‘Materialism spiritualism’-এর দ্বন্দ্বে যখন দুনিয়ার মানুষের মন অস্থির ও অসুস্থ, যখন নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বিপর্যস্ত, যখন পৃথিবীর কল্যাণকামী চিত্ত অবক্ষয়ের নিরূপ যন্ত্রণায় কাতর, মানসদ্বন্দ্বে বিক্ষত মানুষ যখন স্বস্তির নিদান লাভের আগ্রহে উন্মুখ ও উৎকণ্ঠ, বিমূঢ় শিল্পীরা ও মনীষীরা যখন দিশাহারা, তখন এই অধ্যাত্মবাদনির্ভর নিশ্চিত মনের অবিচল প্রসন্ন-প্রশান্তি আমাদের ভাবিয়ে তুলবেই। বাউল গান আমাদের ক্ষণে ক্ষণে স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের জড় রয়েছে গভীরে, গতি হচ্ছে অনন্তে আর সম্ভাবনা আছে বিপুল। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে এ মরমীতত্ত্ব ও অধ্যাত্মবাদ আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর ইহজাগতিক সুস্থ ও স্বস্থ জীবনবিরোধী ও উপযোগবিহীন।
এ একেবারে আধুনিক মনের বিশ্লেষণ, তবে নিরপেক্ষভাবে এমন প্রশ্ন কি উঠবে না যে, যা সুস্থ ও স্বস্থ ইহজাগতিক জীবনবিরোধী ও উপযোগবিহীন, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন কোথায়? সেই প্রশ্ন, অনিবার্যভাবে, তবু ওঠে। কারণ আমাদের সাম্প্রতিক মধ্যবিত্তমন বাউল গান শ্রবণ ও চর্চায় খুব উৎসাহী। সত্যিকথা বলতে কি এই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রোতা ও ভোক্তাদের খুশি করবার জন্যই বাউল তার সাজসজ্জাকে জাঁকালো করেছে, গানের পরিবেশনে এনেছে পারফরমারের মঞ্চদাপানো গিমিক ও ভাবভঙ্গি, যন্ত্রানুষঙ্গে ঘটিয়েছে অতিরেক। যে যুবকটি বর্ধমান বা নদিয়ার গ্রামে চাষবাস করে কিংবা ঘরামির বৃত্তিধারী, সে সন্ধ্যাবেলায় বাউলের আসরে যেন বিদূষক— বিনোদন করাই তখন তার ধর্ম। হালফিল বাউলের এই দ্বিচারিতা সমাজের একটা ব্যাধির মতো বেড়ে চলেছে। তাদের অনেকের জীবনে কোনও মগ্নতা বা প্রশান্তি নেই— বিমূঢ়তার আততি তার চোখে মুখে ছাপ ফেলে।
এই আততির কারণ দু’রকম। প্রথমত, বাউল এতদিন অভ্যস্ত ছিল গ্রামীণ জনপদ ও সেই জনমণ্ডলীকে গান শোনাতে, তাতে কোনও বিরোধ ছিল না কারণ সে-গান তো সেই জীবনেরই ফসল। গানের বক্তব্য, প্রতীক, বর্ণনা এমনকী সুরের একঘেয়েমি তাদের মেনে-নেওয়া। এখন নগরায়ণের তুমুল কলরোলের মধ্যে বাউলকে হতে হচ্ছে নাগরিক গায়ক, বুঝতে হচ্ছে নাগরিক মানুষের সদা পরিবর্তনশীল হালকা পলকা রুচিবোধ। এটাই দ্বিতীয় সমস্যা। যেহেতু গ্রামীণ রুচি ও প্রত্যাশার কাঠামো অনেকটা অনড় তাই সেখানে বাউল গায়ক স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল কিন্তু নগরের মঞ্চে সে আড়ষ্ট বেপথু। কী যে সে গাইবে, কতটা রংবাজি তাতে দরকার তার নির্ধারক এক অশিক্ষিত শ্রোতার দল— যারা