এখানে বাউলদের গায়ে গায়ে জড়িয়ে আছে ‘ফকির’ শব্দ। শরিয়ত-সন্দিহান মুসলমানরা যখন মারফতি পথ বেছে নেয় তখন তাদের ফকির বলে। একসময় তাদের বাউলদের সঙ্গে এক উচ্চারণে শনাক্ত করা হয়েছে। খুব একটা বিতর্কের ঝুঁকি না নিয়ে আমরা বরং বলি যে বীরভূমের বাউল বা রাঢ়ের বাউলদের সঙ্গে উত্তর ও মধ্যবঙ্গের ফকিরদের অনেক ফারাক। দুজনের সামাজিক ভূমিকা কি আজ এক রকমের? পায়ে হেঁটে খোলাচোখে দেখেছি রাঢ়খণ্ডে বাউলরা জনজীবনের স্বাভাবিক ও অচ্ছেদ্য অংশ। তারা ভিক্ষা পায়, বৈষ্ণব সমাবেশে সাদর আহ্বান পায়; গান গাইতে প্রতীচ্যে যায়, তাদের প্রভূত মান্যতা। তুলনায় নদিয়া-মুর্শিদাবাদের বাউল ফকিররা অনেক নিম্নবর্গে, সামাজিক হীনতা নিয়ে দারিদ্র্যে দুঃখে বেঁচে আছে। কিন্তু কণ্ঠে তাদের গানের জোয়ার। সিউড়ির কাছে সাম্বৎসরিক পাথরচাপুড়ির মেলায় ফকিরদের মর্মন্তুদ দারিদ্র্য ও গীতিমুখরতা একই সঙ্গে দেখা যায়।
আমি বোঝাতে চাইছি, বাংলার বাউল বলতে কোনও স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ধারণা করে নেওয়া জটিল কাজ। তাদের স্বরূপ স্বভাব ও ক্রিয়াকরণ যেন নানা কাপড়ের টুকরোয় বানানো দরবেশি পোশাকের মতো বিচিত্র ও বর্ণিল। নানা ধারা মিলে মিশে বাউল ধরন গড়ে উঠেছে। আজ তাকে প্রত্যক্ষ সংজ্ঞার সীমায় বাঁধা ঠিক হবে না। মধ্যপন্থী ও বিবেচক পণ্ডিতরা তাই সিদ্ধান্ত করেছেন যে মধ্যযুগীয় বাংলায় নানা রকম লোকায়ত ও শাস্ত্রবিরোধী ধ্যানধারণা বাউল মতের পরিবর্ধন ও প্রসাধনে সাহায্য করেছে। বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব সহজিয়া, নাথপন্থ, তন্ত্র ও সুফিবাদ মিলে মিশে এক অদৃশ্য দ্রবণে জন্মেছে বাউল ফকিরদের রূপময় জগৎ। আত্মার চেয়ে দেহ, জাতিবর্ণ দ্রোহ, মন্দির মসজিদের চেয়ে গুরুর নির্দেশ, শাস্ত্রের চেয়ে আত্ম-অনুজ্ঞা— এই দেশে তো নতুন নয়। হয়তো সেই লোকায়তিক পরম্পরার এক সমৃদ্ধ উদ্ভাস বাংলার বাউল। সাধারণভাবে ক্রিয়াকরণ, গানের অন্তর্জগৎ বা আচরণ থেকে বাউলদের সকলে চিনে নিতে পারেন। কিন্তু তাঁরা আত্মসাবধানী, সন্ধ্যাভাষী, ইঙ্গিতগ্রাহী। আপন মর্মকে তাঁরা ধর্মের ক্রিয়াপরতায় বোঝাতে চান না। তবে তাঁদের বহির্বাস খুব ইঙ্গিতধর্মী ও সুনির্দিষ্ট। কর্তাভজা-সাহেবধনী-বলরামীদের কোনও নির্দিষ্ট পোশাক নেই। বৈষ্ণব সহজিয়ারা সাধারণত সাদা পোশাক পরেন। কিন্তু বাউলদের একটা নির্দিষ্ট বহিরাবয়ব আছে। বেশ কিছুকাল আগেকার একটা বর্ণনা থেকে বাউলদের বিবরণ উদ্ধৃত করছি—
কেশ বিন্যাস দেখিলেই বিলক্ষণ চিনা যায়। পরিধানে গেরুয়াবসন, হস্তে লৌহবালা, বগলে দীর্ঘ চিমটা, গলে পাথুরিয়া মালা, আর একটা হুঁকাতে লম্বা নল লাগানো, তাহাতে এক কলিকা গাঁজা সাজিয়া, জয় বোবুম বোবুম গুরু সত্য বলিয়া চক্ষু দুইটি মুদ্রিত করিয়া, সেই গাঁজায় দোম দিতে থাকে।
অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ বইতে একশো বছর আগেকার বাউলদের বর্ণনা দিয়ে গেছেন এই রকম—
