একটি সত্য এই যে মানুষের শরীরে দুটি চেতক এন্টিজেন আছে যা শরীরের প্রতিরোধ পদ্ধতির (Immunological system) অন্তর্ভুক্ত নয়। এই দুটি হল চোখের জলের জলীয় পদার্থ বা অশ্রু এবং বীর্য। আমাদের চোখের জলীয় অংশ বা শুক্রের অংশ কোনক্রমে রক্তে মিললে বিশেষ এন্টিবডি উৎপন্ন করতে পারে। সম্ভবত ঐ বীর্যপানরত পুরুষ নিজের বীর্যদ্বারাই শরীরে এন্টিবডি উৎপন্ন করবে এবং তাতে শুক্রাণুর উৎপাদন অবশ্যই অল্প হবে। তাই দেখা যায়, বাউলদের সন্তান সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। তবে স্মরণযোগ্য, নারী কখনও এই বীর্যপান করে না।
বাউল মতের আন্তঃশরীরে যৌন যোগাচারের লক্ষণ যেমন স্পষ্ট তেমনই শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। উভয়ক্ষেত্রেই গুরুর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। এই দুই দিক বিবেচনা করলে বাউল মতে সহজিয়া বৈষ্ণব ও সুফিতত্ত্বের প্রভাব চোখে না পড়ে পারে না। গুরুর নির্দেশে যোগক্রিয়া ও মৈথুন বাউলবর্গের লোকধর্ম সম্প্রদায়কে বিশিষ্টতা দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সফল প্রয়োগের ফলে খাঁটি বাউলদের সন্তান জন্মায় না। অনেক বাউলধারা আছে যেখানে গুরুর শিষ্যরাই পরম্পরা বজায় রাখেন। সন্তান-পরম্পরার চেয়ে শিষ্য-পরম্পরা তাই বাউলদের কোনও কোনও স্রোতে প্রাধান্য পায়। বাউলরা বিশ্বাস করেন, দেহভাণ্ডে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিরূপ রয়েছে এবং আত্মা কোনও অলৌকিক বস্তু নয়, তার উপলব্ধি ও উপস্থিতি দেহেই লভ্য। সেইজন্যই বাউলগান প্রধানত দেহতত্ত্বের গান। নিজের দেহকে জানা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা, তার মধ্যে দিয়ে আনন্দস্বরূপের আস্বাদন— এসবই বাউলের লক্ষ্য। তারই নানা ইঙ্গিত ও দ্যোতনা রয়ে গেছে কয়েক শতকের বাংলা গানে। ভাবের দিক থেকে তাই বাউল গান নানা মাত্রায় বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছে। লালশশী, লালন, পাঞ্জু শাহ, হাউড়ে গোঁসাই, কুবির, যাদুবিন্দু, জালাল, দীন শরৎ, রশীদ, দুদ্দু, রাধারমণ, ফুলবাসউদ্দিন, দুর্বিন শাহ, পদ্মলোচন, শীতলাং শাহ, হাসন রজা থেকে আজ পর্যন্ত প্রবাহিত বাউলবর্গের গান আমাদের সগর্ব অর্জন। এঁদের সবাই হয়তো পরম অর্থে বাউল নন, কিন্তু বাউলদের কাছে শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণীয়। আরেকটা সত্য হল, বাঙালির সামাজিক ইতিহাসে বাউলদের আচরণ ও চারচন্দ্র নিয়ে তর্ক বা মতান্তর থাকলেও বাউল গান নিয়ে কোনও তর্ক ওঠেনি। নিম্নবর্গ থেকে উচ্চবর্গ পর্যন্ত বাউলগানের স্বতঃস্ফূর্ত চলাচল চলছে প্রায় শতবর্ষ ধরে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও বাউল গানের ভাবমুল্যে ও ছন্দে আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং দেশবাসীকে প্রথম সচেতন করেছিলেন বাউলগানের নিজস্বতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে তিনি যে সব অভিনব স্বদেশি গান লেখেন তার সুরকাঠামোয় বাউল গানের স্পন্দ ও উদ্দীপনা অত্যাশ্চর্য নৈপুণ্যে ব্যবহার করেন। পরে তাঁর গানে বাউল গানের অন্তর্জগতের গভীর বাণী ছাপ ফেলেছে। তাঁর কোনও কোনও রচনাকে তিনি এমনকী ‘রবীন্দ্রবাউলের রচনা’ বলে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর নাটকে বাউল চরিত্র সর্বদাই একক, তার নারীসঙ্গিনী নেই। অথচ বাউলের সাধনা সর্বদাই যুগলের রসরতি।
এই প্রসঙ্গে একটা বিতর্কযোগ্য প্রসঙ্গ সেরে নেওয়া যেতে পারে। ববীন্দ্রনাথের প্রণোদনায় ক্ষিতিমোহন সেন মধ্যযুগের সত্তসাধকদের সাধনার স্বরূপ সন্ধানে ব্যাপৃত হন এবং সেই সূত্রে বাংলা বাউলদেব লুপ্তস্রোতের কিছু পরিচয় ব্যক্ত করেন লেখালেখি করে। ১৯৪৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লীলা বক্তৃতায় তিনি বিষয়রূপে বেছে নেন ‘বাংলার বাউল।’ তাঁর লেখায় পূর্ব ও উত্তরবঙ্গের বহু অজানা বাউলের খবর মেলে। যেমন কুষ্টিয়ার পাঁচু ফকির, রাজবাড়ির মেছেলচাঁদ, ঢাকা জেলার শাহনাল, ধামরাই টাঙাইলের পাগলচাঁদ। তার মতে: ‘বাংলা ভাষার আরম্ভ হইতেই বাউলের পরিচয় মেলে। তবে গুরু পরম্পরা একবার খোঁজ করিয়া (১৮৯৮ সাল) ১২/১৩ পুরুষ পর্যন্ত কোন মতে পাইয়াছিলাম।’ ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন তিনি কাশীতে প্রথম বাউল দেখেন নিতাইকে, পরে ঢাকা জেলার রাজবাড়িতে পরিচয় হয় দাশু বাউলের সঙ্গে। দাশুর আখড়ায় পরিচয় ঘটে দুর্লভ ও বল্লভের সঙ্গে ‘তাঁহাদের কাছেই আমি বড় বড় দুইটি বাউলধারা ও বহু বাউল গানের সন্ধান পাই।’ যাই হোক ক্ষিতিমোহন সেন তাঁর ভাষণে মদন, ঈশান যুগী, গঙ্গারাম, বিশা ভূঁইমালি, জগাকৈবর্ত প্রমুখের হালহদিশ দেন। তাঁদের গানের নমুনা পেশ করেন। এঁদের বাউল পদাবলি পড়ে রবীন্দ্রনাথ আকৃষ্ট হয়ে ক্ষিতিমোহনকে বলেন— ‘এমন সহজ এমন গভীর, এমন সোজাসুজি সত্য এত অল্পকথায় এমন অপূর্বভাবে প্রকাশ করিবার শক্তি আমাদেরও নাই। আমার তো ইঁহাদের রচনা দেখিয়া রীতিমতো হিংসা হয়।’
রবীন্দ্রনাথের ঈর্ষাযোগ্য এমন বাউলপদ পরে কয়েকটি রবীন্দ্র বক্তৃতায় ও রচনায় উদ্ধৃত হয়েছে। বাকি সংগ্রহ যা ক্ষিতিমোহনের ছিল তা তিনি প্রকাশ করতে চাননি। চারু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গবীণা’-য় ক্ষিতিমোহন সংগৃহীত ন’খানি বাউলগান সম্পূর্ণ মুদ্রিত হয়েছিল। বাংলার বাউলদের সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত ও সুবৃহৎ বইটি যার লেখা সেই উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য নির্দ্বিধায় ঘোষণা করেছেন যে ক্ষিতিমোহন সংগৃহীত গানগুলি নির্ভরযোগ্য বাউল গান নয়, তাঁর কথিত বাউলদের অস্তিত্ব ও বিবরণ সন্দেহজনক। উপেন্দ্রনাথের প্রশ্ন ও মন্তব্য একটু তুলে দিচ্ছি— ‘বাংলার এ কোন্ অবাস্তব বাউলদের কথা তিনি আমাদিগকে শুনাইতেছেন? ইঁহারা কাহারা? কোথায় ইঁহাদের বাড়ি? ইঁহাদের কি কখনও বাংলায় আবির্ভাব ঘটিয়াছিল?’
