ইংরেজের বিদ্যালয়ে ইতিহাসের পাঠ নিয়ে আমাদের ইতিহাসবোধ গড়ে উঠেছিল বলে সেকালের বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও ধর্মনেতারা বুঝতে পারেননি বাংলার গৌণধর্মের অন্তর্লীন শক্তি আর মানবমুখিনতাকে। চোখে পড়েনি মধ্যযুগের কবীর নানক-দাদু-রজ্জবের সন্ত পরম্পরার ঐহিক বাণীর সঙ্গে বাউলদের চিন্তার সমকত্ব। রবীন্দ্রনাথের অনুভবেই প্রথম ধরা পড়ে গৌণধর্মীদের মহিমা ও সেই একলা-পথ-চলার গরিমা। তিনিই প্রথম বলেন,
বড়ই দুঃখের বিষয় যে আমরা দেশে থাকিয়াও দেশের বিষয় কিছুই জানি না।… বস্তুত আমাদের এইরূপ অজ্ঞতা স্বদেশের প্রতি আমাদের অনুরাগকে বড়ই সংকীর্ণ করিয়া ফেলে।
বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের তিনি চোখ ফেরাতে চেয়েছিলেন, ‘দেশের দিকে— চারিদিকে— দেশের মাটির দিকে।’ ‘সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে যে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্মমত প্রচলিত, অজ্ঞাতে ও অলক্ষিতে যে সকল শক্তি সমাজের মধ্যে’ কাজ করছে তাকে জানতে চেয়েছিলেন। বুঝেছিলেন ‘সমাজের একান্ত আত্ম সংকোচনের অচৈতন্যের মধ্যেও… আত্ম প্রসারণের উদ্বোধন চেষ্টা’ রয়েছে নিম্নবর্গাশ্রিত আমাদের গৌণধর্ম সংগঠনের অভ্যন্তরে। সেটাই তার ভারতীয়ত্বের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
এখন ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। বাউল নয় শুধু, সব রকমের নিম্নবর্গের নবচেতনার কথা এখন শিক্ষিত বাঙালি জানতে উৎসুক। সাব-অলটার্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসতত্ত্বের যে-নবব্যাখ্যান আর বয়ান তৈরি হচ্ছে আজকাল তার রসদ পাওয়া যাচ্ছে গৌণধর্মীদের আচার আচরণে, বিশ্বাসে ও গানে। উচ্চবর্ণের ও বর্গের ধর্মচেতনার প্রতিবাদ ও সহকারিতা, এই দ্ব্যণুক সম্পর্কের টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে স্পন্দমান এ রকমের ঊন-ধর্মবোধে। প্রতিবাদের দিকটি সম্পূর্ণ অবারিত ও গানে গানে অভিব্যক্ত। লালন ও দুদ্দু শাহ-র গান এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে উদাহরণীয়। সহকারিতার দিকটি একটু ধূসর, তাই সহসা চোখে পড়ে না। কিন্তু লক্ষ করলে অনুধাবন করা যায়, সাম্প্রদায়িক মূর্তিকে ভাঙতে গিয়ে তার বদলে তারা গুরুমূর্তিকে প্রতিষ্ঠা করে বসে, শাস্ত্রের অস্বীকৃতি পরিণতি পায় গুরুবচনের অলঙ্ঘনীয়তায়। সবরকম অধীনতার বন্ধনপাশ ছিন্ন করতে চায় যে-লোকধৰ্ম তা বন্দি হয়ে পড়ে গুহ্য রহস্যময়তায়। বাউলের আসক্তিহীনতা বারবার অপ্রমাণিত হয় তাদের নারীসঙ্গের অতিরেকে। একস্তরের বাউলের উদগ্র যশোপিপাসা আর প্রচারপ্রবণতা ধ্বস্ত করে দেয় তাদের পরম্পরাগত আত্মস্থ ধ্যানতন্ময়তাকে। কেউ কেউ গৃহস্থসুলভ ভোগবাদে স্পৃষ্ট হয়ে পড়ে। অথচ বাউলজীবন আর বাউলগান, নানা বিকৃতিসত্ত্বেও আজ ব্যাপক জনাদরে সচল। আশ্চর্য যে, বাউলের প্রতীক-প্রতিমা একতারা আজ বুদ্ধিজীবীদের গৃহসজ্জার উপাদান!
বাংলাদেশের সদ্যপ্রয়াত মনীষী আহমদ শরীফ দেড়দশক আগে কিছুটা বিস্ময়মুগ্ধ চিত্তে চমকিত হয়ে লিখেছেন:
ইদানীং বাউল মত ও গান আমাদের চেতনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। কেবল তাই নয়, নানা কারণে এসব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টায় বিপুলসংখ্যক গান সংগৃহীত হয়েছে। সাড়ে তিনশ বছর ধরে দেশের জন-সমাজের এক অংশ এমনি নিষ্ঠার সঙ্গে যে জীবন-চর্চার এ বিপুল আয়োজনে এতদূর এগিয়ে গেছে, সে সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম না। লোকচক্ষুর অন্তরালে লোকান্তরে প্রসারিত জীবন বোধের পরিচয়বাহী এই কাকলিকুঞ্জে প্রবেশ করে, এই সুর-সমুদ্রে অবগাহন করে বিস্ময় মানি।… বিস্ময়মুগ্ধ চিত্তে ভাবছি,— এ নিয়ে আমরা কি করব।… দেশের প্রাকৃতজন যখন ফলপ্রসূ চাষে নিরত, তখন শিক্ষিতগণ নিষ্ফল উদ্যান রচনায় ব্যস্ত। বাউল মত যদি আদ্যিকালের ইতিকথা হত, তা হলে পরিহার-যোগ্য ঐতিহ্য মনে করতাম। কিন্তু আজকের মানুষের এক অংশের জীবন দর্শনের প্রতি এমনি উদাসীন থাকা দায়িত্ববোধের অভাবই জ্ঞাপন করবে।
না, এমন দায়িত্ব বোধের অভাবের পরিচয় আমরা দিইনি। আমরা গত এক দশকে প্রচুর বাউল ও ফকিরি গান গোলাজাত করেছি। তার বিষয়গত বিন্যাস, শ্রেণিকরণ, তার অন্তঃস্থ ইতিহাসের দ্যোতনা, তার প্রতিবাদ ও সমন্বয় বার্তা আমরা পেয়েছি। তৈরি হয়েছে উপেক্ষিত এই ব্রাত্য সমাজের সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্তীয় সতর্ক সমাজের সংলাপের ক্ষেত্র। আবার অতিকৃতিও চলছে নাকি? ক্ষুধার্ত বাউল গায়কদের নিয়ে বিদেশ-বিপণনের ব্যাবসাও আজ আর প্রচ্ছন্ন নেই।
সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় একটু রসান দিয়ে মন্তব্য করেছেন: ‘the Baul, of course, having been granted cultural benediction in the twentieth by its elevation to the status of an export item in the Festival of India circuit.’
এই রপ্তানি-যোগ্যতার কারণ বাউলদের বহুবর্ণিল পোশাক, গুপিযন্ত্র, মাথার ধম্মিল্ল ও নাচের চমৎকার ভঙ্গি। একেবারে নিখুঁত শো-পিস। অনুষ্ঠান জমাতে অদ্বিতীয়, গঞ্জিকাপ্রিয় এই খ্যাপা বাউলরা বিদেশের মুক্ত সমাজে ও যৌনস্বাধীন যুবমানসে সাড়া তুলেছে। বাউল গানের তারসপ্তকের স্বর-গ্রাম অনেককে টানে। মুক্ত নির্বাধ জীবনযাপন, নারীসঙ্গিনী গ্রহণ-বর্জনের স্বতশ্চল স্বাধীনতা, ইতিউতি সর্বত্র ঘোরাফেরা, সংস্কারহীন খাদ্যাভ্যাস বাউলদের সর্বজনগ্রহণীয় করে তুলেছে। তবে পট পাল্টাচ্ছে। বাউল বিশেষজ্ঞ অমিত গুপ্ত লক্ষ করেছেন:
