লাকে কপালে তিলক কাটিত, গলায় তুলসীকাঠের মালা ধারণ করিত; আজও সে তিলক-মালা তাহাদের আছে। পুরুষেরা শিখা রাখিত। এখন নানা ধরণের খোঁপা বাঁধার রেওয়াজ হইয়াছে, কিন্তু স্নানের পর এখনও মেয়েরা দিনান্তে একবারও অন্তত চূড়া করিয়া চুল বাঁধে। …হলুদমণি পাখি—বাংলাদেশের অন্যত্র তাহারা ‘গৃহস্থের খোকা হোক’ বলিয়া ডাকে, এখানে আসিয়া তাহারা সে ডাক ভুলিয়া যায়— ‘কৃষ্ণ কোথা গো’ বলিয়া ডাকে।
চাষির গ্রামে সদ্গোপেরাই প্রধান, নবশাখার অন্যান্য জাতিও আছে। সকলেই মালা তিলক ধারণ করে, হাতজোড় করিয়া কথা বলে, প্রভু বলিয়া সম্বোধন করে। ভিখারিরা ‘রাধে-কৃষ্ণ’ বলিয়া দুয়ারে আসিয়া দাঁড়ায়; বৈষ্ণবেরা খোল করতাল লইয়া আসে; বৈষ্ণব বৈষ্ণবীরা একতারা খঞ্জনী লইয়া গান গায়; বাউলেরা একা আসে একতারা বাজাইয়া।
এই বর্ণনার পর উপন্যাস যত এগোয় আমরা তার কাহিনির পথ ধরে চলে আসি এক স্নিগ্ধ বৈষ্ণবীয় আখড়ায়, হরিদাস মহান্তের গড়ে-তোলা কুঞ্জে। সেখানে থাকে দুটি প্রাণী— মা আর মেয়ে, কামিনী ও কমলিনী। কী করে যেন তাদের জীবনে এসে যায় বৃদ্ধ বাউল রসিকদাস। কমলের নাম দেয় সে ‘রাইকমল’। শেষদিকে বাউল আর বৈষ্ণবী, দুই ভিন্ন সম্প্রদায়ী অসমবয়সি তারা, নিজেদের মালাচন্দনে বাঁধে। এইখানে এসে আমরা আখ্যান অংশ ত্যাগ করে স্বচ্ছ চোখে রাঢ়ের বহুদিনের সমাজ-ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাব, এই ভূমিখণ্ডে বৈষ্ণব আর বাউলে খুব আড়াআড়ি নেই, যেন অজয় আর গঙ্গার মিলে যাওয়া। তাই বৈষ্ণব-তীর্থ কেঁদুলিতে বাউলদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। তাতে কোনও বেসুর বাজেনি, কোনওদিন। বাজেনি যে, তার কারণ, এ প্রান্তের বাউল ও বৈষ্ণবদের বেশির ভাগই উচ্চবর্গের বা উচ্চবর্ণের নয়। বৈষ্ণব মানেও সর্বদা নৈষ্ঠিক গৌড়ীয় বৈষ্ণব নন, বরং জাতি-বৈষ্ণব বা সহজিয়া। সকলেই প্রধানত কায়াবাদী। দেহ-বৃন্দাবনেই তাদের আরোপ সাধনা। অনুমানের পথে নয়, তাদের সাধনার নাম ‘বর্তমান’। এই দেহভাণ্ডেই তাদের সবকিছু। তাই দেহের কিছুই ঘৃণ্য বা বর্জ্য নয়।
নজর করলে আরেকটা জিনিস দেখা যাবে। বর্ধমান-বীরভূম-বাঁকুড়ায় প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে যে সব বিখ্যাত বাউল সমাবেশ হয়ে থাকে তার মূলে রয়েছে সহজিয়া বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উদ্যম ও উদ্যোগ। কেঁদুলির কথা তো আগেই বলেছি তা ছাড়া বাঁকুড়া সোনামুখির বাউল সমাবেশ (রামনবমী) হয় মনোহর খ্যাপার প্রসিদ্ধিতে। মনোহর ছিলেন সাধু বৈষ্ণব। বর্ধমানের অগ্রদ্বীপে ঘোষঠাকুরের শ্রাদ্ধে কৃষ্ণমূর্তি গোপীনাথ শ্রাদ্ধ করেন কাছা পরে। পুরোপুরি বৈষ্ণবীয় উৎসব, কিন্তু বাউলদের বেশ রমরমা। বীরভূমের কোটাসুরে একশো বছর ধরে ভাদ্র মাসে সাধুসেবা চলছে। এতে প্রধান ভূমিকা বাউলদের। অথচ আশ্রমটি নারায়ণচাঁদ গোঁসাইয়ের সাধনসঙ্গিনী খ্যাপা মা-র নামেই প্রসিদ্ধ। আগে এর তত্ত্বাবধান করতেন মতিদয়াল গোঁসাই, তারপর মনোহরদাস মহান্ত। নামের ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে এঁদের জাতি-বৈষ্ণবের পরম্পরা, তবে গৃহী নন— আখড়াধারী। এমনই বহু উদাহরণ দেওয়া যায়— যেমন বেনালীপুরের মেলা, রামকেলীর সমাবেশ, দধিয়া বোরেগীতলার মেলা। বীরভূমের বাউলদের নিয়ে অনেকদিন সরেজমিন কাজ করেছেন আদিত্য মুখোপাধ্যায়। তাঁর ধারণা:
বেশির ভাগ বাউলই নিজেকে বৈষ্ণব বলে পরিচয় দেন এ আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। আসলে ‘রূপ’— ‘রাগ’ হয়ে বাউল পৌঁছায় ‘ভাবে’। বাউলের বিভিন্ন শুদ্ধ আচরণগুলিই তাকে ক্রমশ বৈষ্ণব করে তোলে।
বাউলের শুদ্ধ আচরণ? শুনেই মনে পড়ল ১৮৯৬ সালে পণ্ডিত যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর ‘Hindu Castes and Sects’ বইতে মন্তব্য করেছিলেন:
The Bauls are low class men, and make it a point to appear as dirty as possible… Aristrocratic Brahminism can only punish them by keeping them excluded from the pale of humanity.
কিন্তু এ মন্তব্য তো উনিশ শতকের শেষ দশকের একজন নৈষ্ঠিক ব্রাহ্মণের। আধুনিক কালের ব্রাহ্মণ যুবা আদিত্য মুখোপাধ্যায় মনে করছেন অন্য কথা। তিনি বলছেন:
বিষয়টি গুলিয়ে যাবার মতোই। প্রায় প্রত্যেক সাধু-বাউলের কাছে শুনেছি, তাঁরা বৈষ্ণব বাউল। ‘বাউল বোষ্টম’ কথাটিও এতই প্রচলিত যে এদের ভিন্নত্ব ধরা পড়ে না। আবার বাউলের সাধন সঙ্গিনীকে সব সময়েই ‘বোষ্টমী’ বা ‘বৈষ্ণবী’-ই বলা হয়।
এ যেমন সত্যি তেমনি এটাও ঘটনা যে ‘আউল বাউল’ বলে একটা কথা চালু আছে, ‘বাউল-ফকির’ কথাটাও খুব সচল। লালন কী ছিলেন— বাউল না ফকির?
উনিশ শতকে বাউল আর ফকিরদের বহুক্ষেত্রে সমার্থক বলে মনে করেছেন অনেকে, অন্তত সেকালের পণ্ডিত ও গবেষকরা। তাঁরা কেউই অবশ্য এই দীনহীন সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রসন্ন ছিলেন না। তার কারণ তাঁদের উচ্চবর্ণের অহমিকা একদিকে, আরেকদিকে নিম্নবর্গের এই কায়াসাধকদের গোপন ও গুহ্য আচরণবাদ। কেবল বাউল বা ফকিরিতন্ত্র নয়, জাতবৈষ্ণব-কর্তাভজা-সহজিয়া স্রোত, এমন সমস্ত ধারা যা গৌণধর্মীদের আশ্রয় ও আশ্বাস দিয়েছিল তা তাঁদের মনঃপূত হয়নি। সনাতন ভাবনাচিন্তা বা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আচরিত ধর্মের বাইরে যারা যায় তাদের খ্যাতিবিত্ত জোটার তো কথা নয়। তাদের জোটে নিন্দা ও বিদ্রূপ। তারা হয়ে ওঠে উচ্চশ্রেণির পক্ষে সন্দেহজনক আর শত্রুবিশেষ। তাই তাদের দমন-পীড়ন-ধ্বংস সাধন হয়ে ওঠে আশু কর্তব্য। ব্যাপারটি একপক্ষীয়— কারণ শাস্ত্র-মন্দির-মন্ত্র-মসজিদ-পুরোহিত-মোল্লা সেইদিকে। তারা নগরবাসী, ও শিক্ষিত, মসীজীবী লেখকরাও তাদের পক্ষে। পত্রপত্রিকা, ধর্মপ্রতিষ্ঠান ও মুদ্রণযন্ত্র তাদের সহায়। অন্যপক্ষে গ্রামে-বাস করা বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত বাউল ফকিরদের অস্ত্র বলতে কণ্ঠের গান আর অন্তরের তীব্র বিশ্বাস। সেই জায়গাটায় অবশ্য তাদের খুব জোর। কোনও অনুমানাত্মক কিছুকে তারা মানে না। তাদের মতে শাস্ত্ৰ-পুরাণ-দেবমূর্তি-মন্ত্র-তীর্থ-উপবাস এসব আসলে ‘অনুমান’। সত্য হচ্ছে ‘বর্তমান’, এই নরনারীর দেহ ও দেহধর্ম, এই ইহজগৎ আর কামনাবাসনা, স্বপ্ন ও মুক্তিপিপাসা। এর পরতে পরতে রয়েছে রহস্য ও মরমিয়া বিশ্ব। খোদা বা ঈশ্বর আছেন মানব জীবনের শরিক হয়ে, তাই মানুষ ধরে সাধনা করতে হবে। তাদের গানে বলা হচ্ছে:
