দুটি মন্তব্যেই বাউলের গানের ভাব-ভাষা-সুর ও সারল্যের মধ্যে গভীরতার কথা আছে, বাউলের জীবনাচরণ বা প্রতিবাদী চেতনার কথা নেই। উপনিষদীয় ভাবনার সঙ্গে তিনি ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বের সমীকরণ করতে চেয়েছেন, যদিও ‘মনের মানুষ’ আসলে এক কায়াসাধনের কনসেপ্ট—তা কি তিনি জানতেন না? ক্ষিতিমোহনের সংগৃহীত গানে ভাষার সরলতা ও ভাবের গভীরতা না হয় বোঝা গেল কিন্তু তার ‘সুরের দরদ’ তিনি কীভাবে অনুসন্ধান করলেন? ওই গানের গায়নপদ্ধতি ও সুরকাঠামো কি ক্ষিতিবাবুর আয়ত্ত ছিল? তিনি কি্ বাউল গান গাইতেন? এমন খবর অন্তত আমাদের জানা নেই।
বাংলার বাউল গান বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের উচ্ছ্বাস ও আসক্তির কারণ অনুসন্ধানে রবীন্দ্রনাথের আরও দুটি মন্তব্য আমরা পরীক্ষা করতে পারি। তাতে দেখা যাবে এ-জাতীয় গানের অন্যতর সমাজ-তাৎপর্য তার চোখে পড়েছে অথচ বুঝেছেন তার একঘেয়েমিও। যেমন:
৩. আমাদের দেশে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলেন তাঁরা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাঁদের শিক্ষা। কিন্তু, আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল-সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের এই সাধনা দেখি— এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই; একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভাসমিতির প্রতিষ্ঠা হয়নি; এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরান পুরাণে ঝগড়া বাধেনি।
৪. অধিকাংশ আধুনিক বাউল গানের অমূল্যতা চলে গেছে, তা চলতি হাটের সস্তাদামের জিনিস হয়ে পথে পথে বিকোচ্ছে। তা অনেক স্থলে বাঁধি বোলের পুনরাবৃত্তি এবং হাস্যকর উপমা তুলনার দ্বারা আকীর্ণ— তার অনেকগুলোই মৃত্যুভয়ের শাসনে মানুষকে বৈরাগীদলে টানবার প্রচারকগিরি।— এর উপায় নেই, খাটি জিনিসের পরিমাণ বেশি হওয়া অসম্ভব।…এইজন্যে সাধারণত যে-সব বাউলের গান যেখানে-সেখানে পাওয়া যায়, কী সাধনার কী সাহিত্যের দিক থেকে তার দাম বেশী নয়।
মন্তব্যগুলি নেওয়া হয়েছে ১৯২৭ সালে ‘হারামণি’র রবীন্দ্রলিখিত ভূমিকা থেকে। এসব মন্তব্যে তার বাউলগান সম্পর্কে প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, উচ্ছ্বাস ও হতাশা সবই আছে। কিন্তু যেটা বিশেষ লক্ষণীয় তা হল, রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষ দুটি দশকে বাউল গান সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন। লালনের কুড়িটি গান তিনি ১৯১৫ সালে ‘প্রবাসী’-তে মুদ্রণ করলেন অথচ পরে আর একটাও লালনগীতির প্রকাশে উদ্যম নিলেন না। তথ্যত দেখা যাচ্ছে, তাঁর কাছে লালনের গানের অন্তত তিনটি খাতা ছিল এবং তা যে তিনি সযত্নে পড়েছিলেন তার প্রমাণ রয়েছে তার স্বহস্তে লেখা পাঠশুদ্ধিতে। রমাকান্ত চক্রবর্তী সংগত প্রশ্ন তুলেছেন:
লালন-গীতাবলি রবীন্দ্রনাথ কেন প্রকাশ করলেন না? তার কারণ কি এই যে, লালনের গানের প্রযৌক্তিক শব্দের অর্থ জেনে তিনি আর তা ছাপাবার জন্য চেষ্টা করেননি? তার কারণ কি এই যে, কিছু কিছু উন্নত ‘ভাব’-এর অন্তরালে বাউলদের বিচিত্র যৌন-জীবন তার অজ্ঞাত ছিল না? তার কারণ কি এই যে, যে-‘চারিচন্দ্রভেদ’ বাউল সাধনার ভিত্তিস্বরূপ, তার বিবরণও তাঁর অজ্ঞাত ছিল না?
অবশ্য রমাকান্ত চক্রবর্তী প্রশ্ন তুলে ক্ষান্ত হননি, সিদ্ধান্তেও এসেছেন। তাঁর মনে হয়েছে,
একথা বলাই সঙ্গত যে, সমাজের ও ধর্মের যে অসামান্য গুরুত্ব উনিশ শতকের শেষের দিকে দেশাভিমানী বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবিগণ অনুভব করেছেন, সেই অনুভবই দেশাভিমানী রবীন্দ্রনাথের বাউল-প্রেমে সর্বদা অভিব্যক্ত হয়েছিল। দেশী-সংস্কৃতির এই বিশেষ উপাদানকে রবীন্দ্রনাথ অবহেলা করতেন না।
এবারে একটু অন্যদিকে তাকানো যাক। ১৮৯০ সালে লালন শাহ প্রয়াত হন। তাঁর সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ শিলাইদহের বোটে প্রবৃদ্ধ লালনকে বসিয়ে পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন। শোনা যায় সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী শুনেছিলেন লালনের কণ্ঠে গান। রবীন্দ্রনাথ এঁদের সূত্রেই লালন ও তাঁর গান প্রসঙ্গ শুনেছিলেন। ১৮৯০ সালের পর তিনি লালশিষ্যদের সংস্পর্শে আসেন এবং তাদের কাছে লালনের গানের নমুনা শোনেন এমন অনুমান অসংগত নয়। লালনের শিষ্যরা জমিদার রবীন্দ্রনাথের ওপর ভরসা রাখতেন, যার প্রমাণ রয়েছে লালনের শিষ্য মনিরুদ্দিন শাহ ফকিরের লেখা একটি আবেদনপত্রে। ‘মহামহিম মহিমার্ণব শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদার মহাশয় সমীপেষু’ বলে সম্বোধন করে আবেদন করা হয়েছে তাদের গুরুর ছেঁউড়িয়া আশ্রমের ভগ্নদশা থেকে উদ্ধার করে তাকে পাকা ইমারতে পরিণত করবার। এসবই রবীন্দ্রনাথের বাউলপ্রেমের স্পষ্ট প্রমাণ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিশ শতকের প্রথম দশকের পরে তিনি বাউল সম্পর্কে বেশ ভাবাত্মক মনোভঙ্গিতে গ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, এর মূলে হয়তো ক্ষিতিমোহন সেনের সঙ্গ-সান্নিধ্য কিছুটা দায়ী। ক্ষিতিমোহন ১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনে যোগ দেন এবং রবীন্দ্র-সঙ্গে ছিলেন ১৯৪১ সাল পর্যন্ত একটানা। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বাউল পরম্পরা বিষয়ে বহু তথ্য ও তত্ত্বজ্ঞানে সমৃদ্ধ করেন এবং গুরুদেবকে দেন বেশ ক’টি সংগৃহীত গান। সেই গানগুলি স্পষ্টতই লালনঘরানা বা কায়াবাণী বাউল পরম্পরার গান থেকে একেবারে আলাদা, কিছুটা সফিস্টিকেটেডও বটে। এই নতুন গানের ভাবে রসে রবীন্দ্রনাথ মজে যান। ক্ষিতিমোহন মধ্যযুগের সতসাধকদের সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং ‘বাংলার বাউল’ নামে ১৯৪৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভাষণ দেন, পরে সেটি বই হয়ে বেরোয়। এ-বই থেকে আমরা পাই তাঁর এমত ভাষ্য যে,
