মূলত তত্ত্বভিত্তিক হলেও বাউল গানের… সুর ছন্দ, অর্থ ও ব্যঞ্জনায় শুধু রস বিস্তারই নেই অন্য আবেদনও আছে। বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমজীবী সবার কাছেই বাউল গান গ্রহণীয়। বাউল গানের ক্ষেত্র ও পরিসর সমাজের পটভূমিতে তাই এত বিস্তৃত।
ভূমিহীন এই সম্প্রদায়ের মূলজীবিকা ছিল মাধুকরী। সারাদিন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে যা উপার্জন করত তা দিয়েই তাদের গ্রাসাচ্ছাদন হত। এদের ঘর বাড়িও ছিলো না। আখড়া বা সাময়িক আস্তানা গড়ে এখানে-ওখানে বসবাস করত। আজকের চিত্রটা ভিন্ন।… জীবিকা হিসাবে বাউল বেছে নিয়েছে গানকে। প্রভাব ফেলেছে। রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা। বিদেশের হাতছানিও বাউলকে প্রভাবান্বিত করেছে।… কৃষিজীবীদের পৃষ্ঠপোষকতার স্থান আজ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের হাতে, বাউলদের ক্ষেত্রে। বাউলদের সাধন-জীবনের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশী মূল্যায়ন হয়েছে বাউল গান ক্ষ্যাপা জীবনের নির্যাস, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প পণ্য-ক্রেতাদের কাছে।
এখনকার বাউল তথা বাউলজীবন বিষয়ে আধুনিক যুবক-যুবতীদের অনেকে বেশ উৎসাহী। বীরভূমের নানা বাউল সমাবেশে, বিশেষত কেঁদুলির মেলায়, নবীন বয়সের ছেলেমেয়েদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। তার সবটাই লোকদেখানি বা অগভীর নয়। বাউলগানের ভেতরকার একটা অনতিব্যক্ত উচ্চারণের ধরন এখনকার কবিদের খুব টানে। বাউলদের অবাধ জীবনযাপনের মুক্তছন্দ, তাদের ছকভাঙার দুঃসাহস, সমাজবন্ধনের প্রতিবাদী স্বাধীন ঘোরাফেরা অনেককে আকর্ষণ করেছে। যেমন সাতকেঁদুরির তরুণ কবি লিয়াকত আলি। এক সময় ছিলেন উদাম বিস্ফোরক রাজনীতিক ঢেউয়ের শীর্ষে। জেল থেকে ফিরে সংস্কার-মুক্ত প্রতিবাদী মনটাকে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শে তেমনভাবে আর রাখতে পারছিলেন না লিয়াকত। সেই সময় বীরভূমের নানা বাউলদের ঠেকে ঘুরে পেয়ে যান চমৎকার এক মানসিক আশ্রয় ও মানবিক আস্থার উৎস। লিয়াকত নিজে বাউল নন, কিন্তু সেই স্রোতোধারার স্বচ্ছ জলে স্নান করে শুদ্ধ। বাউলদের সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণে তাই একটা অন্য বিবেচনা ধরা পড়েছে। লিয়াকত লিখেছেন:
নারী পুরুষের সম্পর্ক একটাই সেটা যৌনসম্পর্ক। এটাই প্রাকৃতিক সম্পর্ক। যা প্রাকৃতিক তাই ধর্ম, তাই সত্য, এর ভালমন্দ ন্যায় অন্যায় হয় না। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর নারীপুরুষের সম্পর্ক একরকম। একমাত্র মানুষই নারী ও পুরুষের এক ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্ক স্বীকার করে নিয়েছে। যেহেতু ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্ক প্রাকৃতিক নয়— মানুষের বানানো— সেহেতু এর ভুলভ্রান্তি সম্ভব।… বাউলরা এই সত্যটা জানে। আর জানে বলেই তারাই হচ্ছে গুটিকয় সেই মানুষ যারা প্রায় নারী পুরুষের তথাকথিত ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্ককে অস্বীকার করে বেঁচে আছে। একটা সাধনসঙ্গী নিয়ে কোন বাউল গোটা জীবন কাটায়। আবার অনেকেই দেখা যায় জীবনের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন সাধনসঙ্গীর সঙ্গে। কখন যে কার সঙ্গে থাকবে কি পুরুষ কি নারী কেউই জানে না। নতুন কাউকে ভাল লাগলে পুরানোকে ছেড়ে যাওয়াই রীতি। কখনও বা নতুনকে ছেড়ে পুরানোর কাছে ফিরে যাওয়া। যে যখন যার সঙ্গে থাকে, সে-ই তার সুখ দুঃখ ও সাধনার সাথী। যখন থাকে না ভুলে যায় পরস্পরের কথা। স্থায়ী ভাবে ঘর সংসার বলে এদের কিছু নেই। আছে মাথা গোঁজার অস্থায়ী আশ্রয়। যৌথভাবে থাকার সময়ও কেউ কারও উপর তেমন নির্ভরশীল হয়, না, উভয়েই ভিক্ষা করে, উভয়েই খায়। আর এ ভাবে যতদিন বেঁচে থাকে, আকাঙ্ক্ষিত মানুষের সঙ্গসুখ নিয়ে বাঁচে।
এখানে বলে নেওয়া ভাল যে বাউলের কাছে সঙ্গসুখ কথাটা মূল্যবান! তাদের সম্পর্কে মরমি মানুষদের বাউলরা বলে রসিক সুজন। যদিও বাউলদের একান্ত গুহ্য একটা দেহসাধনার ব্যাপার আছে তবু সেটাকে প্রচ্ছন্ন রেখে তারা সকলের সঙ্গে মিশতে পারে। কেননা ঈশ্বরপ্রেম বা জীবে দয়ার বদলে বাউলের মানুষের সম্পর্কে রুচি বেশি। লিয়াকত আলি ঠিকই লক্ষ করেছেন যে দেহসাধনার ব্যাপারেও—
বাউল নিজের অস্তিত্বের প্রকৃতি কি বুঝে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বতন্ত্র এক পথিক। ‘অন্যে ভালো কি খারাপ ভাববে এই আশঙ্কাতে আমরা ঠিক যা করতে চাই কখনো করতে পারি না। এবং এই না পারতে না পারতে একসময় আমরা নিজে নিজের মতো না হয়ে অন্যের মতো হয়ে যাই। লাজ লজ্জা ভয়ের নিকুচি করে বাউল ছাড়া আর কে অন্যের মতো না হয়ে নিজের মতো হয়, হতে পারে? মানুষের কাছে এর চেয়ে মূল্যবান আর কিছু আছে!’ এখানেও বাউল সার্থক। এখানেও তাদের তুলনা নেই।
বাউলদের সম্পর্কে লিয়াকতের যে পক্ষপাত তা নিশ্চয়ই তাঁর একার নয়। আমাদের মধ্যে যারা একটু সমাজছুট, মুক্ত স্বভাবের বা স্বচ্ছ চোখে জীবনকে নীতির ঊর্ধ্বে দেখতে আগ্রহী, বাউল জীবন তাদের রোচক হতে বাধ্য। শুধু বাউল কেন বাংলা চৈতন্যপরবর্তী অনেকগুলি গৌণ ধর্মে এই জীবনধর্মিতা ও মানবমুখিনতা আছে। কর্তাভজা, সাহেবধনী, বলরামী, লালনশাহী, সহজিয়া বৈষ্ণব— এ সব নানা ধারাপ্রবাহে বয়ে চলেছে মানবচেতনার বেগবান স্রোতস্বিনী। বেগবান কিন্তু বহুক্ষেত্রে অন্তঃশীল, গোপন ও গূঢ়। একদিক থেকে ভাবলে এই সব কায়াবাদীরা আসলে ডি-ক্লাসড, শ্রেণিবর্ণহীন। ইহজীবন ও দেহজীবনের দ্বন্দ্বে-ছন্দে তাদের অনুরাগী দোলাচল। একটা অস্ফুট রহস্যের হাতছানি, অন্বিষ্টের জন্য এক মমতাময় আততি তাদের ছন্নছাড়া মন্ত্রহীন ব্রাত্যজীবনের দিকে অমোঘ টানে টেনেছে। অস্পষ্ট পরলোক নয়— বর্তমান জীবনযাপন, অস্বচ্ছ ঈশ্বর নন— প্রত্যক্ষ নরনারী, পূণ্যব্রত উপবাস তীর্থ মন্দির নয়— দৃঢ় সম্মিলিত সুস্থযৌনতার স্বীকৃতি, তাদের লক্ষ্য।