কোনও গূঢ় গভীর ভাবের গান শুনতে আসেনি, দেখতে এসেছে একটা গানের ধরন, যা গড়নে ‘ফোকো-মডার্ন’। তাদের কারুর কারুর আত্মাভিমান এইরকম যে এই গানের সমাদর বা পরিপোষণ মানে একরকম শিকড়ের সন্ধান ও ঐতিহ্যের পরিচর্যা। বাংলাদেশের গবেষক আহমদ মিনহাজ ভেবেছেন, সমকালের রাজনীতির ঘূর্ণি, মূল্যব্যবস্থার ব্যাপক ওঠানামা, আকাশ-সংস্কৃতির প্রসার-প্রতিষ্ঠা, নীতি-আদর্শের ক্রমস্খলন, সাম্যের পতন, ভক্তির প্রাবল্য ও নাস্তিকের ঔদ্ধত্য, তারও চেয়ে ভয়াবহ ব্যাধি, মধ্যবিত্তের অপরচুনিস্ট হওয়ার Self centered হওয়ার অসুস্থ মানসিকতা থেকে একদল বিবেকী ও সংবেদি মানুষ নিষ্ক্রান্ত হতে চাইছেন। কোনও বাঁধা ছকে তাঁদের আর আঁটছে না, তাঁরা কিছুটা ভাবুক বা স্বপ্নবাদী হতে চান, ইতিহাসকে দেখতে চান জীবনের দর্পণে। মিনহাজের ভাষায়:
আমাদের অনুভূতিতে আজ তাই দোলা লেগেছে, ইতিহাস তার পরিচিত ভঙ্গি বদলে নতুন আদলে ধরা দিতে চাচ্ছে; নিছক অধ্যাত্মবাদ, বস্তুবাদ-এর কোনওটিই নয়, দুইয়ের প্রাসঙ্গিক ও যুগোপযোগী মিলনের আকাঙ্ক্ষাই আজ বড়ো হয়ে উঠেছে। বাউল গান শুধু গান নয়, বাউল গানের ইতিহাসের পাতায় মুখর সাধকদের অন্তর্গূঢ় বাণী হিসাবে শুধু নয়, ইতিহাসের নতুন পথনির্দেশনারূপে আমাদের অনেকের চেতনায় প্রতিভাত হচ্ছে। আমরা গ্রহণ করতে চাচ্ছি এর মানবিকতা এর আধ্যাত্মিকতা এবং এর বস্তুবাদিতাও। মানে করলে দাঁড়ায়, আমরা পুনরায় শিকড়াভিমুখী, পুনরায় আশ্রয়প্রত্যাশী; আমাদের অভিগমন ঐ সব লুপ্তপ্রায় চিহ্ন ও অভিজ্ঞতার কাছে, সেখানে আমাদের অনুপ্রেরণা বাউলের গান, আর অবলম্বন লালন, হাসন, শাহনূর, শীতলাং, ভবানন্দ, ভবা পাগল, পাগলা কানাই, রাধারমণ, আরকুম শাহ, দুর্বিন শাহ, মহিন শাহ, শেখ ভানু, আব্দুল করিম, এমনি শত শত নাম, নামহীন জানা-অজানা মানুষের পরিমণ্ডলে চর্চিত জীবনদর্শন, এক ঋদ্ধ ইহ-আধ্যাত্মিকতা।
নব্য বাঙালির এমন শিকড়সন্ধান ও আশ্রয়প্রত্যাশার অধুনাতন প্রয়াস হয়তো সত্য ও আন্তরিক কিন্তু সেই শুশ্রূষা কি শুধু প্রাক্তনদের লেখা গানেই মিটে যাবে? নতুন গীতিকারদের লেখা গান খুঁজব না আমরা? খুঁজে যদি পাই তবে সেই গান কি অনিকেত আমাদের দিশা দেবে? কী করে দেবে— যখন এখনকার বাউল গীতিকাররাও আরেক অর্থে বিভ্রান্ত ও বিব্রত? যখন চটকদারি কথাবার্তা, বানানো প্রহেলিকা তাঁদেরও আচ্ছন্ন করছে— ‘সত্য বলো সুপথে চলো’ এমন লালনবাণী যখন উপেক্ষিত অবহেলিত, তখন?
আহমদ মিনহাজ অবশ্য বোঝেন অধুনাতনের বাউল-সমস্যা। গত কয়েক দশক এবং বিশেষ করে গত দশ বছর পশ্চিমবঙ্গের বাউল-ফকির অধ্যুষিত গ্রামদেশে ঘুরে আমি যা বুঝেছি, বাংলাদেশে বাস করে মিনহাজ তার থেকে অনুভবের খুব একটা দূরত্বে নেই। তাই তিনি লেখেন:
