এতসব অভিযোগমালা পেশ করে এদের ধ্বংসের ফৎওয়া জারি করে কট্টরপন্থীরা বসে থাকেনি নিশ্চয়ই। বস্তুত ব্যাপকভাবে বাউলখ্যাদা আন্দোলন, শারীরিক নির্যাতন, গান-বাজনার প্রত্যক্ষ বিরোধিতা চলেছে এবং তার ফলে একদল বাউল ফকির নিবৃত্ত হয়েছে, একদল পালিয়েছে, আরেকদল আত্মগোপন করে ছড়িয়ে পড়েছে নানা গ্রামে। কিন্তু ইতিমধ্যে দেশের হাওয়া বদলেছে। প্রধানত কলকাতার ঠাকুর পরিবার তাঁদের শিলাইদহ-কুষ্টিয়া ও পাবনা-সাজাদপুরে জমিদার পরিচালনা সূত্রে প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন ওই অঞ্চলের বাউলদের। তাদের ধর্মকর্ম বা আচরণবাদ নয়, ঠাকুৱরা আকৃষ্ট হন তাদের গানের ভাবে ও সুরে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাউলদের সম্পর্কে অনুকম্পায়ী ও গুণগ্রাহী। লালন ও গগন হরকরার গানে তাঁরা বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের ভাগিনেয়ী সরলা দেবীও সংগ্রহ করেছিলেন অন্য অনেক বর্গের লোকায়ত গান। তাঁদের উদ্যমে তৈরি হতে থাকল বাউল গানের স্বরলিপি, তার লক্ষ্য নিশ্চয়ই প্রচার। ‘বীণাবাদিনী’ পত্রিকায় ইন্দিরা দেবীচৌধুরাণী লালনগীতির স্বরলিপি প্রকাশ করলেন। রবীন্দ্রনাথ ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছাপলেন মোট কুড়িটি লালনগীতি, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া আখড়া থেকে এনে, ১৩২২ সালের আশ্বিন থেকে মাঘ সংখ্যায়, চার কিস্তিতে। তার আগেই ১৩১৪ সালে ‘প্রবাসী’-তে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসে লালনের একটি (‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’) গান উদ্ধত হয়েছে, ‘জীবনস্মৃতি’-তে (১৩১৯) উল্লিখিত হয়েছে বাউল গানের মাহাত্ম ও অসামান্যতা।
একথা আজ সবাই মানেন যে, সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালন শাহ-র দেখা সাক্ষাৎ হয়নি, কিন্তু লালন শিষ্যদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা হত, বাউলপস্থা নিয়ে তার কৌতুহল ছিল, বাউল গানের সুর কাঠামো তাঁর সাংগীতিক মানসে স্থায়ী ছাপ রেখেছিল। ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনের কালীমোহন ঘোষকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন,
তুমি তো দেখেছ শিলাইদহতে লালন শাহ ফকিরের শিষ্যগণের সহিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার কিরূপ আলাপ জমত। তারা গরীব। পোষাক-পরিচ্ছদ নাই। দেখলে বোঝবার জো নাই তারা কত মহৎ। কিন্তু কত গভীর বিষয় কত সহজভাবে তারা বলতে পারত।
একেই বলে দৃষ্টিভঙ্গির তফাত। উইলসন, অক্ষয়কুমার, যোগেন্দ্রনাথ, শ্রীরামকৃষ্ণ, নগেন্দ্রনাথ ও ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’র সংকলক রেয়াজউদ্দিন আহমদের বিরূপ ও বিদ্বিষ্ট মনোভাবের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ কত মরমি ও অনুভূতিপ্রবণ। দরিদ্র বাউলদের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মহত্ত্ব ও গভীরতা। লালনের গানের অনুলিপি সংগ্রহ করে এনে যত্ন করে পড়েছিলেন, সেই খাতা এখনও শান্তিনিকেতনে রক্ষিত আছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ১৯২৫ সালে কলকাতার ভারতীয় দর্শন মহাসভায় রবীন্দ্রনাথ যে লিখিত ভাষণ পাঠ করেন তাতে বাউল দর্শনের এক ভাববাদী ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হয়। তাঁর অনুভবে মনে হয়েছিল গ্রাম বাংলার নিরক্ষর গীতিকারের লেখা বাউল গানের তত্ত্ব আর প্রাচীন বৈদিক ঋষির রচনায় এক চমৎকার ভাবসাযুজ্য আছে আনন্দময়তায়। বাউলের রচনা আর শেলির কবিতায় তিনি পেয়েছিলেন একই সংরাগ যেন। পরে, রবীন্দ্রনাথের গানের সংগঠনে বাউল সুরকাঠামোর এমনকী কয়েকটি ক্ষেত্রে বাউল গানের ভাবাত্মক প্রকাশভঙ্গির নিজস্ব ভাষা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। সন্দেহ নেই, বাংলার বাউলকে তিনি জাতে তুলেছেন এবং হয়তো খানিকটা আদর্শায়িত করে।
দেখতে দেখতে এমন দাঁড়াল যেন বাউল ও লালন সমার্থক। ব্যাপারটা চমৎকার বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন রমাকান্ত চক্রবর্তী। তাঁর মতে,
একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির এবং বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের অন্বেষণ এবং সুদৃঢ় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে, মধ্যবঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীদের প্রচার সত্ত্বেও, হিন্দু-পুনরুত্থানবাদের ধ্যানে তারকাচক্ষু বাঙ্গালি হিন্দু ভদ্রলোকেরা লালনকে দেখতেই পেতেন না। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে উৎসারিত জোরাল প্রচার বাউল গানকে এবং লালনকে অমরত্ব দান করল।
শুধু লালন নয়, রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন গগনের গান, সাধক গোঁসাইগোপালকে এবং তাঁর কথাবার্তা হত সর্বক্ষেপী বোষ্টুমির সঙ্গে। এ সবই শিলাইদহ-কুষ্টিয়া পরিমণ্ডলের ব্যাপার। পরে ক্ষিতিমোহন সেনের প্ররোচনায় অন্য ধরনের কিছু বাউল গানের আস্বাদ পান এবং তা নিজের লেখায় নানাভাবে উদ্ধৃত করেন। হাসন রজার গানও তাঁর প্রিয় ছিল। বাংলার বাউল ও বাউল গান বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কতকগুলি মন্তব্য বা ভাষ্য আমরা লক্ষ করতে পারি, তার থেকে বোঝা যাবে কেন তাঁর বাউল গানের প্রতি পক্ষপাত জন্মেছিল। পর্যায়ক্রমে তিনি লিখেছেন:
১. আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে।
২. ‘অন্তরতর যদয়ামাত্মা’ উপনিষদের এই বাণী এদের মুখে যখন ’মনের মানুষ’ বলে শুনলুম, আমার মনে বড়ো বিস্ময় লেগেছিল। এর অনেককাল পরে ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের অমূল্য সঞ্চয়ের থেকে এমন বাউলের গান শুনেছি, ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না— তাতে যেমন জ্ঞানের তত্ত্ব তেমনি কাব্য রচনা, তেমনি ভক্তির রস মিশেছে। লোকসাহিত্যে এমন অপূর্বতা আর কোথাও পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করি না।
