মানুষ হয়ে মানুষ জানো
মানুষ হয়ে মানুষ চেনো
মানুষ হয়ে মানুষ মানো
মানুষ রতনধন।
করো সেই মানুষের অন্বেষণ॥
এই মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয়ে যায় মনের মধ্যে, সে কেন অন্য তত্ত্ব মানবে? সে কেন গ্রস্ত হবে সাবেক স্বর্গ-নরক ধারণায়? তাই তার প্রতিপ্রশ্ন:
আল্লার বাড়ি যদি মাটির দুনিয়া হয়
তবে মানুষ মরে কোন্ বেহেস্তে যায়?
বেহেস্ত বা স্বর্গপ্রাপ্তি যদি কাঙ্ক্ষণীয় না হয় তবে এসব লৌকিক সাধকদের একমুখী লক্ষ্য মানুষের মুক্তি। সে মুক্তি মানে মোক্ষপদ প্রাপ্তি নয়— অজ্ঞানতা, কুসংস্কার থেকে মুক্তি। মাটির ঢিপি ও কাঠের মূর্তি পুজো, অপদেবতা বা উপদেবতায় বিশ্বাস, দরগাতলায় হত্যে দেওয়া বা কবচতাবিজ ধারণ সবেরই বিরুদ্ধাচরণ করা এদের ব্রত। বিচারশীল আর তর্কপ্রবণ বাউলফকিররা বহুলাংশেই গুরুবাদী, কারণ গুরুই কায়াসাধনার পথ ও পদ্ধতি বাতলে দেন। কিন্তু এমন যে অত্যাজ্য গুরু, তাঁকেও অভ্রান্ত না ভেবে বলা হয়েছে:
যাহা দেখিনি নিজ নয়নে
বিশ্বাস করি না গুরুর বচনে।
এত যুক্তিতর্কবিচার সংকুল পন্থা গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের কাছে সমাদৃত হবার কথা নয়। কিন্তু মনের মানুষের সন্ধানে নিরত এমন গভীর নির্জন পথ নিঃসঙ্গ সাধকের প্রাণের প্রদীপে আলোকিত। সে নির্ভয় ও ধর্মনির্লিপ্ত— স্রোতের বিরুদ্ধে তার অবগাহন। প্রয়োজনে সে প্রতিবাদী, কিন্তু তার আয়ুধ লাঠি নয়, একতারা। তার বিশ্বাস, ‘এই মানুষে সেই মানুষ আছে।’
কিন্তু বিশ্বাসের এত বলিষ্ঠ অবিচল পথের পদাতিকদের সংখ্যাবৃদ্ধি তো সনাতনবাদীদের পক্ষে স্বস্তির হতে পারে না। তাই তাঁদের প্রশ্ন:
কী জন্য প্রবীণ মতে বিরত হইয়া।
অভিনব মতে রত কী সুখ দেখিয়া॥
স্বর্গের সোপান কি এ মতে গাঁথা আছে।
দড়বড়ি চলি যাবে শ্রীহরির কাছে॥
না জানি কী লাগি সবে ভ্রান্ত হায় মতি।
নবপথে পদার্পণ কেন এ দুর্মতি॥
দ্বন্দ্ব এটাই অর্থাৎ প্রবীণ মত আর নতুন মত। ‘পাষণ্ডীদলন’-এর লেখক রামলাল শর্মা তাঁর নিরীহ পয়ারে যে প্রশ্ন তুলেছেন তা তার একার নয়। অক্ষয়কুমার দত্ত, যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, রেয়াজউদ্দিন আহমদ, দাশরথি রায় এমনকী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসেরও এই এক প্রশ্ন। পুরনো পথ ছেড়ে অভিনব এই পথে কেন? কীসের জন্য? এ পথে কি স্বর্গ বা শ্রীহরির পাদপদ্মপ্রাপ্তি দ্রুততর হবে? মুশকিল যে স্বর্গ বা হরি কোনওটাই এদের অন্বিষ্ট নয়। এদের লক্ষ্য মানব, মানবসত্য।
ঈশ্বরলাভ আর স্বর্গপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা গায়ে গায়ে লেগে থাকে। যুক্তিবাদী লালন শাহ মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছেন এ প্রসঙ্গে। বলছেন:
মলে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে কেন বলে?
মলে হয় ঈশ্বরপ্রাপ্ত সাধু অসাধু সকলে
তবে কেন এত জপতপ এত করে জলেস্থলে?
সকলেরই তো লক্ষ্য ঈশ্বরপ্রাপ্তি, সাধু অসাধু সকলেই তো পাবে ঈশ্বর, হলে আর কেন এত জপতপ এত কৃচ্ছ্রসাধন? তারপরের জিজ্ঞাসা:
যে পঞ্চে পঞ্চভূত হয়
মলে তা যদি তাতেই মিশায়—
তবে ঈশ্বর-অংশ ঈশ্বরে যায়
স্বর্গ-নরক কার মেলে?
একেবারে তাত্ত্বিক প্রতিপ্রশ্ন। পঞ্চভূত থেকে আমাদের সৃষ্টি আবার পঞ্চভূতেই বিলয়, তা হলে কোন সে উদ্বৃত্ত অংশ যা স্বর্গে বা নরকে যাবে? এ জাতীয় তত্ত্ব ও দ্বান্দ্বিকতার বিন্যাস থেকে বোঝা যায় নিম্নবর্গজাত বাউলফকিররা খুব হেলাফেলার, অবজ্ঞার বা ঘৃণার বিষয় নয়, অনুধাবনের বিষয়।
এদেশে বাউল একটি তত্ত্ব হিসাবে গৃহীত হয়েছে, ধর্মহিসাবে নয়। এরা একই সঙ্গে বৈদিক কর্ম কাণ্ড এবং ব্রাহ্মণ্য আচার আচরণের বিরোধী। এদের ভাবনা ধারণা গঠনে বৈষ্ণবীয় রাগানুগা সাধনা ও পরকিয়া মৈথুনকেন্দ্রিক কায়াবাদ আছে। বেশ কিছুটা প্রতিবাদী ইসলামি স্পর্শ এবং অনেকটা সুফিবাদের সংক্রাম আছে। বৌদ্ধ শূন্যবাদ ও নাথপন্থের কিছু কিছু সংরাগও লক্ষণীয়। এককথায় বাউল ভাবনায় এক উদার ও সমন্বয়বাদী মানবচেতনা কাজ করেছে, যার নেতৃত্বে শাস্ত্র বা মন্ত্র নেই— আছে গান আর গুরুর নির্দেশ। গানগুলি দ্যোতনাময় ও গূঢ়, তাকে ভেদ করতে হয় সাধনায়। এক কথায় বাউলরা হল ভোগমোক্ষবাদী, সমাজছুট কিন্তু সমাজবিচ্ছিন্ন নয়। সামাজিক দায়দায়িত্ব তারা নিতে চায় না কিন্তু সমাজের শোষিত নিম্নবর্গের শ্রমজীবী অংশ থেকে যেহেতু তাদের আবির্ভাব তাই অত্যাজ্যভাবে তাদের গানে রয়ে যায় নানা সামাজিক স্মৃতি ও সংস্কার, রূপক ও প্রতীক। তাদের গানের ভাবে-বর্ণনায়-সুরে মাটির স্পর্শ খুব প্রকট। কেউ কেউ মনে করেন বাউল সাধনায় পর্যুষিত হয়ে আছে বাংলার ধর্ম, বাঙালির ধর্ম ও তার চিরার্জিত মানসজীবন। ‘দেশীভাবে ও বিদেশীপ্রভাবে এর উদ্ভব,’ এমন কথা বলেছেন কেউ— সেক্ষেত্রে বিদেশি বলতে ইসলাম ও সুফিপ্রভাবের কথাই ব্যঞ্জিত। ‘সমাজের উপরতলার লোকের ধর্ম হলে এই মতবাদ যে কেবল বাঙালির জীবন ও ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত করতো তা নয়, দুনিয়ার মানুষের কাছে উদার মানসিকতার জন্য বাঙালিকে শ্রদ্ধেয়ও করে তুলতো’— আহমদ শরীফের মতো প্রাজ্ঞজনের এ হেন মন্তব্যে ভাবাবেগ যতটা স্ববিরোধও ততটা। কায়াবাদী যৌনযৌগিক কোনও গোপ্য সাধনরীতি কি উপরতলার লোকের চর্চার বিষয় হতে পারে? এ কি কোনওভাবে বহুজনের আচরণীয়?
আহমদ শরীফ অবশ্য বাউলতত্ত্ব বিষয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন বহুদিন আগে, ১৯৬৩ সালে। তারপরে মন্তব্যটি হয়তো তিনি পুনর্বিবেচনা করে থাকবেন। তবে অপেক্ষাকৃত পরে, ১৯৮৮ সালে, তিনি ‘ফুলবাসউদ্দীন ও নসরুদ্দীনের পদাবলী’ সংকলনের মুখবন্ধে যে মতামত দিয়েছেন তা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। বলেছেন,
