঁচানো গবেষক নয়, নাগরিক ফোটোগ্রাফারের ফ্ল্যাসবাল্বের ঝলক, টেপরেকর্ডারের আমদানি, ভিডিও রেকর্ডিং ও কর্ণভেদী মাইক সবই দেখা যাবে। অমিত গুপ্ত তাঁর ‘বাংলার লোকজীবনে বাউল’ বইতে হালের রাঢ় খণ্ডের বাউলদের নাম সাকিনের পরিচয় রেখেছেন। তাঁর সংগৃহীত একটা সদ্যকালের গান হল ‘কৃষ্ণ নামের মিষ্টি চুরুট/ মুখে রাখো সর্বক্ষণ।’ এই একটা গানের বাণী ধরে আমরা হালফিলের বাউল জগতে (বিশেষত রাঢ়ের) ঢুকে পড়তে পারি। আদিত্য মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ধর্ম ও সংস্কৃতির আলোকে বাউল’ বইয়ে এমনতর কৃষ্ণনামের মিষ্টি চুরুট খাওয়া বাউলদের বিবরণ দিয়েছেন।
তিনি জানাচ্ছেন গৌরখ্যাপা বিদেশ ঘুরে এসে বাড়ি করেছেন, মোটর সাইকেল চেপে ঘুরছেন। হাতে বিদেশিনীর দেওয়া সোনার হাতঘড়ি। পবনদাসের গানের শুরু ট্রেনের কামরায়, ১৯৮৮ সালে তিনি ‘বিদেশিনী মিমলু সেনের সঙ্গে প্যারিসে। সাধক জীবন তাঁর শেষ।’ লাভপুরের ধনডাঙার কার্তিক দাস, শৈশবে গ্রাম্য যাত্রাগানে বিখ্যাত ছিলেন। এখন ‘ডিস্ক ক্যাসেট বিদেশ সব হয়ে গেছে।’ কৃষ্ণবাহাদুর থাপার জন্ম নেপালে, থাকেন পানাগড়ে। ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে স্ত্রী আর পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে কেঁদুলি মেলায় আসেন এবং মনোহর খ্যাপার আখড়ায় গান শুনে মজে যান। তারপরেই কণ্ঠে নেন বাউল গান। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কানাডা, ফ্রান্স ঘোরা বাউল কৃষ্ণবাহাদুর এখন প্রয়াত। ‘বিশ্বনাথ বাউলের বড় ছেলে আনন্দও এক বিদেশিনীর (৪৩-এর বেশি বয়সের জার্মান মহিলা কেরিন) প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে পুনরায় ফিরে এসেছে ঘরে।’ বাংলার বাউল বলতে কি এঁদের প্রসঙ্গকে গণনায় আনতে হবে?
শেষ পর্যন্ত বাউল কি তবে একটা মনগড়া মিথ? একটা আশ্চর্য জীবনযাপনের ধরন? বিদেশের বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে বাউল— ‘Child of Transcultural Studies’। সে ‘Sings and dances mad songs of ecstacy’। ব্যাপারটা প্রকৃতপক্ষে কি তাই? আমাদের অবশ্য ভিন্নতর অভিজ্ঞতা আছে। বলবার কথা সেটাও। রাঢ়ের বাউলদের অর্থ কীর্তি সচ্ছলতার বাইরেও তো একটা বৃহৎ বঙ্গ আছে। বর্ধমানের একটা অংশ, নদিয়া আর মুর্শিদাবাদ জুড়ে সাধক বাউলদের অভাব কই? তাঁরা বিদেশেও যান না, সিন্ধু পারের সুন্দরীরা তাঁদের সাধনভ্রষ্টও করেন না। অখণ্ড নদিয়ার খণ্ডিত অংশ, যা আজ বাংলাদেশ, তা তো বাউল গানের স্বচ্ছ স্রোতেবেগে প্রাণবান। সীমান্ত পেরিয়ে তার কিছু সুবাস আজও পাই। বাউলদের তো কোনও দেশগত বেড়া নেই। তাই এ বাংলার বাউল আসরে ও মেলায়, ও-বাংলার বাউলদের কত গান আমরা শুনি। তবে সে গানের ধরন ধারণ আলাদা। নৃত্যবিরল ভাবময় সেসব বাউল গান একটু অন্য ধাঁচের, হয়তো সুর কাঠামোটাও একটু স্বতন্ত্র।
এইখানে একটু খোলামেলা কথা বলতেই হবে। কলম-ওঁচানো গবেষকবৃন্দ যতই না কেন নিন্দিত হন তবু বাউলদের নিয়ে কাজের কাজ তো তাঁরাই কিছু কিছু করেছেন, করে চলেছেন। এদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধর্মপ্রতিষ্ঠান বা সমাজসেবী সংস্থা বাউলদের জন্য তেমন কিছু করেছেন বলে তো শুনিনি।
এটাও মনে রাখতে হবে, বাউল সুর বলে স্পষ্ট, নির্দিষ্ট কোনও কাঠামো নেই। অঞ্চল ভেদে তা আলাদা। বাউলদের সম্পর্কেও এ কথাটা বলা চলে। অঞ্চল ভেদে তাদের ধরনধারণ জীবন প্রণালী আলাদা। সেইজন্যই রাঢ়ের বাউলদের সঙ্গে কুষ্টিয়ার বাউলদের খুব গভীর মিল খোঁজা নিরর্থক। আবার রাঢ়ের বাউলদের ঘনিষ্ঠ যেমন সহজিয়া বৈষ্ণবরা, নদিয়া মুর্শিদাবাদে তেমনই বাউলদের গায়ে গায়ে রয়েছে ফকিররা। বাউল আসলে তবে কি এক সমাধানহীন দ্বৈত? তার জীবনের কবোষ্ণ তাপ, তার পোশাকের মণ্ডন-ধর্ম, তার গানের উদার মানবিকতা, তার বন্ধনহীন পথচলা— এক অলক্ষ্য অন্বিষ্টর মতো। বাংলার বাউল যেন এক মগ্ন স্রোত, তার চোরা টানে প্রতিদিন আমাদের অবশ্যম্ভারী অবগাহন চলছে।
কিন্তু সেই অবগাহনের মধ্যে রয়ে যাচ্ছে ফাঁক ও ফাঁকি। এটা ততদিন ছিল না যতদিন বাউল ফকিররা তাদের নিজেদের পরিবেষ্টনীর মধ্যে থাকতে পেত, নিজেদের মতো আত্মমগ্ন সাধনার পথে। সত্তর-আশির দশক থেকে হঠাৎ শহরবাসী মধ্যবিত্ত এ-বর্গের গান সম্পর্কে এবং বেশি করে এদের জীবনধারা সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে ওঠে। তার সবটাই হুজুগ বা গিমিক নয়। আসলে নাগরিক জীবন ও তার বিনোদনের উপকরণগুলি কৃত্রিম আর ক্লান্তিকর হয়ে উঠছিল ক্রমশ— বাংলা গানও একটা পুনরাবৃত্তির ছকে ঢুকে পড়েছিল। কাজেই একটা নতুন স্বাদ আর পরিবর্তন সবাই চাইছিলেন। আমাদের সাবেক ইতিহাসতত্ত্বের ধারণা ও ইতিহাস চর্চাও খুঁজছিল এক নতুন পথরেখা— তাই লুপ্ত অথবা ক্ষীণ গৌণধর্মগুলির শিকড়সন্ধানে ব্রতী হতে চাইলেন অনেক ইতিহাসসন্ধানী। জেগে উঠল শত জল ঝরনার ধ্বনি।
সেইসঙ্গে এই সময়খণ্ডে একটা নতুন জিনিস হল— বাউলদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে গান শোনাতে আগ্রহী হলেন কেউ কেউ। তাঁরা আমেরিকাবাসী বাঙালি। বলা বাহুল্য তাঁদের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল না সেদেশে ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ বা বৈরাগ্যবাণী প্রচার করা। পূর্ণদাস ও অন্যান্য ক’জনের গানে বিদেশে কিন্তু একটা ভুল বার্তা পৌঁছে গেল। শতবর্ষ আগে শিকাগোয় স্বামী বিবেকানন্দ যে-বেশ ধারণ করে তাদের মাতিয়েছিলেন, সেই গেরুয়া আলখাল্লা লুঙ্গি পাগড়ি ও কোমরবন্ধধারী বাংলার বাউল তাদের তারসপ্তকের উচ্চনিনাদে ও বৃত্তাকার নাচে কোনও কোনও বিদেশির মন মজাল। তারা এবার ঘন ঘন দেখতে চাইল বাউলদের— হঠাৎ বাউল-অনুরাগী বিদেশিদের সংখ্যা বেড়ে গেল। সাধন-সর্বস্ব একটি সম্প্রদায়কে হতে হল পারফরমার।
