গ্রন্থাশয়ী পণ্ডিতের দল ঠিক বাউলিয়া ভাব ও মর্ম ধরিতেও পারেন নাই এবং পরিচয়ও দিতে পারেন নাই। যাঁহারা নিগ্রন্থ তাঁহাদের পরিচয় গ্রন্থে কেমন করিয়া মিলিবে?
তিনি অবশ্য বাউল সাধনা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে গেছেন এই বলে যে,
ইহাদের দেহ-সাধনায় চারিচন্দ্রের ভেদ অতি গোপনীয় ব্যাপার এবং তাহা অতি বীভৎস। …চারিচন্দ্রের ভেদ হইল তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রের দাসত্ব। তাহাতে অনুরাগ পথের কি আছে?
এইখানে আমরা একটা স্ববিরোধ না দেখে পারি না। বাউলদের দেহ সাধনা তাঁর মতে বীভৎস অথচ তাদের গান অত্যন্ত ভাবগভীর ও অন্তরস্পন্দী কি করে হতে পারে?
সম্প্রতি প্রণতি মুখোপাধ্যায় একটি জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন ক্ষিতিমোহন প্রসঙ্গে। তাতে মন্তব্য করেছেন: ‘ক্ষিতিমোহন তন্ত্র ও যোগশাস্ত্র মতে যে বাউলরা কায়াসাধন করেন তাঁদের চেয়ে উচ্চতর ভাবের বাউল সাধকদেরই পরিচয় তাঁর গ্রন্থে দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও তাঁদেরই কথা বিশ্বজন সভায় জানিয়েছিলেন তাঁর অক্সফোর্ডের বক্তৃতায়।’
অক্সফোর্ডে রবীন্দ্রনাথ যে-হিবার্ট লেকচার দেন তাতে প্রধানত উদ্ধৃতি দেন ক্ষিতিমোহন প্রদত্ত বাউল গানের। সেইসব গানে কায়াবাদীদের চেয়ে উচ্চতর ভাবের বাউল সাধকদের কথা প্রণতি মুখোপাধ্যায় তুলেছেন, কিন্তু তাঁরা কারা? আমাদের চেনা বঙ্গদেশে কি তাঁরা কোনওদিন ছিলেন বা গান লিখেছিলেন? তাঁরা কোথায় চলে গেছেন? মহম্মদ মনসুরউদ্দিন, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এবং অন্যান্য বহুতর বাউলগান সংগ্রাহকদের চোখে সেসব গান ধরা পড়ল না কেন? কেন ক্ষিতিমোহন সংগৃহীত গানে আধুনিক হস্তাবলেপের আশঙ্কার প্রশ্ন উঠল? প্রণতি নিজেই জানিয়েছেন ক্ষিতিমোহন সম্পর্কে:
তাঁর দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় আর তিনি নিজে বাউলবাণী বার করেননি, যদিও তা সাজিয়ে লিখে রেখেছিলেন। প্রায় চল্লিশ বছর অর্থাৎ বলা চলে ১৯০৯-১৯১০ সাল থেকে এগুলি নিজের কাছেই রেখে নিজেই আলোচনা করেছেন, যার জন্য তাঁর এই সংগ্রহ। বন্ধুবান্ধবদেরও দেখিয়েছেন, এর থেকেই রবীন্দ্রনাথ ও চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে কখনো দিয়েছেন। মনে প্রশ্ন জাগে, এই সাজিয়ে রাখা বাউল গান সংগ্রহের পাণ্ডুলিপি কোথায় গেল?
‘কোথায় গেল’ এ-প্রশ্ন বেশি করে ওঠে এইজন্য যে, ১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনে তিনি স্থায়ীভাবে এসে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু আশ্রমিক আবহেই ছিলেন—বড়জোর ‘গুরুপল্লী’র বাসা ছেড়ে নিজের বানানো বাড়িতে উঠে গেছেন। সদাসঙ্গিনী পত্নী কিরণবালা, পুত্র কঙ্কর সেন, কন্যা অমিতা— ক্ষিতিমোহনের তিন উত্তরাধিকারীর কাছে প্রণতি এই পাণ্ডুলিপির হদিশ পাননি।
কিন্তু ক্ষিতিমোহনের সাক্ষ্যে দেখা যাচ্ছে, তাঁর সংগৃহীত বাউলগান থেকে ১৫টি গান তিনি চারু বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়েছিলেন ছাপতে এবং সেগুলি বেরোয় ‘বঙ্গবীণা’ বইতে। রবীন্দ্রনাথ এই পনেরোটি গান থেকেই প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সন্দেহ হয়, তাঁর জীবনের একটি পর্বে, অন্তত বাউল-ভাবনার দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ক্ষিতিবাবুর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনিই কি রবীন্দ্রনাথকে কায়াবাদী চারচন্দ্র সাধনকারী বাউলদের বিষয়ে অবহিত করে তাঁর উৎসাহ নিবৃত্ত করেন? দেখা যাচ্ছে ‘বাউল-পরিচয়’ প্রবন্ধে ক্ষিতিমোহন লিখেছেন:
সহজভাবে বাউল সম্বন্ধীয় যে-কয়খানা পুঁথি পাওয়া যায়, তাহাতে সাচ্চা বাউল-ভাবের পরিচয় মেলে না। আসল বাউল তো পুঁথির ধারই ধারে না। যাঁহারা আধা বৈষ্ণব আধা বাউল, কি আধা তান্ত্রিক আধা বাউল, তাঁহারাই নিজেদের পরিচয় খানিকটা বৈষ্ণব ও তান্ত্রিকভাবে Compromise-এর মত, দিতে চাহিয়াছেন। কিন্তু যথার্থ সে নির্ভীক শক্তি বা রচনার গভীরতা গ্রন্থী বাউলদের নাই। সহজ নামে তাঁহারা যে সস্তা ইন্দ্রিয়-উপভোগের পন্থা খুলিয়াছেন, তাহা বাস্তবিকপক্ষে কোনো সাধনার ভিত্তি হইতে পারে না। চর্যাচর্যবিনিশ্চয় প্রভৃতি গ্রন্থও তান্ত্রিক ভাবের গ্রন্থী বাউলের শ্রেণীর সঞ্চয়।
এই মন্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ও দ্যোতনাবহুল এবং সেইসঙ্গে ব্রাহ্ম ক্ষিতিমোহন সেনের সহজিয়া সাধনা তথা বাউলধারা সম্পর্কিত ধারণার স্পষ্ট প্রতিবেদন।
মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে ক্ষিতিমোহনের মনের যে-রূপ ফুটে ওঠে তাতে বোঝা যায় চর্যাগীতি থেকে উৎসারিত বাংলা গীতি পদাবলির ধারাকে তিনি শনাক্ত করতে চান তন্ত্রসম্পৃক্ত কায়াবাদী বলে। সহজিয়া পদকে ও পন্থাকে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন ইন্দ্রিয়-উপভোগের নামান্তর বলে। তবে তিনি যথার্থভাবে বলেছেন যে সাধারণভাবে বাংলার বাউল গানে ‘আধা বাউল আধা বৈষ্ণব’ বা ‘আধা তান্ত্রিক আধা বাউল’ পন্থার সমন্বয় ঘটেছে। একথা বলে তিনি বাউল গানের মূল স্রোত থেকে তাঁর সংগৃহীত পনেরোটি পদের স্বাতন্ত্র্য ও কৌলীন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। অর্থাৎ সেসব পদে উচ্চভাব ও গভীরতা আছে, কায়াবাদী সাধনার সঙ্গে ওই পদকারদের সম্পৃত্তি নেই, সহজধারার ইন্দ্রিয়-উপভোগের সরণি থেকে এ গান স্বতন্ত্র পথযাত্রী। এমন ধারণা ও মন্তব্য করার পেছনে ক্ষিতিমোহনের উদ্দেশ্য যাই থাক, একথা স্পষ্ট যে শান্তিনিকেতনে বসবাসকালে সহজিয়া তথা ‘আধা বৈষ্ণব আধা বাউল’ ধারার গান ও গায়কদের তিনি ভাল করে জেনেছিলেন। প্রণতি মুখোপাধ্যায়ের বই থেকে একটি উদ্ধৃতি দেওয়া যায়। ১৯১২ সালে—