এই সম্প্রদায়ীরা তিলক ও মালা ধারণ করে এবং ওই মালার মধ্যে স্ফটীক, প্রবাল, পদ্মবীজ, রুদ্রাক্ষ প্রভৃতি অন্যান্য ও বিনিবেশিত করিয়া রাখে। ডোর কৌপিন ও বহির্বাস ধারণ করে এবং গায়ে খেলকা পিরাণ অথবা আলখাল্লা দিয়া ঝুলি, লাঠি ও কিস্তি সঙ্গে লইয়া ভিক্ষা করিতে যায়।… ক্ষৌরি হয় না, শ্মশ্রু ও ওষ্ঠলোম প্রভৃতি সমুদয় কেশ রাখিয়া দেয় এবং মস্তকের কেশ উন্নত করিয়া একটি ধম্মিল বাঁধিয়া রাখে।
অক্ষয়কুমারের এই বর্ণনায় একটা বড় ফাঁক থেকে গেছে। বলা হয়নি যে এসবের সঙ্গে থাকে বাউলদের অচ্ছেদ্যসঙ্গী একতারা ও ডুগি, খমক, সারিন্দা বা দোতারা। কেউ কেউ গলায় কণ্ঠি পরেন, কেউ করেন তিলকসেবা। সেই সঙ্গে থাকে নারীসঙ্গী এবং কণ্ঠে ভাবের গান, যার বাণীতে-কূট রহস্যের অতল ব্যঞ্জনা। বাংলা গানের সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ধারাবাহিকতায় বাউলরা এক ধরনের গান সংযোজন করে চলেছেন, যা এই সম্প্রদায় লুপ্ত হয়ে গেলেও থেকে যাবে। কিন্তু বাউলদের পরিচয় একটু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা জরুরি। প্রথমে তাঁদের বহির্বাস প্রসঙ্গে লক্ষ করা যেতে পারে।
বাউল ফকিরদের জীবনের সঙ্গে বহুদিন সংসর্গকারী সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ১৯৮৭ সালে আমাকে এক ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন যাতে তাঁর কতকগুলি নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এখানে প্রাসঙ্গিক বলে প্রকাশ করছি। সিরাজ লিখেছিলেন: ‘যে বাউলমেলায় তেরাত্তির কাটিয়েছিলাম তাদের অনেকের পরনে গায়ে হলদেটে লাল, কারুর বা স্রেফ গৈরিক, কারুর তালিমারা (সংখ্যাও নাকি ওদের রহস্যময় সংখ্যাবাচক), কারুর সাদা এবং কারুর কালো পোশাক ছিল। পূর্ণদাস প্রমুখ শৌখিন শহুরে বাউলের যে পোশাক তা একান্তভাবে সুফি পোশাক, বৈরাগ্যের প্রতীক গৈরিক, এই Cliche-টি নিছক কবিকল্পনা, সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ-সূত্রে এর প্রাদুর্ভাব। হিন্দু সাধুর পরনে সেলাই-করা পোশাকের আগমন এ যুগে বলেই মনে হয়। কারণ হিন্দুশাস্ত্রে সেলাই করা পোশাক নিষিদ্ধ ছিল। লক্ষ করবেন দর্জি শব্দের কোনও বিকল্প শব্দ ভারতীয় প্রাচীন ভাষায় নেই। সীবনকার অর্বাচীন কৃত্রিম শব্দ।’
বাউলদের ব্যাপারে দ্বিতীয় যে-চিন্তাভাবনা বহু মানুষের মনে তাঁদের সম্পর্কে কৌতূহল অথবা ঘৃণা টেনে এনেছে সেটা ‘চারিচন্দ্রভেদ’ অর্থাৎ মল মূত্র রজ বীর্য পান। বাউল তো শুধু নয়, আমাদের কায়াবাদী সাধকদের অনেকে ‘দুইচাঁদ’ (মলমূত্র) বা চার চাঁদের চর্চা করেন। এ তো বহু শত বছরের ধারা। এককালে বাউলদের ‘মুতখেকো’ বলা হয়েছে। তাঁদের এই বিচিত্র সাধনাকে ‘কদর্য’ ‘বীভৎস’ ‘জঘন্য’ এইসব নিদাত্মক বিশেষণে ঘৃণা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে শেষ কথা বলা কঠিন। সভ্যরুচি ও উন্নত জীবনবোধ দিয়ে সব কিছুর মীমাংসা করা যায় কি? বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘বাউলদের যৌনজীবন ও জন্মনিয়ন্ত্রণ’ বলে একটা রচনা থেকে এখানে উদ্ধার করছি। বলা হচ্ছে:
