পৌষ সংক্রান্তির দিনে কেন্দুলির জয়দেবের মেলায় গিয়ে ভরা-মনে ফিরলেন, বাউল ও বাউল গানের প্রবল আকর্ষণে এমন কতবারই গেছেন। নিতান্ত অল্প বয়সেই তিনি এ মেলায় আসতেন নিতাই বাউলের সঙ্গে, তখন শান্তিনিকেতনের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিল না। এখানে এসেও প্রথম প্রথম কাউকে না জানিয়ে একা চলে যেতেন। তারপর জানাজানি হল, বন্ধু-সহকর্মীরা সঙ্গী হতে লাগলেন। তাঁর ভয় ছিল পাছে কেউ বাউলদের প্রশ্ন করে বিরক্ত করেন।
এখন সমস্যা হয়েছে আমাদের মতো জিজ্ঞাসু ও তথ্য অনুসন্ধানীদের, যারা ক্ষিতিমোহন বা উপেন্দ্রনাথের অনেক পরে সরেজমিন কাজে নেমেছি। একটা কথা স্পষ্ট যে, ক্ষিতিমোহন বহুদিন ধরে এবং বহু জায়গায় ঘুরে মরমি ভাবসাধকদের সঙ্গ করেছেন, তাঁর শাস্ত্রজ্ঞানও ব্যাপক ও গভীর। তুলনায় উপেন্দ্রনাথ অনেক পরে ব্রতী হয়েছেন তাঁর সন্ধান ও সংগ্রহ কাজে, তাঁর অনুসন্ধানের ক্ষেত্রও অনেক সীমায়িত। তবে উপেন্দ্রনাথ বেশ জোরালোভাবে আমাদের কায়াবাদী বাউল সাধকদের হয়ে সওয়াল করেছেন— ধরতে চেয়েছেন তাদের গোপন ও গুহ্য সাধনার ধারা তথা দর্শনকে। বাউলদের চারচন্দ্রভেদ বা মলমূত্ররজবীর্যপান তাঁর ততটা গর্হিত বা ঘৃণাৰ্হ বলে মনে হয়নি—ক্ষিতিমোহন সে বিষয়ে একেবারে বিপরীতমুখী। কাজেই ক্ষিতিমোহনকে উদ্ভাবন করতে হয়েছে এক নতুন লজ— কায়াবাদীদের বিপরীতে তিনি প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছেন উচ্চতর ভাবের বাউল সাধকদের। কিন্তু খুব সংগত যুক্তিতে ও স্থানিক কারণে তিনি তাঁদের খুঁজে পাননি রাঢ়বঙ্গে বা কেঁদুলির মেলায়। লালনশাহী পন্থা সম্পর্কে তাঁর উৎসাহ থাকার কথা নয়, যিনি স্বচ্ছ ভাষায় লিখেছিলেন ‘ধরো রে অধরচাঁদে অধরে অধর দিয়ে’। কাজেই অবিভক্ত বাংলায় ঠাকুর পরিবারের জমিদারিভুক্ত কুষ্টিয়া পরিমণ্ডলে তিনি যাননি, উৎসাহ পাননি লালনবাণী প্রচারে। অথচ এখন নানা ঘটনাচক্রে লালন শাহের গান ও তত্ত্ব দুই বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে। লালনবাণী এখন বুদ্ধিজীবীদের দিশা দিচ্ছে এবং লালনগীতির সুরকাঠামো নিয়ে কৌতুহল বেড়েই চলেছে। তথ্য থেকে জানা যায়, ১৮৯০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত একশো বছরে লালন সম্বন্ধে বই লিখেছেন ৪৪ জন, প্রবন্ধ লিখেছেন ১৫০ জন।
এহেন লালনের গান রবীন্দ্রনাথের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল উনিশ শতকের শেষ দশকে। সে গানের ভাবরস ও সুরমাধুর্য তাকে টেনেও ছিল, অথচ পরে সেই লালন সম্পর্কে আর যেন তেমন উচ্ছ্বাস ছিল না। যেটুকু ভাবোচ্ছ্বাস তিনি প্রকাশ করেছেন তা লালনের দেহ খাঁচার অচিন পাখির রহস্য নিয়ে। ‘মাঝে মাঝে বদ্ধ খাঁচার মধ্যে আসিয়া অচিন পাখী বন্ধনহীন অচেনার কথা বলিয়া যায়; মন তাহাকে চিরন্তন করিয়া ধরিয়া রাখিতে চায় কিন্তু পারে না’— তাঁর উপভোগ ছিল লালনের এই অসামান্য অনুভবের জন্য ও প্রকাশভঙ্গির কারণে। বাউল গানের ‘mystic transcendentalism’ তাঁর পক্ষে রোচক লেগেছিল, কিন্তু বাউলদের প্রতিবাদী মনন, আত্মবেদন ও নির্যাতিত অবস্থান বিষয়ে তিনি কলম ধরেননি। পরিণত বয়সে ১৯০৬ সালে ‘পত্রপুট’ কাব্যের ১৫ সংখ্যক কবিতায় তিনি লিখেছিলেন:.
কদিন দেখেছি ওদের সাধককে
একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মানদীর ধারে,
যে নদীর নেই কোনো দ্বিধা
পাকা দেউলের পুরাতন ভিত ভেঙে ফেলতে।
দেখেছি একতারা-হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে
মনের মানুষকে সন্ধান করবার
গভীর নির্জন পথে।
যৌবনে পদ্মাতীরে দেখা একক বাউলের এই নিঃসঙ্গ সন্ধান নির্জন পথে, তাঁর পক্ষে একটি ভাবময় চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে। বাউলকে তিনি একলা সাধকরূপে দেখতে চান— ‘মনের মানুষ’-ও তাঁর বিবেচনায় এক অন্তরগ্রাহ্য তত্ত্ব। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে বাউল সাধনা যুগলের সাধনা এবং দেহতত্ত্বের জটিল পথক্রমায় তার চলাচল। মনের মানুষ তাদের বিশ্বাসে কোনও ভাব বা অনুভব নয়, তা নিতান্ত এক বস্তু, যা উপলব্ধি করতে হয় নরনারীর দেহসংগমে এবং গুরুনির্দেশিত করণকৌশলে।
‘ওদের সাধক’ উচ্চারণে কবি যাঁদের কথা বলেছেন তাঁদের পরিচিতি দিতে গিয়ে তাঁর বাচন:
ওরা অন্ত্যজ, ওরা মন্ত্রবর্জিত।
দেবালয়ের মন্দিরদ্বারে
পূজা-ব্যবসায়ী ওদের ঠেকিয়ে রাখে।
বাউলদের হয়তো অন্ত্যজবর্গে শ্রেণিভুক্ত করা যেতেও পারে, অন্তত গভীরার্থে, ওরা মন্ত্রহীন কেননা মন্ত্রে ওদের বিশ্বাস নেই—প্রশ্নটি তাই কিন্তু অধিকারঘটিত নয়। দেবালয়, দেবতা, বিগ্রহ পূজা বা পুরোহিত কিছুই ওদের কাম্য নয় তাই পূজা ব্যবসায়ীদের দ্বারা নিরুদ্ধ হবার প্রশ্ন ওঠে কি? এর পরের রবীন্দ্রবাণী আরও ভ্রমাত্মক। বলেছেন:
ওরা দেবতাকে খুঁজে বেড়ায় তাঁর আপন স্থানে।
অথচ শুধু বাউল কেন কোনও লোকায়ত সাধকই দেবতাকে খোঁজে না, খোঁজে মানুষ।
গোপ্য সাধনার ত্রিবেণী
পঞ্চাশ বছর আগে রাঢ় বাংলার রূপকার তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রসিদ্ধ ‘রাইকমল’ উপন্যাসের গোড়ায় লিখেছিলেন:
পশ্চিমে জয়দেব-কেন্দুলি হইতে কাটোয়ার অজয় ও গঙ্গার সঙ্গম-স্থল পর্যন্ত ‘কানু বিনে গীত নাই’। অতি প্রাচীন বৈষ্ণবের দেশ।… এ অঞ্চলে সুন্দরীরা নয়ন-ফাঁদে শ্যাম শুকপাখি ধরিয়া হৃদয়পিঞ্জরে প্রেমের শিকল দিয়া বাঁধিয়া রাখিতে তখন হইতে জানিত।
