এমন মারাত্মক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করে সবশেযে উপেন্দ্রনাথ দুটি সিদ্ধান্তে এসেছেন। প্রথমত, ‘ক্ষিতিমোহন বাবর গান কয়টি সারা বাংলায় প্রাপ্ত বাউল গান হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ের।’ দ্বিতীয়ত, ‘বাংলার বাউলদের যে সাধন তত্ত্ব ও সাধন পদ্ধতির কথা ক্ষিতিমোহনবাবু তাঁহার দুইটি প্রবন্ধে বলিয়াছেন, তাহা বাংলায় বর্তমানে যে বাউলদের দেখিতেছি ও যাহাদের গান পাইতেছি, তাহাদের সম্বন্ধে ঠিক খাটে না।… বাংলার বাউলদের সম্বন্ধে এই মতবাদগুলি তিনি কোথায় পাইলেন?’ অভিযোগ দুটি গুরুতর। সেই সঙ্গে ক্ষিতিমোহন সংগৃহীত গানগুলির বাণী বিষয়ে উপেন্দ্রনাথের মন্তব্য: ‘বাংলা সাহিত্যের সহিত যাঁহারা পরিচিত, তাঁহারা একবার পড়িলেই বুঝিতে পারিবেন যে এই গানগুলির মধ্যে যথেষ্ট “আধুনিক হস্তক্ষেপ” আছে এবং ইহা পল্লীর অশিক্ষিত বা সাবেকী ধরণের অশিক্ষিত বাউলদের রচনা নয়।’ সাধারণ পাঠকদের অবগতির জন্য উপেন্দ্রনাথের সন্দেহসংকুল কয়েকটি মন্তব্য উদ্ধৃত করছি—
১) ‘নিঠুর গরজী, তুই কি মানসমুকুল ভাজবি আগুনে।’ (উপেন্দ্রনাথের মতে মানসমুকুল এই সমাসবদ্ধ অলংকার সৃষ্টি আধুনিক রচনারীতি। তেমনই সন্দেহজনক, গানের অন্তর্গত ‘যুগযুগান্তে’ এবং বেদনা না লিখে ‘বেদন’ শব্দের ব্যবহার)
২) ‘হৃদয়কমল চলতেছে ফুটে কত যুগ ধরি। তাতে তুমিও বাঁধা আমিও বাঁধা উপায় কি করি।’—এ গানের দার্শনিকতার সঙ্গে বাংলার বাউল ধর্মের কোনও যোগ নেই, এ রচনাভঙ্গিও সম্পূর্ণ আধুনিক কালের— অভিযোগ উপেন্দ্রনাথের।
৩) ‘তারে অরুণ এসে দিল দোলা রাতের শয়নে’— (‘লাইনটি নিতান্ত অতি আধুনিক গন্ধী’)।
৪) ‘আমার ডুবলো নয়ুন রসের তিমিরে/ কমল যে তার গুটালো দল আঁধারের তীরে। উপেন্দ্রনাথের মন্তব্য: ‘এইরূপ বাক-চাতুর্য ও কল্পনা আধুনিক কালের কবিদের রচনা ছাড়া বর্তমানে বাউলদের গানে মিলে না, তাহা এই পনেরো-ষোল বছর ধরিয়া প্রায় দেড় সহস্র বাউলগান সংগ্রহ ও পর্যালোচনার অভিজ্ঞতার ফলে বুঝিতে পারিতেছি।’
এমন স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ এবং ভয়ানক অভিযোগ সম্পর্কে আমরা নিজস্ব কোনও মতামত বা নতুন বিতর্ক তুলব না। কেবল ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ তৃতীয় খণ্ডে ব্যক্ত অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য পেশ করব। তিনি বলছেন:
এই গানগুলির প্রামাণিকতা সম্বন্ধে ডঃ ভট্টাচার্যের সংশয় নিশ্চয় সুধীজনের চিন্তা উদ্রেক করিবে… অবশ্য অবিশেষজ্ঞ হইয়াও বলিতে বাধা নাই যে, উল্লিখিত চার ও পাঁচ সংখ্যক গান (‘আমি মজেছি মনে/ না জানি মন মজল কিসে আনন্দে কি মরণে’ এবং ‘আমার ডুবলো নয়ন রসের তিমিরে’) দুইটির ভাব ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিমা আধুনিকমনা সুশিক্ষিত ব্যক্তির রচনা বলিয়া মনে হইতেছে।
অনির্ণীত এবং অমীমাংসিত এক সমস্যা বাংলার বাউল গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এর থেকে সন্দেহ না জেগে পারে না যে, বাউল গান বলে বিপুলাকার সংকলনবদ্ধ যে অজস্র গান আমরা হাতে পেয়েছি তার সব প্রামাণিক ও খাঁটি বাউলের রচনা তো? কথাটা ওঠে আরও এজন্য যে, উনিশ শতকে ‘সখের বাউল’ নামে একাধিক বাউল বা বাউলের দল প্রচুর গান লিখে গেয়ে বেড়াতেন। তার সবচেয়ে সফল নমুনা মেলে কাঙাল হরিনাথ বা ফিকিরচাঁদের গানে। বাউল না হয়েও তিনি উৎকৃষ্ট বাউল গান লিখেছেন। বাংলার বাউলগানের ধারা এ সব গানেও সম্পন্ন ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত বাউল গান— সাধনা-লব্ধ ও পরম্পরাজাত ক্রমশ নকলের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
‘বাংলার বাউল’ কথা দুটি যতটা উত্তেজক ও আকর্ষণময়, তেমনই অতল আর সমস্যাবহুল। বাউল কে, বাউল কী, বাউল কোথা থেকে, কবে থেকে, এ সব প্রশ্ন যদি বা মেটে তারপরে নতুন প্রশ্নের জট তৈরি হয়। আঠারো উনিশ শতক থেকে দীপ্যমান বাংলার বাউল বিশ শতকের রসিক ও বুদ্ধিজীবীদের আগ্রহ ও গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। এককালে ভদ্রলোকশ্রেণি তাদের ঘৃণার চোখে দেখেছেন, নৈষ্ঠিক মুসলমানরা ফতোয়া জারি করেছেন ধ্বংসের, তবু তারা নানা লোকায়ত বর্গের ধারার সঙ্গে গা ঢেলে দিয়ে অবিনাশী উদ্ভিদের মতো বেঁচে বর্তে আছে। একেবারে হালফিল, দু’-এক দশক, বাংলার বাউল সারাদেশে ও বিদেশে অভূতপূর্ব মান্যতা পাচ্ছে। এরা যতটা বাউল সাধক তার চেয়ে বড় গায়ক। যেমন পূর্ণদাস, পবনদাস বা আরও অনেকে। ব্যঙ্গ করে এদের বাংলার বা ভারতের সাংস্কৃতিক রপ্তানিযোগ্য বলেছেন কেউ কেউ। সেই অত্যুক্তি না হয় আমরা গায়ে নাই-বা মাখলাম, কিন্তু বাংলার বাউল নিজের মোপেডে ঘুরবেন, সঙ্গে বিদেশিনী, দৃশ্যটি বেশ অভিনব। অভিনব, কেননা আবহমান বাউলের সাধনা তো মগ্নতার, আত্মগোপনের। তাঁরা ভিক্ষাজীবী, আখড়াধারী বা গরিব গৃহী। বাউলরা বরাবর নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থেকে কায়সাধনা ও গান গেয়ে এসেছেন। বাসাছাড়া পাখির মতো বন্ধনহীন তাঁদের জীবনে পথ চলাতেই সমধিক আনন্দ। আর ছিল কতই মেলা— কেঁদুলি, রামকেলী, দধিয়া বৈরেগীতলা, পাথরচাপুড়ি, সোনামুখি, কোটাসুর, অগ্রদ্বীপ, ঘোষপাড়া। ওদিকে মানভূমের খাতরা, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়ে, রাজশাহীর খেতুরী বা প্রেমতলী। এসব মেলায় সারা দেশের বাউলরা এসে মিলতেন, গান হত সারারাত— তত্ত্বগান, ভাবগান, ফকিরি গান, শব্দগান। আবার মনঃশিক্ষা বা আখেরিচেতনের গান, ‘দৈন্যতা’র গান, দেহতত্ত্ব। ছিল কেন, এখনও সবই আছে তবে মর্যাদাবান হয়ে নেই। মেলার আসরে রসিকের চেয়ে দর্শক বেশি, তত্ত্বজ্ঞের চেয়ে গবেষক বেশি, একতারার চেয়ে ক্যামেরা বেশি। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার বাউল’ বইয়ে ক্ষিতিমোহন সেন লিখেছিলেন:
